এই মুষলপর্বের হলফনামা

 এই মুষলপর্বের হলফনামা 


পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে মনে রেখে


শ্রুতিনাথ প্রহরাজ


গতবছর ঠিক এই দিনটায় (৮ আগস্ট, ২০২৪), দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানার শেষ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ৮০ বছর বয়সে দীর্ঘ রোগভোগের পর পাড়ি দিলেন না ফেরার দেশে। শরীর এতটাই অসমর্থ্য ছিল যে শেষের দিকে তিনি কোন কাজেই অংশ নিতে পারেননি। কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায় কেটেছে তার শেষের দিনগুলি। মাঝে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, চিকিৎসকদের সহায়তায় মনের জোরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এবারেও তেমন কিছু হতে পারতো বলে শেষ যাত্রা শোক মিছিলে শুভানুধ্যায়ীরা অনেকেই আক্ষেপ করছিলেন। তিনি সেই সুযোগঌ আর দেননি। দীর্ঘ রোগভোগের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নিয়েছেন নিজের ঐ ছোট্ট দু- কামরার ফ্লাটে। আসলে মনের পরিসর যদি কারো অনেকটা বিস্তৃত হয়,তাহলে তাঁর বসবাস বা পার্থিব সম্পদ রক্ষার জন্য যে নতুন করে বাড়তি জমির দরকার হয় না,তা প্রমাণ করে গেলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

একটি প্রচলিত দৈনিক সংবাদপত্র তাঁর প্রয়াণের পর শিরোনামে লিখেছে 'অভিমানে বিদায় নিলেন বুদ্ধদেব।' এক সময় এই পত্রিকা গোষ্ঠী দিনের পর দিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে কুৎসা রটিয়েছে। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম ইত্যাদিকে ঘিরে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর তৈরি করা মিথ্যা ভাষণকে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার করেছে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য। এর পিছনে ছিল কর্পোরেট গোষ্ঠীর একাংশের প্রত্যক্ষ মদত,যারা চায়নি সিঙ্গুরে বা নন্দীগ্রামে বা রাজ্যের অন্যত্র তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে ডিঙিয়ে টাটারা বা অন্য কেউ শিল্প কারখানা করে তুলুক। সেই সময় মমতাকে শিখন্ডি করে তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে। সর্বোপরি লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করা। নয়া উদার অর্থনীতির আক্রমণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই আন্দোলনে থাকা বামপন্থীদের দুর্বল করতে মমতা দেবী ও তার সঙ্গী সাথীদের ওরা অনেক বেশি নিরাপদ মনে করেছে।

সঙ্গত কারণে প্রশ্ন ওঠে,একি একা বুদ্ধদেবের অভিমানে চলে যাওয়া নাকি রাজ্যবাসীর আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নকে ঘিরে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এক স্বপ্নদ্রষ্টার জীবনাবসান। এই মৃত্যু আসলে রাজ্যে বর্তমানের এই মুষলপর্বের সার্বিক পটভূমির অংশমাত্র। এই প্রয়াণ সারা রাজ্যবাসীর চরম স্বার্থহানিকর এই মুষলপর্বের পটভূমির অংশমাত্র। বস্তুত এই চক্রান্তের সূচনা হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন সংগ্রামে গড়ে ওঠা বামফ্রন্ট সরকারের পথ চলার শুরু থেকেই। মরিচঝাঁপি থেকে শুরু করে পুরুলিয়ায় বিমান থেকে অস্ত্রবর্ষণ পর্যন্ত একের পর এক চক্রান্ত সংগঠিত হয়েছে বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্য নিয়ে। শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদার সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি সাম্রাজ্যবাদ পুষ্ট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট গোষ্ঠী। তাই উইকিলিক্স এর ভাষায় তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন বিরোধী ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের প্রধান নেত্রী মমতাকে ওরা 'কালচার'করেছে। লক্ষ্য ছিল একটাই,শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের সাথী বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করা।

সেই চক্রান্তের রেশ ধরেই বুদ্ধদেব বাবুর মুখ্যমন্ত্রীত্বের সময় কালেও (মূলতঃ ষষ্ঠ ও সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে) সরকারের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার লক্ষ্যে একের পর এক পরিকল্পিত আক্রমণ সংগঠিত হয়েছে,যা কোন ব্যক্তি বিশেষের অসম্মান বা অভিমানের বিষয় ছিল না, বরং অনেক বেশি ক্ষতিকর বিষয় ছিল রাজ্যের উন্নয়ন ও রাজ্যবাসীর স্বার্থ সুরক্ষার প্রশ্নে। বাস্তবে ঘটেছেও তা। বর্তমানে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেধাবী ও কর্মক্ষম যুবক যুবতীদের মধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় যে চরম হতাশা আমরা লক্ষ্য করি,তা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এই মুষলপর্বের অন্যতম কারণ। এছাড়া, নীতিহীন মূল্যবোধহীন ক্ষমতালোভের সংকীর্ণ রাজনীতি, সীমাহীন দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি হলো অন্যান্য কারণ। এর ফলস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মনন ও ঐতিহ্যের গুরুতর অবনমন ঘটেছে।

হ্যাঁ বুদ্ধদেব বাবুর কিছুটা আক্ষেপ ছিল একথা অস্বীকার করার নয়। ২০১১-র পর সংবাদমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি তা স্বীকারও করেছেন। কৃষির উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে শিল্প গড়ে তোলার, রাজ্যের মেধার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ তাঁর নেতৃত্বে সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার নিতে চেয়েছিল, তা রাজ্যবাসীকে বোঝাতে না পারার আক্ষেপ। বস্তুত ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকার গঠন হওয়ার পরেই তিনি এ বিষয়ে জোর দিতে শুরু করেছিলেন। বামফ্রন্ট দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সার্থক বাস্তবায়নের পর সেই সময় খানিকটা গতানুগতিক কর্মসূচির জড়তাকে কাটিয়ে ওঠে নতুন আঙ্গিকে কিছু করবার তাগিদ তৈরি হয়েছিল জনজীবনের বাস্তবতাকে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। সেই সময় বুদ্ধদেব বাবুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার জনগণের চাহিদাকে মর্যাদা দিয়ে,পূর্বেই গৃহীত সময়পোযোগী নতুন শিল্পনীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে শুরু করে। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার গড়ে ওঠার আগের নির্বাচনে সেই কারণে বলা হয়েছিল "কৃষি আমাদের ভিত্তি শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ"। রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন সহ যুব সমাজের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই ডাক দিয়েছিল বামফ্রন্ট। ২৩৫ টি আসন জয়ী করে মানুষ বুদ্ধদেব বাবুকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সরকারের নেতা হিসেবে সেই কাজকে বাস্তবায়িত করার।

নয়া উদার অর্থনীতি এ দেশে চালু হওয়ার পর চতুর্থ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সময়োপযোগী শিল্পনীতি গ্রহণ করা হয় যার খসড়া রচনা করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন

বুদ্ধদেব বাবু ও নিরুপম সেন। এই শিল্পনীতির অভিমুখ ছিল ভূমি সংস্কারের ফলে এ রাজ্যে কৃষি উৎপাদনের সাফল্যের পথ ধরে সার্বিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শিল্প গড়ে তোলা বিশেষতঃ উৎপাদন শিল্প যেখানে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকারের প্রধান কর্মসূচি ছিল এটাই। কৃষির উন্নতি কে সংহত করা, ছোট মাঝারি ও বড় শিল্প গড়ে তোলার পরিকাঠামো নির্মাণ করা, রাজ্যের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি পরিবেশ অনুযায়ী শিল্প সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করা। শুধু সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল এ রাজ্যে। সেইসময় সরকার সিদ্ধান্ত নিল, শিল্প তালুক গড়ে তোলার যেখানে সরকার যাবতীয় পরিকাঠামো তৈরি করে দেবে আর শিল্পপতিরা তাদের উদ্যোগ গড়ে তুলবেন এই ছিল প্রয়াত বুদ্ধবাবু নিরুপম বাবুদের সম্মিলিত ভাবনা। সেইমতো এই রাজ্যে ২০০১ থেকে ২০১১ এর মধ্যে উত্তর থেকে দক্ষিণ বেশ কিছু শিল্পতালুক গড়ে উঠেছিল। সরকারি ও বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাস করা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা এইসব শিল্পতালুকে কাজের সুযোগ পেয়েছে। আজ যেখানে নবান্ন,আদতে তা তৈরি হয়েছিল হোসিয়ারি শিল্পের উৎপাদন ও কেন্দ্রীয় বাজারের কথা ভেবে।

পঞ্চম বামফ্রন্ট সরকারের সময় গৃহীত রাজ্যের নয়া শিল্প নীতির পথ ধরে বিদেশি বিনিয়োগকেও স্বাগত জানানো হয়েছিল। সল্টলেকে গড়ে উঠেছিল সেক্টর ফাইভ যা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের দিশা তৈরি করেছিল। রপ্তানি বাণিজ্যের বিষয়ে জোর দেওয়ার জন্য রাজ্যের ভিতরে গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এস ই জেড। এখানেও প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস কে ঘিরে সমগ্র হলদিয়া -নয়াচর- নন্দীগ্রাম অঞ্চলে বৃহৎ পেট্রো রসায়ন শিল্পের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল। এই বৃহৎ শিল্প পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য পরিকাঠামো নির্মাণে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিল শেষের তিনটি বামফ্রন্ট সরকার যার সূচনা করেছিলেন জ্যোতি বসু বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে। সেই সময় বিদ্যুতের বাড়তি উৎপাদন শিল্পের জন্য খুব জরুরী ছিল। আজ আর বিদ্যুতের সেই চাহিদা নেই কারণ রাজ্যে নতুন করে আর কোন শিল্প গড়ে ওঠেনি। বরং বুদ্ধবাবুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার বেশ কিছু নতুন শিল্প গড়ে তুলতে সক্ষম হলেও অধিকাংশ বড় ও মাঝারি শিল্প সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে আজকের এই মুষলপর্বের কারিগররা। যার ফলে বর্তমান প্রজন্ম হতাশায় ডুবে গেছে।

বুদ্ধদেব বাবুর স্বপ্ন ছিল কোন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে নয়, রাজ্যের শিক্ষিত মেধাকে রাজ্যের মধ্যে ধরে রাখার স্বার্থে। রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার কে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে। সামগ্রিকভাবে রাজ্যবাসীর সার্বিক জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কার্যকর করার লক্ষ্যে। আর সেই জন্য এই মানুষটিকে চূড়ান্ত হেনস্থার মুখে পড়তে হল। তাঁর স্বচ্ছ,পরিশিলিত ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার জন্য দিনের পর দিন কুৎসিত ভাষায় তাঁকে আক্রমণ করে গেছেন এরাই যারা এখন গান স্যালুট দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আদতে ওরা এসবের মধ্য দিয়ে সর্বনাশ করেছেন এই রাজ্যের অগণিত যৌবনের, যা এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে সবাই। এ এক চরম সঠতার নজির যা তৈরি করলেন তৎকালীন বিরোধীনেত্রী তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। তার কথামতো বুদ্ধদেব বাবুকে বারবার ফিরে আসতে হবে না কারণ স্বয়ং বুদ্ধবাবু পুনর্জন্মের তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু একটা কথা এই সুযোগে বলে নিতেই হবে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর কাজ ও আচরণের মধ্য দিয়ে শুধু আমাদের মত তাঁর অনুসারী সহযোদ্ধাদের নয়,এ রাজ্যের অগণিত মানুষের মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন,সেখানে থাকবেনও চিরকাল। মমতা দেবী কি চাইলেন বা নাশ চাইলেন তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা।

আমার এখনো মনে পড়ে সেই দিনটা,বিধানসভায় শপথ নেওয়ার পরে বামপন্থী বিধায়কদের প্রথম সভায় বুদ্ধদেব বাবুর সেই ঘোষণা,টাটা গোষ্ঠী আমাদের রাজ্যে অটোমোবাইল শিল্প গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে। সেই ঘোষণার সময় শুধু আবেগ নয়, দৃঢ় প্রত্যয় লক্ষ্য করেছিলাম বুদ্ধবাবুর চোখে মুখে। সার্বিক শিল্পায়নের লক্ষ্যে এ রাজ্যকে সারা দেশের মধ্যে মডেল হিসেবে গড়ে তোলার কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যয়। এর আগে পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পৌরসভা গুলির নিয়মিত নির্বাচন, আমূল ভূমি সংস্কার ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে বামফ্রন্ট সরকার সারা দেশে একটা নজির তৈরি করার সুযোগ পেয়েছিল। সেই বৃহৎ কর্মকাণ্ডের অংশীদার হিসেবে বুদ্ধবাবু চেয়েছিলেন সারা রাজ্যে নতুন আঙ্গিকে উন্নয়নের জোয়ার তৈরি করার। শুধু তাই নয়। বুদ্ধবাবুর মুখ্যমন্ত্রীত্বের প্রথম পাঁচ বছর অর্থাৎ ষষ্ট বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে কর্মসংস্থানের প্রশ্নে ছোট ও মাঝারি শিল্পে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ সে সময় সারা দেশের মধ্যে এই শিল্পে প্রথম স্থানে ছিল। যতদূর মনে পড়ে প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষ এই ছোট ও মাঝারি শিল্পে যুক্ত ছিলেন। আজ এই মুষলপর্বে তার অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। 

এর পরের ইতিহাস আপনাদের সবার জানা। কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় অতি বাম থেকে অতি দক্ষিণপন্থী সব শক্তি এককাট্টা হয়ে রাজ্যের শিল্পায়নের বিরোধিতা শুরুট করলো। শুধু সিঙ্গুর না, সর্বত্র এই অপচেষ্টায় মেতে উঠলো বিরোধীরা। সেই সময় বিধানসভায় দিনের পর দিন নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রীকে বিধানসভায় চলাকালীন ছাপার অযোগ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে ওরা। বিধানসভা কে চলতে দেওয়া হবে না এটাই ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্য। আমার মনে আছে সেসময় তৃণমূল দলের বিধায়কদের মধ্যে প্রথম সারিতে বসতেন বিরোধী দলনেতা পার্থ চ্যাটার্জি সহ সৌগত রায় ও সদ্যপ্রয়াত তৃণমূলের দপ্তরহীন মন্ত্রী সাধন পান্ডে। বিধানসভায় সিঙ্গুরের বিতর্ক চলাকালীন সাধন পান্ডে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে টাটা গোষ্ঠীর সমর্থনে কিছু কথা বললেন। এও বললেন,টাটারা এলে রাজ্যের মঙ্গল হবে কারণ অন্যান্য ছোট ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগীদের বিনিয়োগের প্রশ্নে উৎসাহ বাড়বে।। আমরা সবাই টেবিল চাপড়ে (বিধানসভায় ওটাই নিয়ম, হাততালি দেওয়ার সুযোগ নেই) তাঁকে সাধুবাদ জানালাম। ওমা, পরেরদিন গিয়ে দেখি, সাধন বাবুকে সামনের সারি থেকে একদম পেছনে সারিতে পাঠিয়ে দিয়েছে ওদের দল তৃণমূল কংগ্রেস। বুদ্ধবাবু বহুবার চেষ্টা করেছেন বিরোধীদের বোঝানোর মাধ্যমে একটা সহমত তৈরি করার। নন্দীগ্রামে কারখানার জন্য কারো জমি নেওয়া হবে না, বুদ্ধবাবু প্রকাশ্যে এই ঘোষণা করবার পরেও সেখানে নাশকতার কাজ থেমে থাকেনি। নকশালপন্থীদের একাংশকে সঙ্গে নিয়ে ওই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী তথা আজকের মুখ্যমন্ত্রী। এই কথা এখন আর আমাদের বলতে হয় না, শুভেন্দু মমতার বাকযুদ্ধ শুরু হলে উনারাই এসব সত্য উগরে দেন। এমনকি শালবনির শিল্প প্রকল্পের উদ্বোধনেও নাশকতাবাদীদের কাজে লাগিয়েছিল এরা। ক্ষমতা দখলে নেশায় এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন মমতা যে,রাজ্যবাসীর স্বার্থ বা ভবিষ্যতের কথা ভাববার ফুরশত হয় নি তাঁর।

শুধু নতুন শিল্প গড়ে তোলা না, চালু রুগ্নশিল্প গুলিকে সজীব করে তোলার লক্ষ্যেও উদ্যোগ নিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। এখানে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে আমাদের এই অঞ্চলের হিন্দমোটর কারখানার কথা। একসময়ের বহু ঐতিহ্যশালী এই কারখানা আধুনিকীকরণের অভাবে ধুঁকছিল। শুধু উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া নয়, ব্যাপকহারে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছিল। সেই সময় মূলত বুদ্ধদেব বাবুর উদ্যোগেই এই কারখানার আধুনিকীকরণের বিষয়ে বিড়লা গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু হয়। কারখানার সি আই টি ইউ সহ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলিও একই দাবী করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে। সেইমত শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা করবার অগ্রাধিকার দিয়ে, বিড়লা গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের হিন্দমোটরের অব্যবহৃত জমির একটি অংশ বিক্রি করার চুক্তি হয়। শর্ত ছিল এই জমি বিক্রি করে যে টাকা উঠে আসবে তা দিয়ে শ্রমিকদের যাবতীয় বকেয়া মেটাতে হবে, কারখানার সময়পোযোগী আধুনিকীকরণ করতে হবে এবং তার জন্য বিড়লা গোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় আধুনিক উপকরণ কিনতে হবে। কোনভাবেই কারখানা কে বন্ধ করার জন্য এই চুক্তি হয়নি, হয়েছিল হিন্দমোটর কারখানা কে বাঁচিয়ে তোলা যাতে নতুন করে আর কোন শ্রমিকের কর্মচ্যুতি না ঘটে। বরং নতুন উৎপাদনের মাধ্যমে আগামী দিনে এই কারখানায় যাতে নতুন করে আরো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তা হয়নি। কারণ, মালিক সি কে বিড়লা গোষ্ঠীও ছিল এ রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করার বৃহত্তম ষড়যন্ত্রকারি কর্পোরেট গোষ্ঠীর অংশীদার। রাজ্যের শিল্প দপ্তরকে ভুল তথ্য দিয়ে বিপথে চালিত করবার চেষ্টা করেছিল ওরা। ওদের আসল লক্ষ্য ছিল কারখানা বন্ধ করে এখান থেকে পাত্তাড়ি গোটানো এবং বিরোধীদের সহযোগিতায় যাবতীয় দায় বুদ্ধবাবুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। একসময় এই সরকার থেকে যাবতীয় সুযোগ নিয়েছে ওরা। পরে অন্যদের সাথে ওরাও সরকার ভাঙার খেলায় মেতে উঠেছে।

বুদ্ধবাবুর প্রয়াণের পর মমতাদেবী হঠাৎ গান স্যালুট দেওয়ার জন্য ক্ষেপে উঠেছিলেন। আসলে গান অর্থাৎ বন্দুক নিয়ে স্যালুট না দিলেও বস্তুত জিরো পয়েন্ট থেকে বুদ্ধবাবুদের কপালে বন্দুক ঠেকানোর কাজ অনেক আগেই শুরু করেছিলেন মমতা ও তার দলবল। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে কৃষির ভিত্তিতে শিল্পায়নের কাজে বুদ্ধবাবু নিরুপমবাবুরা যদি সফল হতেন, এই রাজ্য উন্নয়নের প্রশ্নে কয়েক কদম এগিয়ে যেত শুধু তাই নয়, শত প্ররোচনাতেও বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব হতো না। তাই সেই সময় জনগণের জীবনকে বাজি রেখে বুদ্ধবাবুদের কপালে বন্ধুর ঠেকিয়েছিলেন মমতা দেবী।

আমি সচেতনভাবেই বুদ্ধবাবুর প্রয়াণের এই সময়টাকে অন্ধকারের সময় না বলে মুষলপর্ব বলেছি। পুরাণে উল্লেখ আছে, মুষলপর্ব হলো একটা অভিশপ্ত সময়,যা অনেকটা পূর্বের পাপের কর্মফল গোছের। এ কথা তো অস্বীকার করা যাবে না যে,মমতা দেবী ও তার সাগরেদদের করা অনাচারের কর্মফল ভোগ করতে হচ্ছে আজকে এ রাজ্যের মানুষকে। যারা একসময় বুদ্ধদেব বাবুকে “খুনি' ‘স্বৈরাচারী' ইত্যাদি ইত্যাদি নানা অলংকারে ভূষিত করেছেন, তাঁর স্বচ্ছ সংস্কৃতিমনা আধুনিক ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেছেন,তারাই তাঁর প্রয়াণের পর বলেছেন, "এমন মানুষ যেন বারে বারে ফিরে আসে এই পৃথিবীতে"! কি অদ্ভুত কপাটতা তাইনা? আমরা তাঁর সহযোদ্ধা অনুরাগীরা চেয়েছিলাম, কোন গান স্যালুট নয় তিনি বিদায় নিন অগণিত জনতার চোখের জলে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তোলা মুষ্টিবদ্ধ শপথে। ঠিক তাই হয়েছে। রাজ্যবাসী দেখেছেন কলকাতার রাজপথে নতুন এক জনজোয়ার, এই কপটতা এই অরাজকতাকে কাটিয়ে উঠে বুদ্ধদেব বাবুর স্বপ্নকে সফল করার শপথে মেতে ওঠা জনজোয়ার।

পরিশেষে বুদ্ধদেব বাবুর অনুবাদ করা বেটর্ল্ট ব্রেশট-এর একটি কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে আমার এই শ্রদ্ধার্ঘ্যের ইতি টানতে চাই।

শেখো, যে মানুষ আশ্রমে আছোশে

শেখো, যে মানুষ জেলখানায় আছো

শেখো,ঘরের বউ, যে রান্নাঘরে আছো

শেখো বয়স যার ষাট।

বিদ্যালয়ে খোঁজো, যারা ঘর ছাড়া

তীক্ষ্ণ কর উপহাস, যারা ভয়ে ভীত

ক্ষুধার্ত মানুষ হাতে নাও বই,

এটাই হাতিয়ার তোমার।

নেতৃত্ব দিতে হবে তোমাকেই।


লাল সেলাম কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

class="separator" style="clear: both; text-align: center;">

এরকম বিজ্ঞাপন দিতে ইচ্ছুক হলে

 আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন

 খরচ মাত্র ৩০০ টাকা।

bannerbanner




style="text-align: justify;">

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার