ভারতবর্ষের মাটিতে বহুত্ববাদের সংকট

  ভারতবর্ষের মাটিতে

  বহুত্ববাদের সংকট



বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়

সমাজ ও পরিবেশকর্মী, 

১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে মধ্যরাতে ভারতবর্ষের মানুষ দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা পেল। স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ-শাসিত এই উপমহাদেশের মানুষ জানতে পারল যে কেউ ভারতীয়, কেউ পাকিস্তানি। তার আগে যারা লাহোরে বাস করত, বাংলাদেশের খুলনায় বাস করত, তারা সবাই নিজেদের ভারতীয় বলত। কিন্তু এক লহমায় দেখা গেল ভারতবর্ষের জনসংখ্যার একটি অংশের কেউ হয়ে গেল পাকিস্তানি, আর বাকি অংশ হল ভারতীয়। 

এই দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা পাবার পর থেকে ভারতে আরম্ভ হল গোলযোগ। ভারতের নাগরিক কারা? ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে বন্টিত হবে? ভারতের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে অর্থ আছে, তা কীভাবে বিভক্ত হবে? এসব নিয়ে বহু জটিল প্রশ্ন তখন কিন্তু সবার সামনে চলে এসেছে। যেসব রাজনীতিবিদ ভারতবর্ষকে দুটুকরো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এসব সমস্যাগুলি যে হবে জেনেও ভারতবর্ষকে দু'টুকরো করার যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেখানে কিন্তু এইসব সমস্যার সমাধানগুলি লেখা ছিল না। এর ফলে পরবর্তী ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়। এই সংকট আজও চলছে। 

ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বহুত্বের মধ্যে এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এই সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষার মানুষের অধিকারের কথা ছিল। ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে যাকে গ্রহণ করা হল, তার মধ্যেই বলা হল যে, ভারতবর্ষের মাটি সবার জন্য। এখানে সমস্ত রকমের মানুষ মিলেমিশে একসাথে বাস করবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ভারতবর্ষের মাটিতে আর্য, অনার্য নানা ধরনের মানুষের বাস। ভারতবর্ষের মাটি বেশ কয়েকটি ধর্মের জন্ম দিয়েছে, যেমন- হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, শিখ ধর্ম, জৈন ধর্ম ও অন্যান্য ধর্ম। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই ধর্ম-সৃষ্টিকারীরা কিন্তু প্রত্যেকেই অন্য ধর্মের ওপর কখনোই কোন আক্রমণের কথা বলে যাননি। ভারতের মানুষ যে যার নিজের মতো করে ধর্মীয় আচার পালন করেছেন। এর মধ্যেও কিছু সংকট হলেও একটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলা ছিল যে, আমরা বহুত্বের মধ্যেই বেঁচে থাকব মিলেমিশে। 

পরবর্তীকালে ভারতে যখন সংবিধান রচনার প্রশ্ন এল, তখন সবচেয়ে বড় যে সংকটটি সংবিধান প্রণেতা ডঃ বি আর আম্বেদকরের সামনে এসেছিল তা হল, এদেশে নাগরিকত্ব কীভাবে পাওয়া যাবে। এ নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনার পরে ভারতবর্ষের সংবিধানে একটি অধ্যায় করা হল যেখানে পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া হল, কারা ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব পাবে, বা পাবে না। সংবিধানে এই নাগরিকত্বর বিষয়বস্তুর মধ্যে পাঁচটি থেকে আটটি আর্টিকেল ছিল। যে বিষয়বস্তুগুলি এখানে আলোচিত হয়েছিল তা হল, যারা পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছেন, যাদের জন্ম ভারতে, যারা ভারতবর্ষ থেকে চলে যাচ্ছেন কিংবা যারা পূর্ব বা পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাস করছেন, তারা যদি ভারতবর্ষে চলে আসেন, তাহলে কী ঘটবে এসব নিয়ে বেশ কিছু বিবরণ সেখানে দেওয়া হল। এসব বিষয়ে মোকাবিলা করার জন্য সংবিধানে একটি অধ্যায় (দ্বিতীয়) রচিত হয়েছিল। 

পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালের ভারতে পার্লামেন্টে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট প্রণীত হয়। এই অ্যাক্টে পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া হল নাগরিকত্ব নিয়ে সংবিধানে যে কথাগুলি বলা আছে, অক্ষরে অক্ষরে সেগুলিকে মানা হবে। নাগরিকত্বের বিষয়বস্তুটি সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্র সরকারের অধীনে। এ ব্যাপারে রাজ্যের কোন অধিকার নেই, যদি না কেন্দ্র সরকার এই ব্যাপারে রাজ্যকে ক্ষমতা প্রয়োগ করার কোন আদেশ দেয়। সাম্প্রতিককালে যে ঘটনা ঘটছে সেটি বেশ অদ্ভুত। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের নানান প্রান্তে যত মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছে, তাদের প্রায় প্রত্যেককেই বলে দেওয়া হচ্ছে যে তারা ভারতবর্ষের নাগরিক নয়। আর বাংলা ভাষায় কথা বললে তাদেরকে বলে দেওয়া হচ্ছে তারা এদেশের নয়, তারা পড়শী বাংলাদেশের নাগরিক। এই পরিমণ্ডলটি কিন্তু গোটা ভারতজুড়েই তৈরি হয়ে গেছে। 

ভারতে নানা সময়ে আঞ্চলিকতাবাদ জন্ম নিয়েছে। এই আঞ্চলিকতাবাদের ফলে বিভিন্ন রাজ্য থেকে ভিন্ রাজ্যে যেসব মানুষ কাজের জন্য যাচ্ছে, তারা কিন্তু সেখানে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। অসম রাজ্যে বাঙালিকে খেদিয়ে দেওয়ার এক চূড়ান্ত প্রবণতা আমরা দেখেছি। এতদিন আমরা জেনেছি যে, ভারত সরকার প্রদত্ত আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এগুলি এদেশের মানুষের নাগরিকত্বের পরিচায়ক। সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, শিক্ষাক্ষেত্র, চাকরিক্ষেত্র, পেনশন সমস্ত ক্ষেত্রেই আধার কার্ড লাগে। একেই চূড়ান্ত মান্যতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এখন নাগরিকত্বের প্রশ্ন যখন উঠে আসছে, তখন বলা হচ্ছে যে আধার কার্ড কার্যকরী হবে না। এ এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া। তাহলে এতদিন ধরে উপরিউক্ত সমস্ত ক্ষেত্রে কেন আধার কার্ডকে মান্যতা দেয়া হল? কেন্দ্র সরকার তাহলে কেন উদ্যোগ নিয়ে এটি করল? আবার নির্বাচন কমিশন থেকে যেসব মানুষকে ভোটের কার্ড দেয়া হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও বলে দেওয়া হল এই কার্ডটি নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। কেন গ্রহণযোগ্য নয়? কমিশন বলছে যে, এই কার্ড জাল বা ভুয়ো হতে পারে। তাই একে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এ এক অদ্ভুত যুক্তি। প্রয়োজন ছিল যে সব জাল বা ভুয়া নথি দেশের মধ্যে রয়েছে, সেগুলিকে ধরে বাতিল করা। কিন্তু তা না করে আসল-নকল সবগুলিকেই একসঙ্গে বাতিল করা হল। এমনকি যারা এদেশে জন্মেছে তারাও এর মধ্যে পড়ে গেল। সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ! 

এরই মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে। শ্রমিকদের মধ্যেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভাগ আছে, যেমন- সংগঠিত শিল্পের শ্রমিক ও অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিক। এছাড়াও আরেকটি ভাগও আমরা দেখতে পেলাম -- পরিযায়ী শ্রমিক, যারা বসবাস করে একটি রাজ্যে, আর কাজ করে অন্য আরেকটি রাজ্যে। কাজ ফুরোলে তারা আবার নিজের রাজ্যে ফিরে আসে। আবার তারা পরে ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যায়। এই পরিযায়ী শ্রমিকের বিষয়বস্তুটি কিন্তু নতুন নয়। সুদূর ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে আদিবাসীদের সুন্দরবনে এনে বসানো হয়েছিল। তারা আজও সুন্দরবন রয়েছে। উত্তরবঙ্গের চা বাগানেও অসংখ্য আদিবাসী আছে। এই আদিবাসীদের উৎস খুঁজতে গেলে দেখা যাবে তারা ভিন্ রাজ্য থেকে এসেছে। তারপরে এখানেই বসবাস করছে। এটা তো নতুন কোন ব্যাপার নয়। ভারতবর্ষে যতদিন ইটশিল্প চালু রয়েছে, সেই ইটশিল্পের শ্রমিকরা বিহার, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড় ইত্যাদি আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে এসে কাজ করেছে। ভারতবর্ষের যেখানে যত নির্মাণ কার্য চলছে, আদিবাসীরা সেখানে গিয়ে কাজ করেছে। পরিযায়ী শ্রমিক বা আদিবাসীদের শ্রম দিয়ে এসব কাজ করানোর সময় রাষ্ট্রের কিন্তু একবারও মনে হয় না যে, তারা নাগরিক না নাগরিক নয়! এদের সর্বস্ব শোষণ করার সময় রাষ্ট্রের মনে হয় যে এরা ভারতের নাগরিক। সামান্য অর্থের বিনিময়ে আমরা এদের শ্রম কিনতে পারি। এ এক ভয়ানক দুর্ভাগ্য। 

পরিযায়ী শ্রমিক কারা হবে সেই বিষয়ে ১৯৭৯ সালের এক আইন রয়েছে। এই আইনে খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোন মানুষ যদি কাজের খোঁজে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যায়, তার এক নথি তৈরি করতে হবে। এই নথি সেই রাজ্যের কাছে থাকবে। আবার কোন রাজ্য থেকে ভিন্ রাজ্যে কত মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজের জন্য যাচ্ছে, সেই নথিও সেই রাজ্যের কাছে থাকবে। কিন্তু ভারতের কোন রাজ্য এই কাজটা করেনি। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন সময় ডানপন্থী, বামপন্থী, মিলিজুলি বিভিন্ন সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু কখনোই এই কাজটি আমরা করিনি। যতদূর জানা যায় যে একমাত্র কেরল রাজ্যে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কিছু কাজ হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে ওখানে যেসব মানুষ নির্মাণ কাজের জন্য যেত, তাদের ওখানে অতিথি শ্রমিক বলা হত। এরই সুফলে কেরলে এখনো এই পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে কোন সমস্যা দেখা দেয়নি। অসংখ্য মানুষ বাইরে থেকে গিয়ে ওখানে কাজ করছে।

আমাদের রাজ্যের প্রতিটি ইটখোলায় কমপক্ষে ৩০০ জন করে আদিবাসী শ্রমিক কাজ করে। তাদের কোন সমস্যা এখনও পর্যন্ত না হলেও তাদের নথিভূক্ত করা হয়নি। ভারতবর্ষে নানান জায়গায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রচুর শ্রমিক তাদের দক্ষতার জন্য বিভিন্ন ধরনের কাজে লিপ্ত রয়েছেন। অথচ ভারতের কোন রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কত শ্রমিক কী কী কাজে লিপ্ত রয়েছে, সেই নথি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কখনো জোগাড়ের চেষ্টা করেনি। এক্ষেত্রে ভারতবর্ষে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট এবং পরিযায়ী শ্রমিক আইন আমরা কখনোই কার্যকরী করলাম না। এমনকি ভারতবর্ষের সংবিধানে দ্বিতীয় অধ্যায়ে যেটি লেখা রয়েছে, সেটিও আমরা গুরুত্ব সহকারে পড়লাম না। এরই ফলে নির্বাচন কমিশন নামে এক স্বশাসিত সংস্থা নাগরিকত্ব নিয়ে নানা রকম তুঘলকী নিদান দিচ্ছে। এতে বহুত্ববাদের বদলে আঞ্চলিকতাবাদের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ভারতবর্ষের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর আঘাত এসেছে। এর পরিণতি ভয়ংকর। 

আমরা তো শিশুকাল থেকে শুনে এসেছি যে "নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান/ বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।" বিশ্বকবি রচিত আমাদের জাতীয় সংগীতেও একই কথা বলা রয়েছে, যা প্রতিটি রাজ্যকেই গাইতে হয়। অথচ আমরা এসব কিছুই মানব না। কেবল ভোটের জন্য আমরা আইন কার্যকরী করব না। আমরা রাজনীতি করব। আমরা আমাদের প্রয়োজনমতো গরিব মানুষের শ্রম গ্রহণ করব। প্রয়োজন মিটলে ইচ্ছেমতোন তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেব। অর্থাৎ কিনা একমাত্র সংকটে পড়ছে আমাদের দেশের দরিদ্র শ্রেণি। রাজ্য সরকার বা কেন্দ্র সরকার বা বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত অন্যান্য মানুষরা কিন্তু কোন সমস্যায় পড়ছে না। একমাত্র আক্রান্ত হচ্ছে, সমস্যায় পড়ছে গরিবগুর্বো মানুষগুলো যাদের মূলধন একমাত্র ঘামে ভেজা শরীরের শ্রম। এদের সংখ্যাকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে। আর প্রয়োজন ফুরোলেই এদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এর পেছনে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের দুরভিসন্ধি। 

বহুধা সংস্কৃতি দিয়ে গড়ে ওঠা ভারতবর্ষের যে মাটি, সেই মাটি আজ আক্রান্ত। এই সংকটের মধ্যে ভারতবর্ষের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে সমস্ত বর্ণ-ধর্ম-ভাষার মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে পথ চলার আমাদের ভারতীয় সংবিধানের নির্দেশিত যে পথ, তাকে মানতেই হবে। না হলে আমাদের পতন অনিবার্য। গরিব খেটে খাওয়া মানুষরা আরও আক্রান্ত হবে। আজ যারা সমাজের উচ্চ স্তরে বসবাস করছে, তারাও কিন্তু এই সংকটে ছাড় পাবে না আগামীদিনে। তাই আসুন, আগুন নিয়ে না খেলে, সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পথে নেমে এই যে ঠান্ডা সন্ত্রাস চলছে, তাকে আমরা প্রতিহত করি।  

class="separator" style="clear: both; text-align: center;">style="text-align: justify;">
style="text-align: justify;">
 
bannerbanner




style="text-align: justify;">


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার