বিস্মৃত বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেন: ইতিহাসের আড়ালে এক নাম

 বিস্মৃত বিপ্লবী

 নিকুঞ্জ সেন:

 ইতিহাসের 

আড়ালে 

এক নাম



অয়ন মুখোপাধ্যায়

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যতবার স্মরণ করা হয়, ততবারই কিছু পরিচিত নাম সামনে চলে আসে। রাইটার্স বিল্ডিং-এর অভিযানের কথা উঠলেই বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্তকে মনে করা হয়। তাঁদের আত্মাহুতির কাহিনি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে সাহিত্য-চর্চায়ও বহুবার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সেই অভিযানের পেছনে যিনি পরিকল্পক, যিনি শিক্ষক, যিনি মূলত বিপ্লবী তরুণদের মানস গঠনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন—তিনি প্রায় বিস্মৃত। তাঁর নাম নিকুঞ্জ সেন।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, সব নায়ক সমান আলো পায় না। কয়েকজন কাহিনির কেন্দ্রে থেকে খ্যাতি অর্জন করেন, আর বহুজন থেকে যান আড়ালে। নিকুঞ্জ সেন সেই দ্বিতীয় দলের একজন। অথচ তাঁর জীবনকে না জানলে রাইটার্স অভিযানের ইতিহাস আসলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর জন্ম নিকুঞ্জ সেনের, অধুনা বাংলাদেশের ঢাকার কামারখাড়ায়। এক সাধারণ পরিবারে বড় হলেও তাঁর চিন্তার জগৎ ছিল অসাধারণ। প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা শেষ করেন ঢাকায়, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে কলকাতায় আসেন উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ছাত্রজীবনেই তাঁর হৃদয় স্পর্শ করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার ডাক। শুধু পাঠ্যবই নয়, তাঁর মনে আলোড়ন তুলেছিল স্বদেশি আন্দোলনের আদর্শ, ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির উত্তাল ধারা।

শিক্ষা নিকুঞ্জ সেনের কাছে কখনও কেবল কর্মসংস্থানের সোপান ছিল না। বরং তিনি শিক্ষাকে ব্যবহার করেছিলেন জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার উপকরণ হিসেবে।

বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান

ছাত্রজীবনের প্রারম্ভেই তিনি যুক্ত হন যুগান্তর দলের ‘মুক্তি সংঘ’-এর সঙ্গে। এটি ছিল হেমচন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠিত এক গোপন সংগঠন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের বিপ্লবী কাজে উদ্বুদ্ধ করা। এখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার পরিধি প্রসারিত হয়। পরে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলে যোগ দেন।

বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স শুধু অস্ত্রসজ্জিত বিপ্লবীদের দল ছিল না; এটি ছিল শৃঙ্খলা, স্বেচ্ছাসেবকতা ও আত্মোৎসর্গের এক অনুশীলনক্ষেত্র। এই দলে থেকেই নিকুঞ্জ সেন শিখেছিলেন কিভাবে তরুণদের চেতনা জাগিয়ে তুলতে হয়, কিভাবে তাদের সংগ্রামে যুক্ত করতে হয়।

কুমিল্লায় ললিত বর্মনের সঙ্গে কাজ করার সময় নিকুঞ্জ সেনের প্রভাবেই শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত হন। তাঁদের মাধ্যমে আমরা দেখি, বিপ্লব কেবল অস্ত্রধারী পুরুষদের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল না; কিশোরী ছাত্রীদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেই বীজ বপন করেছিলেন নিকুঞ্জ সেনের মতো শিক্ষক বিপ্লবীরা।

শিক্ষকতার আঙিনায় বিপ্লব

ঢাকার বিক্রমপুরের বানারিপাড়া স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে নিকুঞ্জ সেন আরও এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। সেখানেই তাঁর ছাত্র হিসেবে ছিলেন বাদল গুপ্ত—যিনি পরবর্তীকালে রাইটার্স অভিযানের অন্যতম নায়ক হন। বাদলকে শুধু পড়াশোনার পাঠ নয়, দেশপ্রেমের পাঠও দিয়েছিলেন নিকুঞ্জ সেন। ছাত্র-শিক্ষকের সেই সম্পর্ক ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে।

এখানেই দেখা যায় নিকুঞ্জ সেনের প্রকৃত ভূমিকা। তিনি হয়তো নিজের হাতে বন্দুক ধরেননি, কিন্তু তিনি তৈরি করেছিলেন সেই তরুণদের, যাঁরা জাতীয় মুক্তির জন্য প্রয়োজনে প্রাণ বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেননি।

রাইটার্স বিল্ডিং-এর পরিকল্পক

১৯৩০ সালে রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল শুধু প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং ব্রিটিশ শাসনের ভয়ঙ্কর প্রতীককে ধ্বংস করার জন্য। কর্নেল এন.এস. সিম্পসন ছিলেন কারাগারে বন্দি বিপ্লবীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত। তাঁকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে একদিকে প্রতিশোধ নেওয়া, অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়।

এই পরিকল্পনার মূল কুশলী ছিলেন নিকুঞ্জ সেন। বিনয়, বাদল, দীনেশ ছিলেন অভিযানের কার্যকর সৈনিক। ৮ই ডিসেম্বর, ১৯৩০ সালের সেই দিনে তাঁরা ইউরোপীয় বেশে রাইটার্স বিল্ডিং-এ ঢুকে সিম্পসনকে গুলি করেন। এরপর শুরু হয় তুমুল গুলিবিনিময়। অভিযানের শেষে বিনয় আত্মবিসর্জন দেন, বাদল সায়ানাইড সেবন করেন এবং দীনেশ ধরা পড়ে মৃত্যুদণ্ড পান।

ইতিহাসে এই তিনজন শহিদের নাম অমর হয়ে আছে, কিন্তু যিনি তাঁদের দীক্ষা দিয়েছিলেন, পরিকল্পনার কৌশল রচনা করেছিলেন, সেই নিকুঞ্জ সেন ধরা পড়েননি এবং কিছুদিন পরে গ্রেপ্তার হন। সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় তাঁকে।

কারাজীবন ও পুনরায় সংগ্রাম

কারাগারে দীর্ঘ সাত বছর কাটানো কোনো বিপ্লবীর জন্য নিছক শাস্তি ছিল না; বরং তা ছিল আত্মপ্রস্তুতির সময়। নিকুঞ্জ সেনও কারাগারে বসে নিজের রাজনৈতিক দর্শন শানিত করেছিলেন। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আবারও ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে। অবশেষে ১৯৪৬ সালে মুক্তি পান।

মুক্তির পর তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের কাজে যুক্ত হন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল ব্রিটিশদের বিতাড়ন নয়, সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক সমতার প্রতিষ্ঠা। তাই তিনি শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান দলে যোগ দেন এবং মুখপত্র মহাজাতি-র সম্পাদনা করেন।

সাহিত্যিক ও সংগঠক

নিকুঞ্জ সেন শুধু বিপ্লবী নন, তিনি ছিলেন এক চিন্তাশীল সাহিত্যিক। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতির গভীর বিশ্লেষণ। জেলখানা কারাগার, বক্সার পর দেউলিয়া, ইতিহাসে অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা, নেতাজী ও মার্কসবাদ—প্রতিটি গ্রন্থই তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ও গবেষণার শক্তিকে প্রমাণ করে।


শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। উত্তর ২৪ পরগণার বাগু হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে বহু প্রজন্মকে তিনি গড়ে তুলেছেন। সমাজসেবার ক্ষেত্রেও সক্রিয় থেকে ‘পল্লী নিকেতন’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর জীবন তাই ছিল সংগ্রাম, শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসেবার এক বিরল মেলবন্ধন।

সম্মান ও উত্তরাধিকার

তাঁর স্মরণে উত্তর ২৪ পরগণার রাজারহাট-বিষ্ণুপুর অঞ্চলে একটি জনবসতির নামকরণ করা হয়েছে “বিপ্লবী নিকুঞ্জ সেন পল্লী”। যদিও এটি খুব সীমিত আকারে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি। আসলে আমাদের ইতিহাসচর্চার ব্যর্থতা হলো, আমরা বারবার কিছু পরিচিত নামকে স্মরণ করি, কিন্তু যাঁদের ছাড়া সেই ঘটনাগুলি অসম্পূর্ণ, তাঁদের অবদান ভুলে যাই।

নিকুঞ্জ সেন সেই বিস্মৃত বীরদের অন্যতম। তাঁর নাম যতটা আলো পাওয়ার কথা ছিল, ইতিহাসে তা হয়নি।

উপসংহার

আজকের প্রজন্ম যখন স্বাধীনতার কথা ভাবে, তখন কেবল কয়েকজন শহিদের নামই উচ্চারিত হয়। কিন্তু বিপ্লবী আন্দোলনের ভিত গড়ে তুলেছিলেন অসংখ্য মানুষ, যাঁদের অনেকেই আলোয় আসেননি। নিকুঞ্জ সেন তাঁদেরই একজন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত বিপ্লবী কেবল অস্ত্র ধরেন না; তিনি মানুষকে প্রস্তুত করেন, তিনি নতুন চেতনা সৃষ্টি করেন।

যদি আমরা তাঁকে ভুলে যাই, তবে আসলে আমরা নিজেদের ইতিহাসকেই অসম্পূর্ণ করে রাখি। তাই প্রয়োজন, নতুন করে নিকুঞ্জ সেনের মতো বিপ্লবীদের আলোয় আনা, তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া। কারণ স্বাধীনতা মানে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার সমাপ্তি নয়; স্বাধীনতা মানে মূল্যবোধ, চেতনা ও দায়িত্ববোধের চিরন্তন পাঠ।










 






style="text-align: justify;">





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার