‘বন্দে মাতরম্' বিতর্ক: আড়ালে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ
‘বন্দে মাতরম্' বিতর্ক:
আড়ালে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ
(মতামত বক্তার নিজস্ব এই মতামতের জন্য পোর্টাল দায়ী নয়)সঞ্জয় ঘোষ
বিজেপি সরকার সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে স্কুল ও মাদ্রাসায় 'বন্দে মাতরম্' গাওয়ার জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে। এর আগে ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দ্বারা জারিকৃত নির্দেশিকায় 'বন্দে মাতরম্'-র ছয়টি স্তবক গাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ মার্চ, ২০২৬ ভারতের শীর্ষ আদালতে মহম্মদ সাইয়েদ নূরী একটি মামলা করেছিলেন। তিনি বলেন, মুসলিম ছাত্রছাত্রীদেরও গানটি গাওয়ার নির্দেশ এসেছে। কিন্তু গানটির তৃতীয় ও ষষ্ঠ স্তবকে দেবী দুর্গা ও লক্ষ্মীর বন্দনা রয়েছে যা মুসলিমদের জন্য গাওয়া হবে 'শিরক' বা অংশিবাদীতার সমতুল্য। আর না গাইলে হয়রানি বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরে বিচারপতি সূর্যকান্তের বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয় যে 'বন্দে মাতরম্' গাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তিনি এটাও স্পষ্ট করে দেন যে এটি শুধুমাত্র 'পরামর্শমূলক নির্দেশিকা'।
বিভিন্ন সময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে 'বন্দে মাতরম্'। 'বন্দে মাতরম্' গানটির রচনাকাল ১৮৭৬ সাল। পরে ১৮৮২ সালে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে সেখানে এই গানটি উপন্যাসের মূল ভাবনা ও দর্শনের প্রতীক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের পটভূমি আঠারো শতকের শেষভাগ যখন বাংলা একদিকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে, অন্যদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণে বিপর্যস্ত। ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহই ছিল উপন্যাসে মূল প্রেক্ষাপট। এই উপন্যাসে একদিকে যেমন স্বদেশপ্রেম, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ ও মাতৃভূমি মুক্তির জন্য আত্মত্যাগের গৌরবময় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের চেতনাটিকেও মহিমান্বিত করা হয়েছে। 'আনন্দমঠ'-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র 'সন্তানদল'। এই 'সন্তানদল' আসলে 'সন্ন্যাসী' ও 'ফকির'দের নিয়ে গঠিত গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন। এরা ব্রিটিশ শোষণ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অর্থনৈতিক শোষণ, অত্যাধিক কর আরোপ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ গড়ে তুলেছিন। ইতিহাসে এই আন্দোলন 'ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরই অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে এই ঐক্যবদ্ধ রূপটি পূর্ণমাত্রায় প্রতিফলিত হয়নি। বরং সেখানে হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গানটিতে দেশমাতৃকাকে দেবী দুর্গা ও লক্ষ্মীরূপে কল্পনা করা হয়েছে ("মা ত্বং দুর্গা দশপ্রহরণধারিনী”)। এই মূর্তি কল্পনাকে কেন্দ্র করেই অহিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আপত্তির সৃষ্টি হয়। তাদের যুক্তি ছিলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের জাতীয় স্তোত্রে নির্দিষ্ট একটি ধর্মের দেবদেবীর উল্লেখ দেশের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদী ভাবধারার পরিপন্থী।
উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই গানটি এবং 'বন্দে মাতরম্' ধ্বনিটি প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৯৩ সালে বন্ধিমচন্দ্রের মৃত্যুর তিন বছর পর ১৮৯৬ সালে এই গান উঠে আসে রাজনৈতিক সম্মেলন মঞ্চে। জাতীয় কংগ্রেসের এক সম্মেলনে গানটি পরিবেশন করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শ্রী অরবিন্দ ঘোষ এই গানটিকে 'বঙ্গদেশের জাতীয় সঙ্গীত নামে অভিহিত করেন। জাতীয় কংগ্রেস এবং সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন-দুই ধারার রাজনীতির লোকেরাই এই গানটিকে তাঁদের নিজস্ব সঙ্গীত হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন। এরপর থেকেই কালক্রমে গানটি এবং 'বন্দে মাতরম্' ধ্বনিটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে দেশাত্মবোধের উদ্দীপক হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর অনেকগুলো রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার গঠিত হয়। বিধানসভার অধিবেশনগুলোতে যখন 'বন্দে মাতরম' গানটি গাওয়া হত, তখন অনেক মুসলিম সদস্য তাদের অস্বস্তি ও আপত্তি জানিয়ে ছিলেন।' গানটিতে যেভাবে পৌত্তলিকতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে, তাতে তাদের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করছে, এরকম একটা কথা তারা তুলেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে আলাপ আলোচনা শুরু হয়। গানটিকে পুরোপুরি বাতিল করা কংগ্রেসের পক্ষে তখন আর সম্ভব ছিল না কারণ ততদিনে গানটি। বিপ্লবের বীজমন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। আবার ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে মুসলমান সমাজের আপত্তিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও সম্ভব ছিল না। মধ্যপন্থা হিসাবে গানটির প্রথম অংশটি রেখে, যেখানে দেবদেবী ও পৌত্তলিকার বিবরণ আছে, তা বাদ দিয়ে সরকারী অনুষ্ঠানে ও বিধানসভার অধিবেশনগুলোতে গানটি গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওয়ার্কিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে জহরলাল নেহেরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে তার মতামত জানতে চান।
এ প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠির প্রত্যুত্তরে কবিগুরু জানান- "I freely concede that the whole of Bamkim's 'Bande-Mataram' poem read together with its context is liable to be interpreated in ways that might wound Moslem susceptibilities but a national song though derived from it which has spontaneously comes to consist only of the first two stanzas..." অর্থাৎ কবিগুরুও প্রথম দুটি স্তবকের ব্যাপারে মতামত দিয়েছিলেন। অবশেষে ১৯৩৭ সালের ২৬ অক্টোবর কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নিধানসভা ও জাতীয় সভা সমিতিতে 'বন্দে মাতরম্'এর প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত শত আলাপ আলোচনা ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশভাগ আটকানো যায়নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্ত ও শবের উপর দাঁড়িয়ে দেশভাগ হয়েছিল। দেশভাগের পর পাকিস্তান হলো ইসলামিক রাষ্ট্র আর ভারতবর্ষ হলো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর কবিগুরুর 'জনগণমন' হয়ে ওঠে জাতীয় সংগীত আর জাতীয় স্তোত্র হিসাবে স্বীকৃতি পায় বন্দে মাতরম্'। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার অব্যহতি পরে নিউইয়র্কে আয়োজিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের এক অধিবেশনের সাধারণ সভায় জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বাদ্যযন্ত্রে বাজানো হয়েছিল 'জনগণমন' গানটি। এরপর ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে সভাপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ জাতীয় সঙ্গীত সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে বলেন 'জনগণমন' হবে ভারতে 'রাষ্ট্রীয় সংগীত', আর 'বন্দে মাতরম্'ও সমানভাবে সম্মানিত হবে এবং 'জনগণমন'র সমমর্যাদা পাবে।
এই বিতর্ক বোঝার জন্য উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকানো জরুরি। ১৭৫৭সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা চলে যায়। ১৭৬৩ সালে বাংলা, বিহার, ওড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ এবং ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দ্যোবস্ত চালু হলে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় আমুল বদল আসে। এক নতুন জমিদার শ্রেণীর উত্থান ঘটে, যাদের বড় অংশ ছিল বাঙালি হিন্দু। ব্রিটিশ শাসকের সঙ্গে সখ্যতা থেকেই গড়ে ওঠে নতুন মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণী। বহু ঐতিহাসিক মনে করেন মুসলিম শাসনের অবসান ও ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকে এই নব্য হিন্দু অভিজাত শ্রেণী স্বাগত জানিয়েছিল। এই সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। এরা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেদের চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এদের মধ্য থেকে উঠে আসা পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত অংশই বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ বলে পরিচিত। এদের বড় অংশই ব্রিটিশ শাসনের শ্রেষ্ঠত্ব ও আধুনিকতার প্রশংসা করেন। ব্রিটিশরা চেয়েছিল চিরস্থায়ী বন্দ্যোবস্তের সুবিধাভোগী এই শ্রেণী তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য দেবে আর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের আদর্শ প্রচার করবে। এই প্রেক্ষাপটেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের উত্থান এবং তিনি প্রবলভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের অন্যতম তাত্ত্বিক হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভূমিকাকে যেভাবে প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে তা সাহিত্য সম্রাটের সেই মনোভাবেরই বহি: প্রকাশ বলে মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথের কথায় 'আনন্দমঠ' সাহিত্য হিসাবে মূল্যবান কিন্তু রাষ্ট্রসভায় সর্বধর্মের মিলনক্ষেত্রে গানটির সব স্তবক সংগত নয়। পার্লামেন্টে বিভিন্ন সময়ে 'বন্দে মাতরম্' বিতর্কে ভূপেশ গুপ্ত, হীরেন মুখার্জী বা সোমনাথ লাহিড়ীদের বক্তব্য এক্ষেত্রে স্মরণীয়। সোমনাথ লাহিড়ী তাঁর বক্তৃতায় 'আনন্দমঠ'-কে "হিন্দু ফ্যাসিবাদের প্রথম গ্রন্থ" বলে মন্তব্য করেন। রাজ্যসভার সাংসদ ভূপেশ গুপ্ত উপন্যাস থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরে দেখিয়েছিলেন 'সন্তানদল' কীভাবে মুসলিম বিরোধী সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল।
তবুও আজ আরএসএস ও বিজেপি জাতীয় সংগীত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে। এদের এজেণ্ডা হলো 'জনগণমন'-র বদলে 'বন্দে মাতরম্'কে জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করা। সম্প্রতি কোলকাতায় এসে আরএসএস প্রধান প্রকাশ্যে এই মত ব্যক্ত করছেন। সম্প্রতি বিজেপি শাসিত রাজ্যে পাঠ্যপুস্তক থেকে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার ঘটনা থেকে অনেকেই মনে করেন 'বন্দে মাতরম্' গানটি আরএসএস-বিজেপি-র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে সহজেই মিলে যায় বলেই ইচ্ছা করে বিতর্ক উস্কে দেওয়া হচ্ছে। তাই একথা বলাই যায় যে গান্ধী, নেহেরু, সুভাষ, রবীন্দ্রনাথ বা আবুল কালাম 'আজাদ 'বন্দে মাতরম্' থেকে পরবর্তী স্তবকগুলো বাদ দিয়েছিলেন দেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপনের জন্য নয়, বরং বিভাজনের সম্ভাবনা দূর করে ভারতবর্ষের মতো দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করার জন্য। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য অর্থাৎ বহুত্ববাদী আদর্শকে রক্ষা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে যা আগামীতে দেশের রাজনীতিকে গভীর মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেবে।


মন্তব্যসমূহ