হুগলীর রথযাত্রার একাল সেকাল

হুগলীর মাহেশ, চন্দননগর,

 গুপ্তিপাড়ার

 ঐতিহ্যবাহী রথ 

ও তার ইতিহাস









মাহেশের জগন্নাথ মন্দির সুপ্রাচীন। আজ থেকে ৬২৯ বছর আগে ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে। মহান বিষ্ণু উপাসক ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরী ধামে গিয়েছিলেন। তার ইচ্ছা ছিলো তার নিজের হাতে তৈরী মহাপ্রসাদ স্বয়ং জগন্নাথ দেব কে খাওয়াবেন। কিন্তু পুরীর পান্ডা রা তাকে বাধা দেন। তখন দুঃখ পেয়ে সাধক ধ্রুবানন্দ সিদ্ধান্ত করেন আর অন্ন জল গ্রহণ করবেন না। স্বপ্নে জগন্নাথ তাকে দর্শন দেন। ধ্রুবানন্দ কে বাংলায় ফিরে যেতে নির্দেশ দেন। ভাগীরথীর তীরে মন্দির নির্মাণ করতে বলেন। ভগবান বলেন দারু ব্রহ্ম অর্থাৎ প্রবীণ নিম গাছের গুঁড়ি গঙ্গায় ভেসে এলে সেটা দিয়ে ভগবানের মূর্তি নির্মাণ করতে। সেই দারু মূর্তি ধ্রুবানন্দের ভোগ গ্রহণ করবে। ধ্রুবানন্দ মহাখুশি হয়ে মাহেশে মন্দির নির্মাণ করলেন। নীলাচল মানে পুরী হল সেই পাবন স্থান যেখানে পুন্ডরিকাক্ষ বিষ্ণু ভোজন করেন। যেহেতু স্বয়ং জগন্নাথ ধ্রুবানন্দ কে মাহেশে আসার স্বপ্ন দিয়েছিলেন তাই মাহেশ হল নব নীলাচল। পুরী ধামে যাওয়ার আগে বৈষ্ণব ধর্মের প্রবক্তা শ্রী চৈতন্যদেব মাহেশে এসেছিলেন। মাহেশের মন্দির সুপ্রাচীন। শোনা যায় একবার বৈদ্যবাটির এক ভক্ত মহেশ জগন্নাথ মন্দিরে একটি রথ দান করেছিলেন। সেই রথ কালক্ষেপে জীর্ণ হয়। ১৭৯৭ সালে , শ্রী রামকৃষ্ণের বিখ্যাত শিষ্য বলরাম বসুর দাদা কৃষ্ণরাম বসু আরেকটি রথ দান করেছিলেন। তাঁর পুত্র গুরুপ্রসাদ বসু ১৮৩৫ সালে রথটি পুনর্নবীকরণ করেছিলেন । কয়েক বছর পর দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু ১৮৮৫ সালে মার্টিন বার্ন কোম্পানি থেকে একটি লৌহ-রথ অর্ডার করেছিলেন এবং রথটি এখনও বিদ্যমান নেই। সেই সময়ে নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল প্রায় বিশ হাজার টাকা। রথটি একটি নবরত্ন মন্দির যার নয়টি শিখর রয়েছে। রথটিতে কাঠের ভারা সহ একটি স্টিলের কাঠামো রয়েছে। এটিতে বারোটি লোহার চাকা রয়েছে যার প্রতিটির পরিধি বারো ইঞ্চি। রথটি চারতলা , উচ্চতা ৫০ ফুট এবং ওজন ১২৫ টন । দুটি তামার ঘোড়া রয়েছে , একটি নীল রঙের, অন্যটি সাদা রঙের এবং দুটি রাজহাঁস সামনের দিকে সংযুক্ত। দুটি রথের দড়ি রয়েছে যার পরিধি ১০ ইঞ্চি , প্রতিটি ১০০ গজ ( ম্যানিলা দড়ি )। রথ চালানোর জন্য ব্রোঞ্জের ঘণ্টা বাজানো হয় এবং এটি থামানোর জন্য বন্দুক চালানো হয়।

 চন্দননগরের রথ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও সুপ্রাচীন। আনুমানিক ১৭৭৬ খ্রী: চন্দননগরের সুপ্রাচীন রথ প্রতিষ্ঠা করেন মহাত্মা যাদবেন্দু ঘোষ মহাশয়। আনুমানিক ইং ১৭৭৬ খ্রী: (বাং ১৭৮৩ সাল) মহাত্মা যাদবেন্দু ঘোষ মহাশয় নিজের বাড়ি সংলগ্ন বাগানের সুপ্রাচীন নিম গাছের কাঠ দিয়ে একটি অতি মনোরম কারুকার্যমন্ডিত রথ নির্মাণ করেন। প্রাচীনত্তের দিক দিয়ে শ্রীরামপুরের মাহেশের রথ ও গুপ্তিপাড়ার রথ এগিয়ে থাকলেও চন্দননগরের রথের নির্মাণ শৈলীতে এমন অভিনবত্ব আছে যাহা হুগলী জেলা সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলার রথ থেকে চন্দননগরের রথকে পৃথক করেছে কারণ এই রথটি সম্পূর্ণ লৌহ দ্বারা নির্মিত। 

          পূর্বের কাঠের রত্তি জীর্ণ হয়ে পড়লে ইং ১৯৬২ সালে (বাং ১৩৬৯) চন্দননগর লক্ষীগঞ্জ রথ পরিচালন সমিতি ও গোন্দলপাড়া জুট মিলের প্রচেষ্টায় এবং আপামর জনসাধারণের অর্থানুকূল্যে এবং মেসার্স ব্রেথওয়েট এন্ড কোং লিমিটেডের আন্তরিক সহযোগিতায় পূর্বের কাঠ দ্বারা নির্মিত রথের অনুরূপ এই লৌহ রথ নির্মিত হয় যার ওজন আনুমানিক ৬০ টন। নটি পিতলের চুরা বিশিষ্ট এই রথের উচ্চতা ৪০ ফুট। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ২২ ফুট। চতুর্থ তল বিশিষ্ট রতের মোট 14 টি চাকা আছে, প্রত্যেকটির ওজন এক টন করে। 

      রথের একতলায় চারটি গুনে চারটি নারী মূর্তি আছে। রথের দ্বিতীয় তলায় দুটি তেজী সাদা ঘোড়া, প্রভুর রথ টানছে সঙ্গে সারতি অক্রর । রথের তৃতীয় তলায় দারপাল রয়েছেন চারজন।

       পূর্বে ইন্দ্র, পশ্চিমে বরুণ, তোরে কুবের, দক্ষিণে যমরাজ। রথের শেষ অর্থাৎ চার তলায় মধ্যস্থলে থাকেন মহাপ্রভু শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব, দক্ষিণে ভগিনী সুভদ্রা, বামে বলরাম।

বারবেলায় রথের রশিতে টান পড়ল গুপ্তিপাড়ায়।বাংলার প্রসিদ্ধ রথ গুলোর মধ্যে অন্যতম হুগলির বলাগড়ের গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা।সারা বছর জগন্নাথ দেব বৃন্দাবন জিউ মন্দিরে থাকেন।রথযাত্রায় মাসির বাড়ি যান।

জানা যায় ১৭৪০ সালে এই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা হয়।গুপ্তিপাড়ার রথ বৃন্দাবন জিউ রথ নামে পরিচিত। প্রায় তিনশ বছরের গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা।বছরের অন্যসময়ে ঐতিহ্যপূর্ণ বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের পাশে বছরভর এই রথ টিনের খাঁচায় ভরা থাকে।এই রথ চার তলা, উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত ৩৪ ফুট করে।আগে বারোটা চূড়া ছিল বর্তমানে নয়টি চূড়া। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ,বলরাম আর সুভদ্রা রথে চড়ে যান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোসাঁইগঞ্জ-বড়বাজারে মাসির বাড়ি যান। গুপ্তিপাড়া রথযাত্রার একটি নিজস্ব বিশেষত্ব হল ভান্ডার লুট। উল্টোরথের আগের দিন হয় ভান্ডার লুট।

গুপ্তিপাড়া রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।হুগলি গ্রামীণ পুলিশের বিভিন্ন থানা থেকে ওসিরা নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন।ডিএসপি অ্যাডিশনাল এসপি পদ মর্যাদার অফিসাররা মোতায়েন থাকেন। ড্রোন ক্যামেরায় চলে নজরদারী।

শ্রীরামপুরের মাহেশে জগন্নাথ মন্দিরে সকাল থেকে পুজো পাঠ হয়।বিকালে হয় রথের টান।গুপ্তিপাড়ায় রথের প্রথম টান হয় বেলা বারোটায়।এই রথযাত্রা দেখতে বর্ধমান নদীয়া উত্তর ২৪ পরগণা থেকে বহু মানুষ আসেন।ভক্তের ভীরে গমগম করে রথের সড়ক।মেলা বসে।আর সবার জন্য থাকে ভোগের ব্যবস্থা।




bannerbanner

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার