“১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন: ক্ষুধা যখন রাজনৈতিক ইতিহাসকে গড়ে দিল”
“১৯৫৯ সালের
খাদ্য আন্দোলন:
ক্ষুধা যখন রাজনৈতিক
ইতিহাসকে গড়ে দিল”
অয়ন মুখোপাধ্যায়
স্বাধীনতার মাত্র এক যুগ পরে পশ্চিমবঙ্গ আবার ক্ষুধার অভিঘাতে কেঁপে উঠেছিল। ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন কেবল একটি দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সংকটের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ছিল জনগণের ন্যূনতম জীবিকা অর্জনের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রতি এক ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ।
প্রেক্ষাপট
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সেই অভিজ্ঞতা যেন বারবার ফিরে আসে খাদ্যাভাবের আকারে। ১৯৫৮-৫৯ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যায়, মজুতদার ও কালোবাজারির দৌরাত্ম্যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়, অথচ প্রশাসন ছিল উদাসীন। সরকারের ব্যর্থতায় মানুষের ক্ষোভ জমাট বাঁধতে থাকে।
আন্দোলনের বিস্তার
১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে কলকাতা ও গ্রামীণ বাংলায় লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্যের দাবিতে পথে নামে। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, গৃহিণী—সবাই এক কণ্ঠে স্লোগান তোলে: “খাদ্য দাও, বাঁচতে দাও।” নেতৃত্ব দেয় বামপন্থী দলগুলো।
১৬ আগস্ট কলকাতার রাজপথে ইতিহাস রচিত হয়—প্রায় লক্ষাধিক মানুষের মিছিল নেমেছিল।
দমননীতি ও শহিদ
কিন্তু এই আন্দোলন ভয়ঙ্কর দমননীতির মুখে পড়ে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে, গুলি চালায়। সরকারি হিসাবে কয়েক ডজন, বাম দলীয় হিসাবে প্রায় ৮০ জন মানুষ নিহত হন। হাজার হাজার মানুষ আহত ও বন্দি হন। বাংলার রাজপথ রক্তে ভিজে যায়। এই শহিদরাই খাদ্য আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
খাদ্য আন্দোলনের প্রভাব বহুস্তরীয়—
১. এটি বাংলায় বাম রাজনীতির ভিত্তিকে মজবুত করে এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংগঠনের যোগসূত্র দৃঢ় করে।
২. সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাহানি ঘটে, যা পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
৩. আন্দোলনটি প্রমাণ করে, ক্ষুধা রাজনৈতিক বিতর্ক নয়—এটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত।
৪. এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নটি পরবর্তী কয়েক দশকে সরকারি নীতি প্রণয়নে প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়।
উপসংহার
আজ যখন আমরা খাদ্য নিরাপত্তা আইন, রেশন ব্যবস্থা কিংবা পুষ্টি কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করি, তখন ভুলে গেলে চলবে না যে এগুলোর ভিত গড়ে উঠেছিল তীব্র আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র যখন নাগরিকের ক্ষুধা মেটাতে ব্যর্থ হয়, তখন জনগণই রাজপথে নেমে নিজেদের ইতিহাস রচনা করে।
রেফারেন্স:
হরিপদ ভট্টাচার্য, খাদ্য আন্দোলনের ইতিহাস, ১৯৭৯।
গৌতম চট্টোপাধ্যায়, খাদ্য আন্দোলন ১৯৫৯, দে’জ, ২০০৯।
Dwaipayan Bhattacharyya, Politics of Hunger and Survival in West Bengal, EPW, 1995।
Partha Chatterjee, The Present History of West Bengal, OUP, 1997।
এরকম বিজ্ঞাপন দিতে ইচ্ছুক হলে
আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন
খরচ মাত্র ৩০০ টাকা।


style="text-align: justify;">


.jpg)
মন্তব্যসমূহ