নিঃসঙ্গতার শৈলচূড়ায় অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়

 অভিনয়ের নৈতিকতা ও

 অনুবাদের রাজনীতি:

 নিঃসঙ্গতার শৈলচূড়ায়

 অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়



 অয়ন মুখোপাধ্যায়

১. ভূমিকায়: আলো নেভে, মঞ্চ নয়

বাংলা থিয়েটারের আধুনিকতা যদি কেবল ‘নতুন ফর্ম’ বা ‘নতুন চমক’-এর সমার্থক না হয়ে, বরং দর্শকের নৈতিক বোধ ও রাজনৈতিক কৌতূহলকে একসঙ্গে নাড়া দেওয়ার প্রকল্প হয়— তবে তার একটি দৃষ্টান্তমূলক নাম অজিতেশ। তাঁর কাজ বরাবরই একটা দ্বিমুখী পরীক্ষাগার: একদিকে অভিনয়ের দেহ-শিল্প, অন্যদিকে অনুবাদ/আত্তীকরণের সামাজিক দর্শন। এই দ্বিমুখীতা–ই তাঁকে আলাদা করে। কারণ তিনি কখনও নাটককে সরল বার্তাবাহক করেননি, আবার বিমূর্ত নন্দন-চমকের খাতিরেও তাকে ভাসিয়ে দেননি। মঞ্চ তাঁর কাছে ছিল ‘বিষয়’ নয়, ‘পদ্ধতি’— যাকে দিয়ে সমাজকে পড়া যায়, এবং একইসঙ্গে সামাজিক পাঠের ভাষাটাকেও পরীক্ষা করা যায়।

২. শৈশব, ভয়, কল্পনা: অভিনয়ের প্রথম প্রয়োগশালা

মানভূমের গ্রাম থেকে যুদ্ধের আতঙ্ক পেরিয়ে শহর— শিশুকালেই অজিতেশ বুঝেছিলেন, ভয়ের মধ্যেই কল্পনার দরজা খুলে যায়। যুদ্ধ মানুষের দেহে যে কাঁপন তোলে, অভিনয় সেই কাঁপনকে ‘রিদম’-এ বাঁধে। ঝালদার স্কুলঘরের বেঞ্চ, আসানসোলের চৌকি, কুলটি–আসানসোল–কলকাতার ঘুরে বেড়ানো— সবকিছু মিলে তাঁর ভেতরে জন্ম দেয় এক ধরণের ‘মৌলিক বাস্তববাদ’: যেখানে মঞ্চের ভাষা জীবনের গন্ধে সিক্ত, কিন্তু জীবনের কাঁচা কণ্ঠস্বরকে ছাঁকনি ছাড়া মঞ্চে তোলা নয়। এই ছাঁকনিই তাঁর শৃঙ্খলা; এ শৃঙ্খলা নীতিগত— কৌশলগতও বটে।

৩. রাজনীতি ও থিয়েটার: দূরত্বের ভেতরের মিত্রতা

পাতিপুকুরের শ্রমিক আন্দোলন, গণনাট্যের সংগঠিত কাঠামো— এখানে অজিতেশ দেখলেন ‘স্লোগান’ ও ‘সত্য’ সমার্থক নয়। থিয়েটার যদি কেবল হাতিয়ার হয়, তবে দর্শকের মনোজৈবিক স্বাধীনতা কোথায়? তিনি তাই রাজনৈতিক আস্থাকে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পরীক্ষায় বসালেন। তাঁর থিয়েটারে রাজনীতি অনুপস্থিত ছিল না; অনুপস্থিত ছিল ‘স্লোগান-ফাইনালে’। তিনি দর্শককে শেষ দৃশ্যে কখনও ‘উত্তর’ দেননি; বরং ‘প্রশ্ন’ রেখে গিয়েছেন। এই প্রশ্ন-নির্ভর নির্মাণই গণনাট্যের সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্য–সত্ত্বেও দূরত্ব গড়ে তোলে। দূরত্ব— যা শত্রুতা নয়, বরং শিল্পপদ্ধতির পার্থক্য।

৪. নান্দীকার: ফর্ম নয়, দর্শন

১৯৬০-এ নান্দীকার প্রতিষ্ঠা শুধু এক নতুন দলে নাম লেখানো নয়; এটা ছিল এক নতুন ‘প্রডাকশন এথিক্স’-এর ঘোষণা। কাঠামো ছোট, সম্পদ অল্প, কিন্তু পরীক্ষা বড়: নাটককে বাংলার ভাষায় আনা— ‘মহড়ার ভাষা’ থেকে ‘দর্শকের ভাষা’-তে সঠিক অনুবাদ। ইবসেন থেকে পিরানদেল্লো— ‘অর্থ’ অনুবাদ নয়, ‘পরিস্থিতি’ আত্তীকরণ। অজিতেশ এখানে নির্দেশক হিসাবে কেবল ব্লকিং সাজাননি; তিনি অভিনেতার শ্বাসপ্রশ্বাস, উচ্চারণের পালস, নীরবতার মাপ— সব শেখাতে চেয়েছেন। কারণ তাঁর মতে ‘টেক্সট’ মঞ্চে ‘বডি’ না হলে নাটক নয়। এই দেহায়নই নান্দীকারকে দৃঢ় করে: ছ’টি চরিত্রের সন্ধানে নাট্যকার, মঞ্জরী আমের মঞ্জরী, নানা রঙের দিন, তিন পয়সার পালা— প্রতিটিই হয়ে ওঠে পাঠপুস্তক, কিন্তু পাঠশালা হয় মহড়াঘর।

৫. বঙ্গীয়করণ: অনুবাদের নৈতিকতা

বিদেশি নাটকের ‘বঙ্গীয়করণ’— শব্দটা সহজ, কাজটা কঠিন। এখানে প্রশ্ন: আমরা কি কেবল নাম–স্থান বদলাই, নাকি নৈতিক দ্বন্দ্বের স্থানাঙ্ক পাল্টাই? অজিতেশ দ্বিতীয়টিই করেছেন। চেখভের ভগ্ন ঐশ্বর্য, ব্রেখটের সামাজিক ফাঁদ— তিনি যখন বাংলায় আনেন, তখন ‘ইউরোপীয় দূরত্ব’ মুছে দিয়ে ‘বাঙালি নিকটতা’ তৈরি হয়। এ নিকটতা কৃত্রিম নয়; ভাষার ভিতরে লুকোনো সামাজিক ছন্দ, আঞ্চলিক উচ্চারণ, পল্লব-টোন— এসব দিয়ে তিনি ‘পরিস্থিতি’কে দেশীয় করেন। তাই চেরি অর্চার্ড–এর ‘সম্পত্তি হারানো’ এখানে ‘সমাজ হারানোর’ উপমা হয়ে ওঠে; থ্রি পেনি অপেরা–র ব্যঙ্গ বাঙালি বাবু-সামন্তের খোলসে হাজির হয়। এটি অনুবাদ নয়, ‘নীতিমালা স্থানান্তর’— যা অনুবাদের রাজনীতিকে নৈতিক প্রশ্নে দাঁড় করায়: কোন বেদনাটা ‘আমাদের’— সেটাই তাঁর লক্ষ্য।

৬. অভিনয়পদ্ধতি: দেহের ব্যাকরণ, নীরবতার বাক্য

অজিতেশের রিহার্সাল-শৃঙ্খলা নিয়ে অনেক গল্প আছে— সময়ানুবর্তিতা, স্কোরিং, কণ্ঠের তাপমাত্রা, দৃষ্টির স্থিতি। এসব শুনতে ‘কঠোর’ লাগতে পারে, বাস্তবে এগুলোই অভিনেতাকে ‘বাক্য’-এর বাইরে ‘বাক্যবহির্ভূত’ শেখায়। তাঁর অভিনেতারা শিখেছেন— সংলাপ কেবল শব্দ নয়, শব্দ-মাঝের শূন্যেরও বক্তব্য আছে। তাই তাঁর মঞ্চে হাততালি প্রায়শই ‘নীরবতা’-কে সম্বোধন করে। নীরবতা— যা চরিত্রের অপরাধবোধ, বা দর্শকের অস্বস্তি। এই নীরবতাই তাঁর থিয়েটারের কেন্দ্রীয় যন্ত্র।

৭. দলীয় টানাপোড়েন: সংগঠনের রাজনীতি বনাম নাটকের স্বাধীনতা

নান্দীকারের ভিতরকার মতভেদ— কে নিয়ন্ত্রণ করবে, কতটা আবেগ, কতটা রাজনীতি— এই বিতর্কগুলো টেক্সটের বাইরে হলেও, নাটকের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। অজিতেশ বুঝলেন, organisation যদি production-এর ভাষা নির্ধারণ করে দেয়, তবে ‘পদ্ধতি’ স্বাধীন থাকে না। ১৯৭৭-এ নান্দীমুখ প্রতিষ্ঠা— এই স্বাধীনতারই লজিক্যাল পরিণতি। এখানে তিনি দেখালেন, দল পাল্টালেও ‘ভাষা’ পাল্টায় না; বরং ভাষাই নতুন দল বানায়। তাঁর বিখ্যাত কথা— নাটক নদীর মতো, এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে যায়— আসলে এটাই শিল্প-স্বাধীনতার ভূগোল।

৮. মাধ্যমান্তর: মঞ্চ থেকে পর্দা, পর্দা থেকে মঞ্চ

সিনেমা ও যাত্রায় তাঁর সমান দাপট ‘মাধ্যমান্তর’-এর এক আকর্ষণীয় অধ্যায়। ছুটি থেকে হাটে বাজারে— ক্যামেরার সামনে তাঁর ‘দৃষ্টি’ সংলাপের মতোই অর্থবহ। কিন্তু পর্দায় সাফল্য সত্ত্বেও তিনি বারবার ফিরে এসেছেন মঞ্চে— কারণ মঞ্চে অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যবর্তী দূরত্ব ‘লাইভ’— সেখানে ভুলও ঘটতে পারে, আর সেই ভুলও সত্যকে সামনে আনে। ক্যামেরা ‘নির্বাচিত সত্য’ ধরতে পারে; মঞ্চ ‘উদ্ভূত সত্য’ তৈরি করে। এই তফাত তিনি বুঝতেন, শিখিয়েছেনও।

৯. ব্যক্তিজীবনের টোনালিটি: কঠোরতার অন্তরালে কোমলতা

রিহার্সালে গর্জনকারী, মহড়ার পরে সিগারেট বাড়িয়ে দেওয়া— এই দ্বৈততা কেবল স্বভাবের নয়, পদ্ধতিরও। তিনি জানতেন, শিল্প-শৃঙ্খলা আদেশে টেকে না; টিকে থাকে শেয়ার করা দায়বদ্ধতায়। তাই তিনি অভিনেতাকে কঠোরভাবে ধরতেন, কিন্তু চরিত্রকে আলতো করে। কারণ শিল্প— শেষ পর্যন্ত— মানুষের ভাঙাচোরা জোড়া লাগানোর অনুশীলন। এই মানবিক অনুশীলন ছাড়া কোনও কৌশলই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

🔴 অকাল-বিদায়: অসমাপ্তির নন্দনবিদ্যা

মাত্র পঞ্চাশে পর্দা নামা— জীবনের ট্র্যাজেডি নয়, শিল্পের ইতিহাসে ‘অসমাপ্তি’র সংযোজন। তাঁর অনুপস্থিতি বাংলা থিয়েটারের জন্য শিকড়ে কাঁপন। তবে এ অসার শোক নয়— কাজের পুনর্পাঠের আহ্বান। অসমাপ্তিই তাঁর পাঠকে ভবিষ্যতের জন্য খোলা রাখল— যেন প্রত্যেক নতুন প্রযোজনা তাঁর সঙ্গে এক ধরণের সংলাপ চালিয়ে যায়: আমরা কীভাবে অনুবাদ করব, কীভাবে নীরবতা লিখব, কীভাবে দর্শকের অস্বস্তিকে সম্মান দেব?

🔴  উত্তরাধিকার: প্রশ্নের ধারাবাহিকতা

🔴 অজিতেশের উত্তরাধিকার কোনও ‘স্কুল’ নয়; বরং ‘অভ্যাসের নিয়ম’।—

1. দর্শকের বুদ্ধিকে বিশ্বাস করা: বোধহয়, বুঝিয়ে বলা নয়।

2. অভিনেতার দেহকে টেক্সট করা: সংলাপ–বহির্ভূতও অভিনয়।

3. অনুবাদের নৈতিকতা: ভাষা বদলে গেলে বেদনা বদলায়— এই বোধ।

4. সংগঠনের স্বাধীনতা: দল–কেন্দ্রিক ক্ষমতার বদলে কাজ–কেন্দ্রিক বিশ্বাস।

🔴 এই চারটি স্তম্ভ তাঁর কাজকে বারবার প্রাসঙ্গিক করে।

🔴  প্রয়োগ: আজকের মঞ্চে তাঁর ব্যবহারিকতা

আজ যখন মঞ্চ অর্থনৈতিক চাপে, অনুদান–নির্ভরতায়, বা ‘কনটেন্ট-ব্যস্ততা’তে টেকনিক্যালি চকচকে অথচ বোধের দিক থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ে— তখন অজিতেশের পদ্ধতি ফিরে আসে। কীভাবে?

🔴 দৃশ্য–লেখার মিতভাষিতা: বড় সেট নয়, অর্থপূর্ণ স্থান।

🔴 ভাষা–শিক্ষা: অভিনেতার উচ্চারণে অঞ্চল ও শ্রেণির সুর।

আত্মসমালোচনা: যে কোনও মতাদর্শের ভেতর নিজের সুবিধাভোগকে চিহ্নিত করা।

দর্শক–সম্পৃক্তি: ‘এফেক্ট’ নয়, ‘ইফেক্টের পর’-এর চিন্তা— দর্শকের মনোজগতে নাটকের পরবর্তী জীবন।

🔴 অনন্ত নীরবতা: শেষ দৃশ্যের রাজনীতি

অজিতেশের মঞ্চ বেশি দিন ‘বড় ভাষণে’ শেষ হয়নি। শেষ দৃশ্য— প্রায়ই এক নীরব উন্মুক্ততা। এই উন্মুক্ততা রাজনৈতিক, কারণ তা দর্শকের উপর ‘মালিকানা’ স্থাপন করে না; বরং দর্শককে ‘সহ–লেখক’ বানায়। আজকের মতাদর্শ–গর্জনে ভরা সময়ে এই নরম শেষটাই সবচেয়ে কঠিন প্রতিজ্ঞা— শিল্প দর্শককে নিজের মতো ভাবতে দেবে।

 🔴 রূপক সমাপন: একটি মহড়াঘরের কাহিনি

ধরা যাক, এক সন্ধ্যায় নান্দীমুখের মহড়াঘরে আলো নিভল। অভিনেতারা চেয়ারে বসে আছে— নতুন নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক আটকে গেছে; সংলাপ বারবার পড়া হচ্ছে, মিলছে না। কেউ বলে, “এই দৃশ্য রাজনৈতিকভাবে কমিটেড নয়”; কেউ বলে, “অতিরিক্ত বিমূর্ত”; কেউ বলে, “দর্শক বুঝবে না।” বিতর্কের মধ্যে হঠাৎ মঞ্চের পেছনের দরজা সামান্য কেঁদে ওঠে— কেউ ঢোকেনি, তবু হাওয়া। সুইচ না ছুঁয়েও এক ফোকাস জ্বলে ওঠে ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে। সেখানে দাঁড়ায় না কেউ; দাঁড়ায় একটি ‘বিরতি’। বিরতির ভেতর অভিনেতারা নিজেদের শ্বাস শুনতে পায়। একজন ধীরে বলে— “সংলাপটা এতক্ষণ আমরা বলছিলাম দর্শককে বোঝাবার ভঙ্গিতে; চরিত্র কি নিজেকে বোঝায়নি?”

এই ‘মৃদু উপলব্ধি’-ই আলো। আলো জ্বলে, কেউ আসে না; কিন্তু দৃশ্যটা ঠিক হয়ে যায়। এইটাই অজিতেশের পাঠ— মঞ্চে আলো মানে কারও প্রবেশ নয়; আলো মানে প্রশ্নের আগমন। প্রশ্ন এলেই নাটক এগোয়।

🔴 উপসংহার: অজিতেশ একটি কাজের পদ্ধতি

অজিতেশকে ‘গুরু’ বলা চলে, তবে ‘পদ্ধতি’ বলা বেশি জরুরি। কারণ তিনি কোনও সমাধান রেখে যাননি; রেখেছেন সমাধানের দিকে হাঁটার অভ্যাস। তাঁর অনুবাদ আমাদের শেখায়— বিদেশি টেক্সট বাঙালি হলে কেবল ভাষা বদলায় না, নৈতিক অবস্থানও বদলায়। তাঁর অভিনয় শেখায়— সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে যে শূন্যতা, সেখানে দর্শকের অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় লেখক। তাঁর সংগঠন–রাজনীতি শেখায়— দল শিল্পকে ধরে রাখতে পারে, কিন্তু শিল্পই দলকে অর্থ দেয়।

এই জন্যই আলো নেভে; মঞ্চ নয়। এবং এই জন্যই, আমরা যখন কোনও নতুন প্রযোজনার ঠিক আগে মহড়াঘরে নিঃশ্বাস মিলিয়ে নিই— কোথাও থেকে যেন শুনতে পাই, ধোঁয়ায় মেশা শান্ত গলা:

“নাটক মানে মানুষের ভেতরটা খুলে দেওয়া। বাকি কাজ দর্শকের।












2 3

style="text-align: justify;"> 20 21





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার