প্রশ্নহীন আনুগত্যের দায় উত্তরবঙ্গের বন্যা ও জনগণের নীরবতা
প্রশ্নহীন আনুগত্যের দায়
উত্তরবঙ্গের বন্যা ও
জনগণের নীরবতা
অয়ন মুখোপাধ্যায়
উত্তরবঙ্গে আবার বন্যা—এবার আরও ভয়াবহ। নদী ফুলে উঠেছে, বাঁধ ভেঙে গেছে, রাস্তা-ঘাট ডুবে গেছে, গ্রাম ও শহর মিলেমিশে একাকার। কোথাও কিচ্ছু চেনা যাচ্ছে না। ঘরবাড়ি, ফসল, জীবিকা—সব কিছুই জলের নিচে। এমনকি বন্যপ্রাণীরাও নিরাপদ নয়।
এই ভয়ঙ্কর সময়েও আমরা দেখি, দক্ষিণবঙ্গের প্রশাসন কার্নিভালে ব্যস্ত, শহর উৎসবে মত্ত। রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে চলছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন—একজন দোষ চাপাচ্ছে অন্যের ঘাড়ে। এরই মধ্যে কোথাও কোথাও বিজেপি বিধায়কদের ওপর ক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এক পক্ষ বলছে, “ওদের দোষ”; অন্য পক্ষ বলছে, “আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম।”
কিন্তু আসল প্রশ্নটি কেউ তুলছে না।
উত্তরবঙ্গের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য শুধু প্রশাসনই দায়ী নয়—জনগণও কি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত?
আমরা কি পারি চোখ বন্ধ করে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চুপ থাকতে? আজকের দিনে প্রশাসনের বিরুদ্ধে কিংবা পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিকভাবে প্রশ্ন তোলার সাহস আমরা হারিয়ে ফেলেছি। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন পর্যন্ত—প্রশ্ন তোলাকে আমরা ভাবি অশোভন, নীরবতাকেই ধরি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে।
রাষ্ট্রের প্রতি এই প্রশ্নহীন আনুগত্য, এই ভীত নীরবতা, আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় অসুখ। কিছু এনজিও বা প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ প্রশ্ন তোলে, কিন্তু তারা সংখ্যালঘু। বাকি জনগণ সেলফি তোলে, মিছিল দেখে, আর উন্নয়নের ফ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করে—সব ঠিক আছে।
এই প্রেক্ষাপটে মনে পড়ে যায় অঞ্জন দত্তের বহু পুরনো গান “সকালবেলার খিদে”। অঞ্জন লিখেছিলেন—“বন্যার জলে বহরমপুর ভাসছে, মেদিনীপুর খরার কবলে,
দুজন মৃত, পূজোর ভিড়ের চাপে দু’শো জন অনাহারে।
নতুন একটা আয়ুর্বেদিক বড়ি পেটের খিদে দিব্যি ভুলিয়ে দেয়,
আকাশ থেকে নিয়ন পেপসি ডাকে যেন রেশন মিক্সড বেচতে চায়।
এতসবই তোমার সকালবেলার খিদে, সন্ধেবেলা যাবে ফুরিয়ে,
দেখতে দেখতে আরও একটা দিন চলে যাবে জীবন থেকে হারিয়ে।”
এই গান যেন আজকের সময়কেও ধরে রেখেছে—বন্যা নয় শুধু, আমাদের নীরবতা, দায়হীনতা আর আত্মতুষ্টি—সবকিছুর প্রতিচ্ছবি।
বন্যা, ভাঙন, নদী-খাল বন্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন—এসব নিয়ে আমরা সরকারের ব্যর্থতা খুঁজে পাই, কিন্তু নিজেদের দায়ের প্রশ্ন তুলি না। গবেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রায় ৬০ শতাংশ প্রকল্পে জনগণের কোনো প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নেই। অর্থাৎ সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন Development as Freedom গ্রন্থে লিখেছিলেন“Freedom is not merely the absence of tyranny; it is the ability to question.”স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো প্রশ্ন করার ক্ষমতা।
কিন্তু আমরা সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। গ্রামের সভায় যাই না, প্রকল্পের অগ্রগতি জানার চেষ্টা করি না, বাজেটের হিসাব দেখি না। ফলে নদী ও বাঁধের ত্রুটি বাড়তেই থাকে, আর প্রশাসনও তার দায় এড়িয়ে যায়।
সমাজবিজ্ঞানী আর্নেস্ট গেলনার লিখেছিলেন,“Traditional societies often worship hierarchy more than truth.”
আমাদের সমাজও সেই পথে এগোচ্ছে—যেখানে ‘স্যার’ সংস্কৃতি, দলীয় আনুগত্য আর প্রশাসনিক ভয়ের মধ্যে সত্য চাপা পড়ে যায়।
এই আনুগত্যই দুর্নীতির খাদ্য। মানুষ যখন ভক্ত হয়, নাগরিক থাকে না—তখন রাষ্ট্রও দায়মুক্ত হয়।অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধন বলেছিলেন— “Accountability is not enforced by law alone; it is created by public vigilance.”দায়বোধ আইন দিয়ে আসে না, আসে জনগণের সতর্ক দৃষ্টি থেকে।
কিন্তু আমরা সেই দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের দৃষ্টিশক্তি এখন ব্যানারে, নয় নদীর জলে।
নদী-খাল, বাঁধ, জলাধার—এসব সমস্যার শিকড় কেবল প্রশাসনিক নয়, সামাজিকও। রাজনীতি যখন জনপ্রিয়তার জন্য প্রকৃতি বিক্রি করে, তখন জনগণের নীরবতা হয়ে ওঠে সেই অপরাধের সহচর।
আমরা প্লাস্টিক ফেলি, গাছ কাটি, পুকুর ভরি—তবু ভাবি, “এগুলো তো ছোটখাটো ব্যাপার।” কিন্তু এই ছোট ছোট নীরবতা মিলে গড়ে ওঠে বড় বিপর্যয়।
জনগণ যদি প্রশ্ন না করে, যদি প্রকল্পের তদারকি না করে, তবে সরকারের পরিকল্পনাও অপূর্ণ থেকে যাবে। গণতন্ত্রে প্রশাসনকে দায়বদ্ধ রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণ।
উত্তরবঙ্গের এই প্লাবন তাই শুধু প্রাকৃতিক নয়, এটি এক সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন—প্রশ্নহীন আনুগত্যের মানসিকতা।
যতদিন জনগণ নীরব থাকবে, যতদিন প্রশ্ন তুলবে না, ততদিন নদী ভাসাবে ঘর, ফসল, স্মৃতি—আর ক্ষমতাবানরা দায়মুক্ত থাকবে।
প্রকৃতি বারবার আমাদের ঘুম ভাঙাচ্ছে। এখন আমাদের জেগে ওঠার সময়।
নদী, খাল, বাঁধ, বরাদ্দ, প্রকল্প—সবকিছুর হিসাব জানতে হবে, প্রশাসনকে প্রশ্ন করতে হবে, সভায় যেতে হবে, বাজেট দেখতে হবে।
জনগণকে শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে দেখা যাবে না—তারা হতে পারে পরিবর্তনের শক্তি।
যখন জনগণ জেগে উঠবে, তদারকি করবে, প্রশ্ন তুলবে—তখন প্রশাসনও জবাব দিতে বাধ্য হবে।
নদী যদি জীবনের প্রতীক হয়, তবে প্রশ্ন হলো তার প্রবাহ।প্রশ্ন থেমে গেলে সমাজও থেমে যায় তাই প্রশ্ন করাই এখন আমাদের বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত।
style="text-align: justify;">





মন্তব্যসমূহ