অথ: শ্রী হীরণ্য কীর্তন

অথ: শ্রী হীরণ্য কীর্তন



কালভৈরব

আচ্ছা কাল শুনলেন দোকানে গিয়ে সোনা হঠাৎ করে সস্তা হয়ে গেছে। কারখানায় অল্প দামে সোনা বানানো হচ্ছে। দেশ বিদেশে আলোড়ন আমেরিকার মতো দেশ ভিখারী হয়ে যাচ্ছে ধনী হয়ে উঠছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, বিশ্বাস করবেন? অবশ্য গলায় কাটমানির ভগ্নাংশ ঝুললে বা এয়ারপোর্টে ব্যাগ ভর্তি করে ধরা পড়লে অবশ্য না বিশ্বাস করাই স্বাভাবিক। 

প্রাচীন সনাতনী শাস্ত্রে হীরণ্য কথার অর্থ সোনা। আবার কাঞ্চন অর্থেও শোনা। অনেক সময় ব্রাহ্মণ পূজার সময় কাঞ্চন মূল্যায় নমঃ বলে যেটা আওড়ান সেটা ও ঐ সোনা ও অর্থের স্তুতি ই করেন। যদিও শাস্ত্রে কাঞ্চন ও কাম এই দুই এর আশক্তিকে মহাপাপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গরুড় পুরাণে তো এই সমস্ত পাপের আবার শাস্তির মেনু কার্ডের উল্লেখ রয়েছে। যদিও আলোচনা সোনা নিয়ে তাই ঐ সব ভয়াবহ শাস্তির আলোচনায় না যাওয়াই ভালো। বেদে হীরণ্যগর্ভ সূত্র আছে সেটা বিষ্ণু কে উদ্দেশ্য করে। যদিও মতান্তরে রূদ্র বা শিবের ও হিরণ্যগর্ভ সূত্র বা শুক্ত আছে। শাস্ত্র বলছে অদিকালে পরাশক্তির গর্ভ থেকে তিন সুবর্ণ গোলক পা পিন্ড জন্ম নেয় তারাই হলেন ত্রি দেব। এদের নামেই এই হীরণ্যগর্ভ স্তুতি হয়। বাংলা প্রবাদে কৃতি বা যুগ শ্রেষ্ঠ সন্তানের মা কে রত্ন গর্ভা বা স্বর্ণ গর্ভা বলা হত। 

 বাড়িতে ধাতু ভস্ম করে বানানো যায়? প্রশ্নের উত্তর হবে না। পরশ পাথর বলে একটা ফিল্ম দেখেছিলাম যেখানে তুলসী চক্রবর্তী। একটা পাথর ঠেকিয়ে লোহাকে সোনায় পরিণত করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এটা সম্ভব নয়। কারণ পরশপাথর বলে কিছু হয়না। প্রাচীণ কালে ইউরোপে মহার্ঘ সোনা বানানোর কারখানা ছিলো। যারা বানাতেন তাদের বলা হত অ্যালকেমিস্ট। পারদের সঙ্গে সালফার বা শিসা ধাতুতে অন্য কোন ধাতু মিশিয়ে সোনা বানানোর কাজ চলতো পরীক্ষাগারে। কিন্তু বাস্তবে কেউ বানাতে পারেন নি সোনা। 

তাইতো এখনো দেশ ও বিশ্বের অর্থনীতি অনেকটা এই দামি ধাতুর দামের হেরফেরে ওঠা নামা করে। আজকের দিনে সোনার দাম প্রতি ভরি ৯৩২২০ টাকা। সোনা মহার্ঘ, অমূল্য আর হ্যাঁ ধনী ও সুন্দরী র অলংকার। সোনার ভার অনেক সেটা আপনার স্ত্রী বা বান্ধবী থেকে দেশের অর্থমন্ত্রী সবাই ভালো জানেন। সোনার দামের ওঠা পড়ায় শেয়ার মার্কেটে অনেক কিছু ওঠে নামে। কিন্তু সোনা এতো মহার্ঘ আর দুর্লভ কেন? আজ পর্যন্ত ২ লক্ষ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন সোনা উত্তোলন হলেও সোনা দুর্লভ ও মহার্ঘ। কেন তার জন্য পিরিয়ডিক টেবল জানতে হবে। সোনার আণবিক সংখ্যা ৭৯ আণবিক ওজন ১৭৯.৯৭ অত্যন্ত ভারী ও ঘন ধাতু। সৃষ্টির অদিকালে প্রথমে হালকা মৌল তারপর অক্সিজেন নাইট্রোজেন সহ গ্যাস পরে কার্বন, তারপর লোহা তৈরী হয়েছে ব্রহ্মান্ডে। সব মৌল ও ধাতু তৈরী হয়েছে নক্ষত্রের ভেতর। একে সুপারনোভার বাই প্রোডাক্ট বলা। চলে। কিন্তু নক্ষত্রের ঘনত্ব এতো হয়না যে সোনার মতো ভারী ধাতু তৈরী হবে। যখন নিউট্রন ষ্টার দ্বয় একে ওপরের সাথে ঘুরতে ঘুরতে ধাক্কা খায় প্রচন্ড শক্তিতে বিস্ফোরণ হয় গোটা ব্রহ্মান্ড কে আলোকিত করে সেই মহাজাগতিক ঘটনা। একে বলে কিলোনোভা। এতে দুটি অত্যন্ত ঘন পদার্থ দ্বারা নির্মিত বামন তারা বা তারার অবশেষ ধ্বংস হয়ে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর তৈরী করে। এই ধ্বংসলীলা থেকে ব্রহ্মান্ড জুড়ে গামা রেডিয়েশন এর স্ফুরণ তৈরী হয়। ভারী ধাতু যেমন সোনা, পারদ, শিসা সহ অক্টিনিয়ম সিরিজের ধাতু গুলি মানে তেজষ্ক্রিয় ধাতু গুলি এই কিলোনোভা র প্রোডাক্ট। ব্রহ্মান্ডে এই কিলোনোভা আকচার ঘটেনা তাই এই ধাতু গুলি অত্যন্ত দুর্লভ এবং দামি। 

অত্যন্ত ভারী ধাতু হওয়ায় সাধারণত পাথুরে গ্রহ, যেমন আমাদের পৃথিবী তৈরির সময় এই মূল্যবান ধাতু গুলি পৃথিবীর তরল কেন্দ্রে চলে গিয়েছিলো। পড়ে আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়ে আসার জন্য মূল্যবান ধাতু গুলি মাটির কাছাকাছি এসে গেছে। কিছুদিন আগে পড়ছিলাম সুইজারল্যান্ডের সার্ন ল্যাবরেটরি তে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রোটন বিম কে ভারী ধাতু নির্মিত টার্গেটে আঘাত করিয়ে সামান্য ট্রেস এমাউন্ট এ সোনা তৈরী হয়েছে। আশ্চর্য হয়েছিলাম কিন্তু পদার্থ বিজ্ঞানের কিছু মৌলিক ধারণা থাকায় অবাক হইনি। সোনার থেকে কম মূল্যবান ধাতুর সোনায় পরিণত হওয়া বিজ্ঞানের দ্বারা সম্ভব। হ্যাঁ পাগলামি না সত্যি সম্ভব। পদার্থ বিজ্ঞানের বিষয়টি পড়ানো হয় একে বলে ট্রান্স মিউটেশন অফ এলিমেন্ট। সোনার আণবিক সংখ্যা ৭৯ এবং আণবিক ওজন ১৭৯.৯৭ অর্থাৎ সোনায় ৭৯ টি প্রোটন ও ১১৮ টি নিউট্রন আছে। পারদের আণবিক সংখ্যা সোনার কাছাকাছি ঐ ৮০ আর আণবিক ওজন ১২০ অর্থাৎ ১২০ টি নিউট্রন ও ৮০ টি প্রোটন রয়েছে। কোন ভাবে যদি কিছুটা নিউট্রন ত্যাগ করে দেয় পারদ তাহলে পারদ সোনা হয়ে যেতে পারে।

 এমনি এমনি তো পারদ বা শিসা নিউট্রন ত্যাগ করবে না। দুটো উপায়ে করতে পারে। কোন সাইক্লোট্রন মেশিন দিয়ে লাগাতার প্রোটন বম্বার্ডমেন্ট করে সেটা করানো যেতে পারে বা কোন ফিশন নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরে ইউরেনিয়ম ফিউল রডের রেখে নিউট্রন দ্বারা লাগাতার আঘাত ঘটিয়ে বানানো যেতে পারে। একটা পদার্থ থেকে এরকম আরেকটা পদার্থে রূপান্তর কেই বলে ট্রান্সমিউটেশন অফ এলিমেন্টস। সম্প্রতি আমেরিকার একটি স্টার্ট আপ কোম্পানি দাবী করছে তারা কৃত্রিম পরীক্ষাগারে সোনা বানাবে। তাই নিয়ে আলোড়ন পৃথিবী জুড়ে। সম্প্রতি অবশ্য সিডিং পদ্ধতিতে ইনকিউবেটরে রেখে প্রচন্ড চাপ ও তাপে ল্যাবরেটরি তে হিরে তৈরী হচ্ছে। সোনাও তৈরী হবে এতে আশ্চর্য কি। শুধু একটা জিনিস ভেবে ভালো লাগছে সোনার অহংকার কমবে তাঁর মূল্য বোধহয় অদূর ভবিষ্যতে অত মহার্ঘ থাকবে না।

class="separator" style="clear: both; text-align: center;">style="text-align: justify;">
style="text-align: justify;">
 
bannerbanner




style="text-align: justify;">


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার