২০২৬-এ দেশবাসীকে মোদির উপহার এই দানবীয় শ্রম কোড
২০২৬-এ দেশবাসীকে
মোদির উপহার
এই দানবীয় শ্রম কোড
শ্রুতিনাথ প্রহরাজ
১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৯ সালে গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আই এল ও। তারই পথ ধরে ১৯২০ সালে ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক শোষণ বিরোধী সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রথম সর্বভারতীয় সংগঠন এ আই টি ইউ সি। লক্ষ্য ছিল অধিকার আদায়ের প্রশ্নে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করা। তখনকার মিল মালিকদের অধিকাংশই ছিল ব্রিটিশ শাসকের পৃষ্ঠপোষক ঠিক যেমন আদানি আম্বানি সহ এখনকার অধিকাংশ মিল মালিক নরেন্দ্র মোদী ও তার সরকারের পৃষ্ঠপোষক। তাই, এ আই টি ইউ সির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শ্রমিক আন্দোলনগুলি (যেগুলি সংগঠিত করার প্রশ্নে কমিউনিস্টদের একটা বড় ভূমিকা ছিল) তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকের যথেষ্ট মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক যেমন এখনকার কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই মোদি ও তার সরকারের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বা দাঁড়াবেও আগামী দিনে। লালা লাজপত রাই ছিলেন এ আই টি ইউ সির প্রথম সভাপতি। যদিও তার আগে ১৯১৮ সালে বি পি ওয়াডিয়ারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'দ্যা ম্যাড্রাস লেবার ইউনিয়ন' এবং ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী ও অনুসূয়া সারাভাইর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'আমেদাবাদ টেক্সটাইল লেবার অ্যাসোসিয়েশন' যা মজুর মহাজন সংঘ নামে পরিচিত ছিল। তবে দেশজুড়ে এ আই টি ইউ সি-ই প্রথম সর্বক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে। সেই হিসেবে দেশজুড়ে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের শতবর্ষ পূর্তি হল ২০২০ সালে। আর ঠিক সেই বছরই, দেশের বর্তমান বিজেপি সরকার শ্রমিকদের উপর নামিয়ে আনলো দানবীয় শ্রম কোড।
সময়টা লক্ষ্য করুন। তখন দেশজুড়ে দানবীয় কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে উত্তাল আন্দোলন শুরু হয়েছে। বিরোধী সাংসদরা ওই দাবিতে একযোগে সংসদ বয়কট করেছেন। সেই সুযোগে সংসদে একতরফা পাশ করানো হলো এই শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী শ্রম কোড বা বিধিগুলি। এগুলি হল মজুরি সংক্রান্ত কোড (২০১৯), শিল্প-সম্পর্ক কোড (২০২০), সামাজিক নিরাপত্তা কোড (২০২০) এবং পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ কোড (২০২০)। তারও ঠিক পাঁচ বছর বাদে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরোনোর এক সপ্তাহের মধ্যে, সংসদের গত শীতকালীন অধিবেশনে কোনরকম আলোচনা ছাড়াই ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে এই শ্রম বিধিগুলি কার্যকর করার কথা ঘোষণা করা হল। সংসদে হঠাৎ করে বন্দেমাতরম সঙ্গীত-এর সৃষ্টির সার্ধশত বর্ষ পূর্তির আলোচনার হিড়িক তুলে তারই আড়ালে এগুলি কার্যকর করা হল। সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠন গুলির সঙ্গে এ নিয়ে কোন আলোচনাই হলনা। যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি মেনে গত পাঁচ বছরে রাজ্য সরকারগুলির কোনও মতামত নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর জাতীয় শ্রম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হত যেখানে শ্রমিক সংগঠনগুলি সরকারের সামনে তাদের মত বিনিময়ের সুযোগ পেত। তার সবটা কার্যকর হত এমনটা নয় তবু শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার আইনানুগ বিষয়গুলি আলোচনার সুযোগ পেত সংগঠন গুলি। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর, শ্রমিকদের আইনি অধিকার সংকুচিত করে তাদের ওপর একতরফা আক্রমণ নামিয়ে আনার লক্ষ্যে, ২০১৪ সাল থেকে এই জাতীয় শ্রম সম্মেলন পাকাপাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ শুরু থেকেই কর্পোরেট ও হিন্দুত্ববাদীদের আঁতাতে চলছে এই সরকার। তাই সেখানেও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শ্রম কোড নিয়ে আলোচনার কোন সুযোগ পাননি। কর্পোরেট মালিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় শ্রমের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করতে সবটাই একতরফা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সাথে পাশ করানো হলো ১০০ দিনের কাজে গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পের নতুন রূপ ভি বি জি রামজি বিল, যা এখন আইনে পরিণত হয়েছে । এও কাজের অধিকারকে সংকোচনের মাধ্যমে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের উপর নতুন আর এক আক্রমণ। বস্তুত এই দুটিই হল ২০২৬ এর এই নতুন বছরে দেশের মানুষের জন্য মোদি সরকারের উপহার!
গত এক মাস ধরে কেন্দ্রীয় সরকার সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে বোঝাতে চাইছে এই শ্রম কোড গুলির মধ্যে নাকি শ্রমের প্রধান দিকগুলি অনেকটাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে! আসলে নরেন্দ্র মোদী ও তার সরকার দেশজুড়ে এই শ্রম কোডের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা শ্রমিক অসন্তোষের আঁচ খানিকটা টের পেয়েছে। ইতিমধ্যে শ্রমিক সংগঠন গুলির যৌথ মঞ্চ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই শ্রমিক মারা শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে দেশ জুড়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আর তাই সরকারি অর্থে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিথ্যার ফুলঝুরি ছুটিয়ে আমজনতাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এই শ্রম কোড নিয়ে ইতিমধ্যে পত্রপত্রিকায় বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবু বিধি কার্যকর হওয়ার পর নতুন যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং বিপদের জায়গাগুলি ঠিক কোথায় তা নিয়ে বারংবার আলোচনা জরুরী। ভুলে গেলে চলবে না, এদেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সর্বগ্রাসী আক্রমণের অন্যতম হাতিয়ার হল এই শ্রম কোড। একে কার্যকর করবার সুযোগ দিলে ইতিমধ্যেই শোষণ বঞ্চনায় জেরবার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অসহায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এই সুযোগে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট আর এস এস-বিজেপি পরিচালিত সরকার, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্ম জাতপাতের আগুন লাগিয়ে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে দুর্বল করতে চাইবে, ভেঙে দিতে চাইবে, যাতে বিনা বাধায় দেশের সর্বত্র এই শ্রম কোড লাগু করা যায়। দেশজোড়া ঐক্যবদ্ধ শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনই পারে একে প্রতিহত করতে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, ঠিক যেমনটা হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে। বুঝে নিতে হবে, শ্রমজীবী মানুষের এই অধিকার রক্ষার লড়াই নতুন আর এক স্বাধীনতার যুদ্ধ, স্বাধীন ভাবে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরে পেতে।
প্রথমে আসি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মজুরি সংক্রান্ত কোডের আলোচনায়, যেখানে মূলতঃ মজুরি, বোনাস, সম কাজে সম বেতন ও মজুরি প্রদান সংক্রান্ত পূর্বেকার আইন গুলি এক জায়গায় আনা হয়েছে। সরকারের দাবি, নতুন এই কোড চালু করে তারা নাকি সর্বজনীন নূন্যতম মজুরি এবং সময়মত মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে চেয়েছে। আদতে সত্যি কি তাই? পরাধীন ভারতে ১৯৩৬ সালে প্রথম মজুরি প্রদান আইন চালু হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে নূন্যতম মজুরি আইন আসে। বোনাস প্রদান আইন চালু হয় ১৯৬৫ সালে আর সম কাজে সম বেতনের আইন ১৯৭৬ সালে লাগু হয়। শুরুতেই দাবি করা হয়েছে, শ্রমিকরা এখন থেকে কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত 'ফ্লোর ওয়েজ' বা ন্যুনতম মজুরি বা তার বেশি মজুরি পাবেন। এক দেশ, এক ধর্ম, এক ভাষা, এক নির্বাচনের পথ ধরে এক মজুরি চালু করার ফন্দি এঁটেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। সারা দেশের জন্য সরকার নির্ধারিত 'ফ্লোর ওয়েজ' ভাবনা সেখান থেকেই। যেহেতু সরকারি সদিচ্ছায় আগাগোড়া গলদ প্রমাণিত সত্য, তাই এই সরকার নির্ধারিত এক মজুরির ব্যবস্থা আগামী দিনে এদেশের শ্রমজীবী মানুষের এতোটুকু উপকারে আসবে না-- এ কথা হলপ করে বলা যেতে পারে। কর্পোরেট মালিকদের খুশি করতে এ আরেক বিধি বন্দোবস্ত। শুরুতেই হোঁচট খেতে হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এই নূন্যতম মজুরি বা 'ফ্লোর ওয়েজ' কিসের ভিত্তিতে ঠিক করবে তা কোথাও বলা হয়নি। সাধারণত কৃষি ক্ষেত্রের মজুরি নির্ধারণে এই প্রথা চালু হয়েছিল। এই মুহূর্তে দেশের সরকার ১৬৮ টাকা ন্যূনতম মজুরির কথা ঘোষণা করেছে। দেশের অনেক রাজ্যে এর চাইতে অনেক বেশি টাকা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে দেওয়া হয়। ন্যূনতম মজুরি ঠিক করতে হলে একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে ক্যালোরি প্রয়োজন হয় সেই খরচ আর তার সঙ্গে 'নন ক্যালোরি' অর্থাৎ অন্যান্য সাধনের (বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি) খরচ যোগ করে নির্দিষ্ট করা জরুরী। দুঃখের হলেও একথা সত্যি, স্বাধীন ভারতে এযাবৎকাল এই নিয়মে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হয়নি। অথচ ভারতীয় সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে, রাষ্ট্রীয় নীতির নির্দেশিকা নীতিমালার অধীনে পরিষ্কার বলা আছে, রাষ্ট্রকে সকল শ্রমিকের (কৃষি শিল্প ইত্যাদি) জীবিকা নির্বাহের জন্য উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। রাষ্ট্রকে এমন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যা ওদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং অবসর সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুযোগের পূর্ণ উপভোগ নিশ্চিত করে।
স্বাধীন ভারতে শুরুর থেকেই রাষ্ট্রের শ্রেণী চরিত্র তাকে বাধ্য করেছে মালিক শ্রেণীর স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকতে। তাই প্রায় আট দশক ধরে ধারাবাহিক ভাবে বঞ্চিত হয়েছে শ্রমজীবী মানুষ, বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত যারা সেই মোট শ্রমজীবীর প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ। ওদের নিয়োগের নিরাপত্তা নেই, ন্যূনতম মজুরি পাওয়ারও অধিকার নেই। অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা তো দূর অস্ত। তাই, এই শ্রমকোডে বলা ন্যূনতম মজুরি প্রদানের গ্যারান্টি এইসব অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষের কাছে নতুন আর এক ভাঁওতা ছাড়া কিছু না। তাছাড়া ন্যূনতম মজুরি আর ন্যায্য বা প্রকৃত প্রাপ্য মজুরির মধ্যে একটা গুণগত ফারাক আছে যা প্রতিটি ক্ষেত্রে মজুরি প্রাপকদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সচেতন ভাবে আড়াল করা হয়। যদি সরকার নির্ধারিত ‘ফ্লোর ওয়েজ’ বা ন্যূনতম মজুরি শ্রমিকের মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপনের উপযোগী ন্যায্য মজুরি হিসেবে চিহ্নিত না হয়, বিপদ বাড়তে থাকে। বস্তুত গত ৮ দশকে এই বিপদ ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছে। শ্রমজীবী মানুষের কাছে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি হিসেবে যা দেখানো হয়েছে বা হবে আগামী দিনে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। কারণ দরকষাকষির উল্টো পিঠে থাকা মালিক শ্রেণীর হাতে এই শ্রম কোড অনেকটা ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। শুধু একতরফা ছাঁটাই এর ক্ষমতা নয়, ধর্মঘট করতে না দেওয়ার ক্ষমতা ও। তাই দিনের শেষে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করবে ওরাই-- শাসকদলের সাহায্য নিয়ে। ওরা ঠিক ততটাই মজুরি দেবে যাতে করে শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য লোপাট ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি না হয়। প্রয়োজনে দরকষাকষির জন্য বেকার বাহিনী মজুদ রাখবে ওরাই। আর এইসবের জন্য বেপরোয়া লাইসেন্স পেতে, হয় নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অথবা নির্বাচনী ট্রাস্ট তৈরি করে বছরের পর বছর, শাসকদলের ইলেকশান ফান্ড কে পুষ্ট করবে। ঠিক যেমনটা করছে এখন, বিজেপির নির্বাচনী তহবিলে ইলেকশন ট্রাস্ট-এর মাধ্যমে ঢালাও অর্থ (মোট নির্বাচনী দানের আশি শতাংশের বেশি) সরবরাহ করে। সেই কারণে এই শ্রম কোড কর্পোরেট মালিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করে, শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে বাজি রেখে।
শ্রমজীবী মহিলাদের ন্যায্যমজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্পর্কে কিছু আলোচনা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে করা যেতে পারে। এই মুহূর্তে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কর্মরত মহিলা যারা আছেন তাদের এই শ্রম কোডের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে তারা তাদের প্রাপ্য মজুরি পাওয়ার অধিকার থেকে আগেও বঞ্চিত ছিলেন, এখনও বঞ্চিত। আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা, মিড ডে মিল কর্মীরা এই গোষ্ঠীভুক্ত। পাছে এরা ন্যায্য মজুরির বা সমকাজে সমবেতনের দাবি করে, তাই পরিকল্পনামাফিক এদের 'স্বেচ্ছাসেবক' বানিয়ে রাখা হয়েছে। ভাবখানা এই, এরা স্বেচ্ছায় সেবা দান করবেন, সরকার বাহাদুর ক্ষমা ঘেন্না করে সামান্য কিছু অর্থ তুলে দেবে ওদের হাতে। আশা কর্মীদের দৈনন্দিন কাজ স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কর্মরত অন্যান্য সরকারি কর্মীদের থেকে কোন অংশে কম নয়। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠবেই, যিনি নির্দিষ্ট কাজে তার দক্ষ শ্রম প্রদান করেন তাকে তার প্রাপ্য মজুরি থেকে সরকার বঞ্চিত করবে কেন? শ্রম কোডের কোথাও এর উত্তর লেখা নেই। কৃষি ক্ষেত্রে যুক্ত ক্ষেতমজুরের ১০ জনের মধ্যে ৭ জন মহিলা। এদের ন্যূনতম মজুরি নেই, সামাজিক নিরাপত্তাও নেই। মাঝেমধ্যে দর কষাকষি করে দিনমজুরি কিছুটা বাড়ে এই যা। সারাদেশে অন্তত ৪ কোটি গৃহপরিচারিকা আছেন। এদেরও ন্যূনতম মজুরির কোন গ্যারান্টি নেই। শ্রম কোড এদের কথা ভেবে ওঠার সময় পায়নি। ইটভাটা টালিভাটা শ্রমিকদের একটা বড় অংশ মহিলা, যারা চরম শোষণের শিকার। এদের নিয়োগের নিরাপত্তা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা ন্যূনতম মজুরি টুকুও পায় না। চা বাগানের মহিলা শ্রমিকদের দুর্দশা বহু চর্চিত বিষয়। পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত শ্রম কোডটিতে কর্ম ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মহিলাদের নিরাপত্তার বিষয়টি (যা খুবই জরুরী) স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখিত না হওয়ায় আগামী দিনের বিপদ আরো বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে দেখলে একটা জিনিস শ্রমজীবী মহিলাদের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-- এদের উঠোনটাই শুধু পাল্টায়, শোষণ বঞ্চনার চেহারা কম বেশি একই থাকে। তাই লড়াই ছাড়া বাঁচার কোন পথ নাই।
শিল্প শ্রম সম্পর্ক বিষয়ক কোড ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক কোড দুটিতে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিকের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে অন্ধকারে রেখে অনেক গাল ভরা কথা বলা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে ৩০০ বা ততোধিক শ্রমিক কর্মরত এমন সংস্থায় কোন শ্রমিককে ছাঁটাই করতে গেলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এই সীমা ছিল ১০০ জন বা তার বেশি শ্রমিক আছে এমন কর্মক্ষেত্র গুলির জন্য। এই এক ফতোয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মরত এদেশে শতকরা ৮০ভাগ উৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের চাকুরীর নিরাপত্তা অস্বীকার করা হলো। শ্রম কোড চালু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই বেশ কয়েকটি সংস্থা এই আইনের সুযোগ নিয়ে দেদার শ্রমিক ঘাঁটাই করেছে। এই বিপদ ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা কাজের কথা বলা হলেও দৈনিক আট ঘন্টা কাজের জায়গা এই কোডে একাধিক ক্ষেত্রে ১২ ঘণ্টা অব্দি করবার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘ লড়াই করে চিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিকরা আট ঘন্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন ও আট ঘন্টা বিশ্রামের দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। আমাদের দেশে আট ঘন্টা কাজের অধিকার আদায়ের জন্য ১৯২৩ সালের পয়লা মে চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে মে দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন শ্রমিক নেতা সিঙ্গারাভেল্লু চেট্টিয়ার। তার ঠিক ১০০ বছর বাদে স্বাধীন দেশের বর্তমান বিজেপি সরকার বহু রক্ত ঘামের বিনিময়ে আদায় করা শ্রমিকের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার আইনি বন্দোবস্ত পাকা করেছে।
সরকারি বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে এই শ্রম কোড নাকি আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মজুরি সুনিশ্চিত করবে! আদৌ তা নয়। পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত শ্রম কোডটি ১৯৭৯ সালে দেশে চালু হওয়া অন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক (কর্মসংস্থান নিয়ন্ত্রণ পরিষেবার শর্তাবলী) আইনটি গিলে খেয়েছে। ওই আইনে পরিষ্কার বলা ছিল, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের জন্য ভ্রমণকারী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান নিয়ন্ত্রণ করে, সমান বেতন, চিকিৎসা সহায়তা, প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম ও ভ্রমণ ভাতার বন্দোবস্ত করতে হবে। একই সাথে বলা হয়েছিল এই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়োগকর্তাদের নিবন্ধন ও ঠিকাদারদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাঁচ বা ততোধিক শ্রমিক নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে মজুরি, কল্যাণ এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নির্দিষ্ট করে শ্রমিকদের শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এই শ্রম কোডটিতে দশ বা ততোধিক শ্রমিক আছে এমন সংগঠন গুলিকে আওতভুক্ত করা হয়েছে। ৪৬ বছর আগে চালু হওয়া এই আইন যথাযথভাবে কার্যকর হলে আমাদের দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের সার্বিক বিপদ এই পর্যায়ে পৌঁছত না। কোভিড বিপর্যয়ের সময় ঘরবাড়ি পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরে থাকা এইসব অসহায় শ্রমিকদের দুর্দশার প্রকৃত চিত্র আমরা দেখেছিলাম। সরকার কি তার থেকে আদৌ শিক্ষা নিয়েছে? এক কথায় এর উত্তর না। দেশজুড়ে রাজ্যগুলিতে কর্মরত ভিন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা কত তা কেউ জানে না। এদের শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের আওতায় বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করা হয় না। ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে এরা বঞ্চিত হন। বারংবার দাবি করা সত্ত্বেও দেশের সর্বত্র এদের জন্য রেশন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা যায়নি। বিপদে পড়লে চিকিৎসারও কোন সুবন্দোবস্ত নেই। যে পরিযায়ী শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে বাইরে আছেন তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আজও নির্বিকার। উল্টে বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলিতে যা এখন দেখছি তা ভয়ংকর। পূর্ব ভারত থেকে যাওয়া বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশী বলে দেগে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শারীরিক আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে এইসব শ্রমিকদের উপর। বিশেষ করে ধর্ম ও জাতপাত লক্ষ্য করে আক্রমণের মাত্রা বাড়ছে এইসব রাজ্যে। যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশেতো রীতিমতো বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাসস্থানের অস্থায়ী ছাউনি গুলি। বিহারে এস আই আর চলাকালীন আমরা লক্ষ্য করলাম কিভাবে কয়েক লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে ভোটার তালিকার বাইরে রাখা হয়েছিল। যেহেতু এদের কোন সংগঠিত ইউনিয়ন নেই, সবচাইতে বেশি দুর্বল এরাই। যদিও সি আই টি ইউ সহ দেশের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলি এইসব পরিযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবিতে ধারাবাহিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ফল এখনো অধরা।
গিগ ওয়ার্কার বা সরবরাহ কর্মীদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে তারা মোট বিক্রয়ের এক থেকে দুই শতাংশ অতিরিক্ত বোনাস বা কমিশন হিসেবে পাবে। কিন্তু কে দেবে তাদের এই অতিরিক্ত মজুরি যাদের ন্যূনতম মজুরি টুকুই নির্দিষ্ট নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওরা তো ওদের নিয়োগকর্তাকেই চেনে না। সবটাই চলে ইন্টারনেট ভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে। তাই ওদের কোন কাজের সময়ও নির্দিষ্ট নয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি পাগলের মতো দৌড়ে বেড়ায়, নামমাত্র কমিশন ভিত্তিক পারিশ্রমিকে কারো খাবার অর্ডার নিয়ে কারও বা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের অর্ডার নিয়ে। কিছুদিন আগে এই প্রথম ব্লিংকিটের কিছু সরবরাহ কর্মীকে দেখলাম নাছোড়বান্দা আন্দোলনের মাধ্যমে ধারাবাহিক ধর্মঘট করে দাবি আদায় করতে। এটা সম্ভব হয়েছে নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়ার কারণে। যে অধিকাংশ গিগ কর্মী তাদের নিয়োগকর্তাকেই চেনে না, তারা ন্যায্য মজুরি তো দুর অস্ত ন্যূনতম মজুরির জন্য দরকষাকষি করবে কার সাথে? সরকার কি আদৌ এদের খোঁজ রাখে? এই কর্মীর সংখ্যা এখন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের কোন ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে ওঠেনি। অল্প কিছু ক্ষেত্রে চেষ্টা চলছে। এরা চলে আপন খেয়ালে, ওদের উপর বেড়ে চলা এই চরম শোষণটাকে বেঁচে থাকার দস্তুর মেনে নিয়ে। বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোন জায়গা তো ওদের সামনে খোলা নেই। যাবেই বা কোথায়?
এই শ্রম কোডের সবচাইতে বড় বিপদের জায়গা হল দেশের এলাকার বৈচিত্র্য ও সেক্টর ভিত্তিক শ্রম দানের ভিন্নতার বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা। আমাদের দেশে এবং রাজ্যগুলিতে এই ভিন্ন ভিন্ন সেক্টর গুলিতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সহ সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য স্বতন্ত্র শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ ছিল। এই শ্রম কোডে কেবলমাত্র নির্মাণ শ্রমিক ও গিগ শ্রমিকদের জন্য দুটি স্বতন্ত্র পর্ষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত বাকি সমস্ত শ্রমিকদের একটিমাত্র শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে যা এক কথায় শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী। সেক্টরভিত্তিক কাজের ভিন্নতাকে গুরুত্ব না দিয়ে শ্রমিকদের কল্যাণের কথা বলার কোন যৌক্তিকতা নেই। এমনিতে জিএসটি চালু হওয়ার পর ক্ষেত্রভিত্তিক সেশ আদায়ের যে বন্দোবস্ত ছিল তার সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। এতে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এইসব অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষ। এদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য নিয়োগকর্তা বা সরকারের তরফে আর কোন নির্দিষ্ট তহবিল নেই, যা অতীতে ছিল। রাজ্যগুলিতে সেক্টর ভিত্তিক যে শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ গুলি আছে তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে তাও অজানা। তবে সেগুলি আগামী দিনে নিরাপদে শ্রমিক স্বার্থে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারবে এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকদের বিপদ বাড়ছে। নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য যে নতুন 'ই-শ্রম নিবন্ধীকরণ' প্রথা চালু হয়েছে সেখানে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো এ বাবদ সংগৃহীত সমস্ত অর্থ (যা এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি) কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা। এখানেও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অস্বীকার করার এক ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। রাজ্যগুলিকে বাদ দিয়ে শ্রমিক ককল্যাণ প্রকল্পের সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আদৌ বাস্তবসম্মত নয়। এর থেকে আমার এলাকায় কর্মরত কোন নির্মাণ শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হবে তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়। সেক্টরগুলির ভিন্নতার মান্যতা না দেওয়ার কারণে শ্রমিকের বিপদ বাড়ছে। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। এতদিন বিড়ি শ্রমিকদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থা ও তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ দেওয়ার প্রশ্ন শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের যে সরকারি বোঝাপড়া ছিল তা এখন বিশবাঁও জলে। শ্রম কোডে কোথাও এদের জন্য আলাদা করে কিছু বলার নেই। অন্যান্য সেক্টরে যুক্ত শ্রমিকদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।
পরিশেষে আমি যে ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে কায়িক ও মানসিক শ্রম দান করেছি সেই শিক্ষা ক্ষেত্র নিয়ে দু একটি কথা বলা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আমার মতে সর্বস্তরের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক- শিক্ষাকর্মী- আধিকারিকদেরও এই শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে গড়ে ওঠা শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে কাঁধ মেলানো জরুরী। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রেও এক কথা প্রযোজ্য। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে একটা ভালো অংশ এখন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিগুলি নিয়ন্ত্রণ করে এডুকেশন শপিং মল ও বেসরকারি নার্সিংহোম- স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলার মধ্য দিয়ে। আগামী দিনে সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্র আরো কমিয়ে এদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর পাঁচটা শপিং মলের কর্মীরা শ্রম কোডের বিপজ্জনক ধারায় আক্রান্ত হবেন আর এডুকেশন শপিং মলের সাথে যুক্ত শিক্ষক শিক্ষাকর্মীরা এই বিপদ এড়িয়ে যেতে পারবেন এমনটা ভাবার কোন কারণ দেখি না। এখন তো সরকারি শিক্ষাক্ষেত্রেও শিক্ষাদানসহ বেশিরভাগ কাজ করছেন অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ নিযুক্ত কর্মীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের কোন প্রাপ্য সম্মানজনক মজুরির নিশ্চয়তা নেই। চাকুরীর নিরাপত্তাও তথৈবচ। শাসক দলের মিটিং মিছিলে পা না মেলালে অকালে ছাটাই হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। ঠিক যেমনটা চলে বেসরকারি শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে যুক্ত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। সরকারি স্বাস্থ্যপরিসেবারও কার্যত একই হাল। বেশিরভাগ কাজ চলছে অস্থায়ী কর্মীদের নিয়ে। বেসরকারি নার্সিংহোম ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে নামমাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য করা হয় স্বাস্থ্য কর্মীদের। এখনো যারা এইসব শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বসে ভাবছেন শ্রম কোড-এর বিপদ তাদের ছোঁবে না, তারা এ দেশের নির্মম বাস্তব কে অস্বীকার করতে চাইছেন। তাই শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিনের অপেক্ষায় না থেকে সময় থাকতে শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে লড়াই আন্দোলনে শামিল হওয়া জরুরী। প্রয়োজনে সমস্ত সংকোচ দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে পা মেলাতে হবে শ্রমজীবী মানুষের মিছিলেও। ওদের বাঁচানোর জন্য নয়, নিজেদের বাঁচার তাগিদে।
style="text-align: justify;">












মন্তব্যসমূহ