উৎসব যার যার, দূষণ সবার

 উৎসব যার যার, দূষণ সবার

বিশ্বজিৎ মুখার্জি 

পরিবেশকর্মী ও আইনজীবী


 *মুখপাত* 

মানুষের সামাজিক জীবনে উৎসব একটি অন্যতম চিরায়ত আনন্দধারা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ উৎসবের মধ্য দিয়ে সুস্থ অনাবিল আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করে। সমাজে নানান বর্ণময় উৎসবের মধ্যেই থাকে দূষণের অশনি সংকেত। উৎসবের দিনগুলোতে আমরা পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি করে একে আরও বিপন্ন করে তুলি। আমাদের অভিজ্ঞতায় এটি স্পষ্ট, সামাজিক উৎসবের সময় অতিমাত্রায় লাউডস্পিকারের ব্যবহার, দীর্ঘসময় ধরে একই জায়গায় মাত্রাতিরিক্ত জনসমাবেশ, যানজট, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও জলের ব্যবহার, বেশি পরিমাণে বর্জ্য পদার্থের সৃষ্টি ইত্যাদি এক স্থানীয় পরিবেশ সমস্যা ডেকে আনে।

 *উৎসবজাত দূষণ নিয়ন্ত্রণ – ফিরে দেখা*

মানুষের সামাজিক জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ উৎসবের মধ্য দিয়েই দীর্ঘকাল ধরে মাত্রাছাড়া দূষণ ঘটছে। একে নিয়ন্ত্রণ করতে রাজ্য সরকারের পরিবেশ দপ্তর ২০০৮ সালে বিভিন্ন পুজো আয়োজকদের মধ্যে পরিবেশগত ভাবে ‘সেরাদের সেরা নির্মল পূজা পুরস্কার’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এই আয়োজনের অন্যতম ধারক-বাহক হিশেবে পরিবেশ দপ্তর নানান স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে নিযুক্ত করে। নিযুক্ত এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাদের মধ্যে চন্দননগরের ‘সবুজের অভিযান’-এর সদস্যরা প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় গঙ্গায় পূজার ফুলবেলপাতা সহ অন্যান্য উপকরণ ফেলা পূজা উদ্যোক্তাদের বুঝিয়ে বন্ধ করেন। এমনকী মূর্তি বিসর্জনের পর জল থেকে তা দ্রুত তুলে ফেলে জলদূষণ যতটা পারা যায় কমিয়ে গঙ্গাকে নির্মল রাখার প্রয়োগ বাস্তবে করে দেখান। কারণ মূর্তি রঙ করার সময় মৃৎশিল্পীরা যে রঙ এতকাল ব্যবহার করে এসেছেন, তাতে অত্যন্ত ক্ষতিকর সিসা ও অন্য ভারী ধাতু থাকত। ২০১০ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তরফ থেকে তাই বিভিন্ন এলাকার প্রতিমা নির্মাতাদের বিনামূল্যে সিসাহীন জৈব রঙ দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে রাজ্য পরিবেশ দপ্তরের তরফ থেকে ‘সবুজের অভিযান’-এর গঙ্গাকে নির্মল রাখার এই উদ্যোগকে পশ্চিমবঙ্গের আরও বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের উৎসবে, যেমন- চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো, চুঁচুড়া ও শিলিগুড়ির দুর্গাপুজো, নৈহাটি-কাঁচরাপাড়া অঞ্চলের কালীপুজো এবং নবদ্বীপের রাস পুজোয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘সবুজের অভিযান’ রাজ্য পরিবেশ দপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে এইসব অঞ্চলে সামাজিক উৎসব থেকে সৃষ্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণের আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিশেবে বিভিন্ন পুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পুজো প্রস্তুতি পর্বের দিন থেকে ক্রমাগত যোগাযোগ রেখে পরিবেশ-বান্ধব পুজো আয়োজনের এই প্রয়াসকে বাস্তবায়িত করতে উদ্যোগী হয়। এছাড়াও পুজো ও প্রতিমা শোভাযাত্রার সময় জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত জেনারেটরের ব্যাপক ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রচারও করা হয়। জেনারেটরের বদলে ১২ ভোল্ট ব্যাটারি ব্যবহার শুরু করার আবেদন করা হয়। এতে দেখা গেছে, বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ কম মেশে। বর্তমান পৃথিবীতে উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবেশ-বান্ধব সামাজিক উৎসব পালন করার এই নতুন দর্শনটি সকলের কাছে নিয়ে যাবার জন্য বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী পুরপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রতিনিধি, পূজা উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে কর্মশালারও আয়োজন করা হয়।

 *দূষণ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতার লক্ষ্যে*

সামাজিক উৎসবজাত দূষণ দূর করতে উৎসবমুখর দিনগুলিতে পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত কী কী চাপ কতটা বাড়ছে, তা চিহ্নিত করে দূর করার ব্যবস্থা উদ্যোক্তাদের নিতে হবে। এমনকী পরিবেশ-সংরক্ষণের বিষয়টিকে বাজেটের অর্ন্তভুক্তও করতে হবে। অত্যন্ত সচেতনভাবে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বর্জ্য ফেলার ভ্যাট রাখতে হবে। মন্ডপ সজ্জার ক্ষেত্রে নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় সহ বিষাক্ত বা দাহ্য কোন পদার্থ দিয়ে যাতে মণ্ডপ তৈরি না হয় তা দেখতে হবে। ব্যাপক প্রচার আন্দোলনের মাধ্যমে সামাজিক উৎসবের মধ্যে বেড়ে ওঠা দূষণ নিয়ন্ত্রণ যে সম্ভব, সে বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের নানান বিচারের বাণী এই উদ্যোগকে অনেকটাই সাহায্য ও পরিণত করেছে। ফলে মানুষের মনে এই চেতনা খানিকটা হলেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে যে, পরিবেশ সংরক্ষণের অভ্যাস কোন ঐচ্ছিক বিষয় নয়। এই পৃথিবীতে সকল প্রজাতির ও পরবর্তী প্রজন্মের বাঁচার উপযোগী গ্রহটিকে রক্ষার জন্যই পরিবেশ সংরক্ষণ প্রয়োজন। পরিবেশ সংরক্ষণের অভ্যাসটিকে তাই আমাদের সকল কাজে প্রতিফলিত করা অবশ্যকর্তব্য। পরিবেশ-বান্ধব সামাজিক উৎসবের ধারণাটি এই অভ্যাসের সংগেই যুক্ত।

আসন্ন পূজা উৎসবে, যেমন- বিশ্বকর্মা পূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষ্মী পূজা, কালী পূজা, দীপাবলি, কার্তিক পূজা, ছট পূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, রাস উৎসব, ঈদ্, বড়দিন, নববর্ষের আগের দিন এবং সরস্বতী পূজায় (২০২৫-২০২৬) পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য চন্দনগরের ‘পরিবেশ আকাদেমি’ রাজ্যের মুখ্য সচিব, পরিবেশ দপ্তরের প্রধান সচিব, পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সদস্য সচিবের কাছে বিধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তি জারির এক আবেদনে জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় এই সংস্থাটি পশ্চিমবঙ্গে উৎসবের মরশুমে পরিবেশগত বিপদ নিয়ন্ত্রণের জন্য সচেতনতা প্রচারের আয়োজন করছে। এই কাজে শব্দ দূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, প্রতিমা বিসর্জনজনিত দূষণ রোধে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন বিষয়ে বিধিবদ্ধ নিয়মাবলি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার-এর পরিবেশ দপ্তর এবং পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ থেকে উল্লিখিত সমস্ত দিক বিবেচনা করে একটি বিধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তি জারি করা প্রয়োজন। বিধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তিটি পুলিশ কর্তৃপক্ষ, পুরনিগম, পুরসভা, জেলা পরিষদ এবং পঞ্চায়েতের মধ্যে প্রচার করা প্রয়োজন। কারণ পূজা আয়োজক এবং উৎসব আয়োজকদের অনুমতি দেওয়ার আগে অনুমতিপত্রে সমস্ত বিধিবদ্ধ নিয়মাবলি উল্লেখ করা উচিত, যাতে আয়োজকরা তাঁদের অজ্ঞতার অজুহাত দিতে না পারেন।

 *আইনি রক্ষাকবচ*

বিধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উল্লেখ প্রয়োজন।

ক) স্থানীয় পুলিশ থানা এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি নিয়ে মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে হবে; সমস্ত মাইক্রোফোনে শব্দ-সীমাবদ্ধকারী যন্ত্র লাগানো উচিত।

খ) আয়োজকদের ডিজে বাজানোর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

গ) ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতার হাইকোর্ট কর্তৃক নির্ধারিত আইনানুগ নিয়ম অনুসারে আতশবাজি ব্যবহার করা উচিত। শব্দ সৃষ্টিকারী আতশবাজি কোনওভাবেই ব্যবহার বা বিক্রি করা উচিত নয়। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসারে আতশবাজি ব্যবহারের সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করা উচিত। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আতশবাজি কেবল রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পোড়ানো যাবে। ক্রিসমাস এবং নববর্ষের আগের দিন আতশবাজি মধ্যরাত অর্থাৎ রাত ১১:৫৫ পর্যন্ত পোড়ানো যেতে পারে (রিট পিটিশন রায়, তারিখ- ২৩/১০/২০১৮, দেওয়ানি নং ২৭৮, ২০১৫)। এই নির্দেশিকা অনুসারে নানান উৎসবে সবুজ আতশবাজি ব্যবহারের সময়সূচি হল- কালীপূজা এবং দীপাবলির দিন রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা (শুধু ২ ঘণ্টা), ছট পূজার দিন সকাল ৬টা থেকে ৮টা (শুধু ২ ঘণ্টা), বড়দিনের আগের দিন (২৪ ডিসেম্বর) রাত ১১:৫৫ থেকে রাত ১২:৩০ ( শুধু ৩৫ মিনিট) এবং নববর্ষের আগের দিন (৩১ ডিসেম্বর) রাত ১১:৫৫ থেকে রাত ১২:৩০ (শুধু ৩৫ মিনিট)।

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশিকায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপরিউক্ত উৎসব ছাড়া কেউই তাদের ইচ্ছানুযায়ী অনুষ্ঠান বাড়ি বা এমনকি খেলার মাঠেও আতশবাজি ব্যবহার করতে পারবেন না। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই যে কোনো অনুষ্ঠানে আতশবাজি ব্যবহার করা আমাদের এক সাধারণ প্রবণতা। ভারতীয় সংবিধানের ১৪১ এবং ১৪৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে, সমস্ত সিভিল এবং জুডিশিয়াল কর্তৃপক্ষ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ কার্যকর করতে বাধ্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পুলিশ কর্তৃপক্ষ সহ স্থানীয় এবং সিভিল প্রশাসন আমাদের রাজ্যে আতশবাজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। ফলে সমাজে আতশবাজির চাহিদা ও অবৈধ ব্যবহার বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন আতশবাজি তৈরির কারখানা গড়ে উঠছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে আতশবাজি ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে এর চাহিদা কমবে। চাহিদা কমলে নিষিদ্ধ আতশবাজি তৈরির কারখানাগুলির বাড়বাড়ন্তও নিয়ন্ত্রিত হবে।

ঘ) প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধি ২০১৬ (২৭/০৬/২০২২ তারিখের বিজ্ঞপ্তি) অনুসারে পরিবেশ দপ্তর কর্তৃক জারি করা বিধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে প্লাস্টিক এবং থার্মোকল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

ঙ) নদী এবং অন্যান্য জলাশয়ে জল দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিমা বিসর্জন এবং ছট পূজার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দেশিকা মানা প্রয়োজন।

 *অতঃকিম্*

এখানে বলা জরুরি, পুরসভা, পুরনিগম এবং পঞ্চায়েত কর্তৃক প্রতিমা দর্শনকারীদের জন্য পূজা মণ্ডপের ধারেকাছে জৈব-টয়লেটের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আয়োজকদের পরামর্শ দেওয়া উচিত, কারণ এসব সামাজিক উৎসবে দেখা যায় আয়োজকরা মণ্ডপ ও প্রতিমা সাজাতে প্রচুর টাকা খরচ করেন। তাই প্রতিমা দর্শনকারীদের জন্য জৈব-টয়লেটের ব্যবস্থা করা তাঁদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এই অবস্থায় রাজ্য সরকারের কাছে পরিবেশ কর্মিদের একান্ত অনুরোধ, আসন্ন পুজোর মরশুম শুরুর আগে একটি বিধিবদ্ধ বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসকদের সামাজিক উৎসবজাত দূষণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সমগ্র বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার জন্য উপযুক্ত নির্দেশ দেওয়া হোক। এই একই নির্দেশ সমস্ত পুলিশ কমিশনারেট এলাকায় ও পুলিশ কমিশনারদেরও দেওয়া হোক।


div>
class="separator" style="clear: both; text-align: center;">

এরকম বিজ্ঞাপন দিতে ইচ্ছুক হলে

 আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন

 খরচ মাত্র ৩০০ টাকা।

bannerbanner




style="text-align: justify;">

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার