আমরা সবাই অপরাধী
আমরা সবাই অপরাধী
ছবি: WBJDF র ফেসবুক পেজ সূত্রে প্রাপ্তলিখছেন আইনজীবী বিশ্বজিৎ মুখার্জি
রবীন্দ্রনাথ একটা কথা বলেছিলেন, যে অপরাধ করে, আর যে অপরাধ সহ্য করে, তারা উভয়েই সমান অপরাধী। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের এই কথাটি আজকে পশ্চিমবঙ্গের বুকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক কালে রথযাত্রা হল। বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিল্পীরা সাজগোজ করে বিভিন্ন মন্দিরে পূজা দিলেন। তাঁদের অভিনীত সিনেমা যাতে ভালো করে চলে তার জন্য প্রার্থনা করলেন মন্দিরে। কিন্তু এই রথযাত্রাতে কোন সময়েই কোন মানুষ ভাবল না যে, কয়েকদিন আগে একটি ৯/১০ বছরের মেয়ে তামান্না কিছু মানুষের চূড়ান্ত অসভ্যতা ও বর্বরতার শিকার হয়ে বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা গেল। মেয়েটির মৃত্যু নিয়ে তারপর রাজনৈতিক চাপান-উতোর চলতেই থেকেছে। রাজনৈতিক চাপান-উতোরের পরেও নাগরিক সমাজ বলে একটা বিষয়বস্তু থেকে যায়। নাগরিক সমাজের ভূমিকা কী? আরজিকর এর অভয়াকাণ্ডের পরে যেভাবে নাগরিক সমাজ ফুঁসে উঠেছিল বা রাস্তায় নেমেছিল, তার সামান্য অংশটুকু দেখতে পেলাম না তামান্নার নৃশংস মৃত্যুর পরে। সম্ভবত মেয়েটি অত্যন্ত গরিব বলে।
ঠিক এই ভাবেই আমরা দেখেছি আমাদের রাজ্য সরকার কিংবা আমরা সবাই শিশুমৃত্যু দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নির্বাচনের সময় বর্ধমানে কয়েকটি পথশিশু খেলা করছিল। সেখানে তারা বলের মতো কিছু জিনিস দেখতে পায়। শিশুরা সেগুলোতে হাত দিতেই সেগুলি ফেটে যায়। তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পরে এদের খোঁজ আর কেউ রাখেনি। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মধ্যে মারপিট করে বোমা ফেলে রেখে গিয়েছিল। তাতেই এক পথশিশু মারা গেল। এতে কার কী আসে যায়? শিশুটির বাবা-মাও বসে আছে আশায়, যদি সরকার আমাদের কিছু টাকা দেয়। আরেকটি আক্রান্ত শিশুর বাবা-মা অবশ্য কিছু টাকা পেয়ে সেখান থেকে চলে গিয়েছিল অন্যত্র। যাক, কিছু টাকা তো পাওয়া গেল। আরেকটি ঘটনার কথাও মনে পড়ছে। এক শিশু সকালবেলায় ফুল তুলতে বেরিয়েছিল। সে দেখল ফুলের বাগানে একটা গোল মতো কী যেন পড়ে রয়েছে। তাতে সে হাত দেওয়া মাত্র বিস্ফোরণে তার হাতটি উড়ে গেল। সেটাও ঠিক নির্বাচনের প্রাক্কালে। সেই মেয়েটি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে চেয়েছিল তার ডান হাতটি ফিরিয়ে দিতে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেটা ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
আমাদের রাজ্যে তথা ভারতের নানান রাজ্যজুড়ে মহিলাদের উপর অত্যাচার এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে আমাদের এখানে নাগরিক সমাজ ছিল। বিদ্বজ্জন বলে যাঁদের কথা আমরা বলি, যাঁরা কথায় কথায় মোমবাতি হাতে পথে নেমে পথ কাঁপিয়ে দিতেন, দু'চারটে কবিতা লিখে ফেলতেন, গরম গরম বক্তৃতা দিতেন, বিভিন্ন ঘটনায় সরকারের তরফের কথন চাইতেন, তাঁরা আজকে কোথায়? কারণ তাঁরাও সম্ভবত আজ বিভিন্নভাবে আজকে যে সরকার চলছে কিংবা আজকের যে প্রশাসন চলছে, তার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেছেন। কারণ তাঁদেরও কিছু পাওনা আছে। পাওনার জন্য তাঁরা তাঁদের সত্তাকে ভুলে গেছেন।
এসব ঘটনা তো ঘটেই চলেছে। আমরা যদি ছেড়েও দিই এসব বিদ্বজ্জনের কথা, এখনো নাগরিক সমাজ তো বেঁচে আছে। নাগরিক সমাজ কী করছে? যে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজ এত লড়াই দেখেছে, ছিন্নমূল মানুষের লড়াই দেখেছে, খাদ্য আন্দোলন দেখেছে, স্বাধীনতার আগে বিভিন্ন সময়ে সে আন্দোলন করেছে, একটার পর একটা তাজা ছেলে বুকে গুলি নিয়েছে শুধু দেশটাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে স্বাধীন করবার জন্য, আজকের নাগরিক সমাজ, আজকের যুবসমাজ, আজকের যারা প্রবীণ মানুষ, তাঁরা কী করছেন? তাঁরা প্রত্যেকেই আজকে সুখী গৃহকোণে বসে আছেন। এঁরা রেশনে লাইন দিয়ে জগন্নাথ দেবের প্রসাদ নিচ্ছেন। ভোগ বিতরণ কি রাষ্ট্রের কাজ? নাকি রাষ্ট্রের কাজ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। রাষ্ট্রের কাজ কোনটি -- মন্দির তৈরি করা না স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা! আজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এ সমস্ত দপ্তরে পশ্চিমবঙ্গের বুকে যা যা ঘটছে, তার কোনটাই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব সত্ত্বেও আমাদের নাগরিক সমাজ মহানিদ্রায় গিয়েছে। তাদের আর কোন দায় নেই, কারণ তারা মহাসুখে আছে। এভাবেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গ তর তর করে এগিয়ে চলেছে।
এ এক অদ্ভুত কালবেলা। আমাদের চারপাশে অন্ধকার, চারপাশে অনাচার, যার কোন বিচার নেই। আর প্রশাসন তো ব্যস্ত বিভিন্ন ধরনের তোষামোদী কাজে। এই প্রশাসন থাকাও যা, না থাকাও তাই। এটা ঘটনা যে, পশ্চিমবঙ্গের বুকে আগে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ছিল, তখন কমবেশি বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটেছে যা কখনোই কাম্য নয়। কিন্তু সেসবের প্রতিবাদ হত। আজ আরজিকর কান্ড হয়ে যাবার পরেও আইন কলেজের মধ্যে আইনের এক ছাত্রী গণধর্ষিতা হলেন। এখন কয়েকদিন ধরে এটা নিয়ে চলবে রাজনৈতিক তরজা, থানার সামনে টায়ার পোড়ানো, পরস্পর রাজনৈতিক দলগুলিকে গালাগালি দেওয়া। তারপর সব শেষ। আগে দেখতে পেতাম বিধানসভায় নানারকম আলাপ আলোচনা হতো। যে ৯/১০ বছরের তামান্না বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা গেল, বর্তমান বিধানসভায় তাকে নিয়ে একটি কথাও কিন্তু উঠলো না।
আসুন, আমরা যারা অপরাধ করছি এই সমাজ ব্যবস্থাতে, বর্তমান এইসব ঘটনাবলিতে নিশ্চুপ থেকে, আমরা অন্তত বাড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে লজ্জাবনত চিত্তে স্মরণ করি যে আমরা কতটা অপরাধী। ইতি,
পশ্চিমবঙ্গের এক লজ্জিত ব্যক্তি,
বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়,



মন্তব্যসমূহ