মানুষের দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণা এড়াতে সার্কাস চলছে
মানুষের
দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণা
এড়াতে সার্কাস চলছে
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
অধ্যাপক শ্রুতিনাথ প্রহরাজ
পুরস্কার পোস্টিং পেয়েই ইলেকশন কমিশন থেকে সটান মুখ্যসচিবের পদে যোগ দিয়ে প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে মনোজ বাবু বললেন, "তাঁর কাজ হবে সংকল্পপত্র কার্যকর করা।" এই কথা বর্তমান শাসক দল বিজেপির রাজ্য সভাপতি বললে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ মুখ্যসচিব স্বরাষ্ট্রসচিব বা এই পর্যায়ের সর্বোচ্চ আধিকারিকদের কাজের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র 'সংকল্প পত্র' থাকে বলে জানা ছিল না। এই 'সংকল্প পত্র' আদতে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পেশ করা বিজেপির ইশতেহার। পরে বোঝা গেল তা মনোজ বাবুরও ইশতেহার ছিল। তাই ভোটের আগে এবং পরে দুই পক্ষের বোঝাপড়া এত পরিষ্কার! নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রায় অবসরের মুখে থাকা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক কে কৃতজ্ঞতার পুরস্কার স্বরূপ তড়িঘড়ি মুখ্যসচিবের পদে তুলে আনতে হয়। এরপরেও কি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অপরাধ হবে? এরপরও কি রাজ্যের এই শীর্ষ আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রশাসনিক স্তরে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি আশা করা আদৌ সম্ভব হবে? বিগত দেড় দশকে তৃণমূল কংগ্রেস জমানায় পুলিশ এবং সাধারণ প্রশাসন কার্যত দলদাসে পরিণত হয়েছিল। সেই কারণে মানুষকে বিস্তর দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। এর প্রতিক্রিয়ার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছে এবারের নির্বাচনী ফলাফলে। পর্যুদস্ত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এখন প্রশ্ন হল, তখনকার বিরোধী তথা আজকের শাসক দল সেই একই জুতোয় পা গলিয়ে শাসন শুরু করল কিনা? এখনই সবটা না বলা গেলেও, সময়ই এর উত্তর দেবে। তবে সূচনার ইঙ্গিত যে আদৌ স্বাস্থ্যকর নয় এ কথা হলফ করে বলা যেতে পারে। তবে এখনকার মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ ও সাধারন প্রশাসনের শীর্ষ অধিকারীকদের তাঁর সদ্য প্রাক্তন পূর্বসূরীর মত প্রকাশ্যে নাম ধরে বা তুই তোকারি করে ওঠবস করাচ্ছেন না-- এটা অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন, স্বীকার করতেই হবে।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা শুরুতেই বলা দরকার। কেরালায় এল ডি এফ- এর তথা কমিউনিস্টদের পরাজয়ের পর সঙ্ঘ প্রচারক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উল্লসিত হয়ে বললেন, 'দেশজুড়ে ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। এই বক্তব্যের রেশ ধরে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে কেবল শাসকদলের পরিবর্তন নয়, রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় চরম দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। অনেকে বলছেন তৃণমূলের যাওয়াটা খুব দরকার ছিল। একথা একদম ভুল এমনটা বলা ঠিক হবেনা। তবে একই সাথে যেটা বলা দরকার, বদলে যারা এল তা কি আগামীদিনে রাজ্যবাসীকে তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ছুঁড়ে ফেলবেনা? সারা ভারতের অভিজ্ঞতায় এরাজ্যে এই পরিবর্তনের পর যে বিষময় ফল ফলবার কথা, ইতিমধ্যেই তার প্রভাব আমরা একাধিক সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লক্ষ্য করেছি। আগামী দিনে সরকারি প্রশাসনে আরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবারের নিয়ন্ত্রণ যত বাড়বে, রাজ্যের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অস্থিরতা তত বাড়বে সন্দেহ নেই। তাই বামপন্থীদের কাছে এ এক নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, ইতিহাসের শিক্ষা হল মতাদর্শগত ভাবে চরম হিন্দুত্ববাদীদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়তে পারে একমাত্র কমিউনিস্টরাই। আর সেই কারণেই কেরালায় কমিউনিস্টদের হারিয়ে কংগ্রেস জিতলেও মোদী ও তার সহযোগীরা উল্লসিত হন।
নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এবং শাসক দল বিজেপির রাজ্য সভাপতি বারবারই একটা কথা বলছেন, শাশকের আইন নয় রাজ্য জুড়ে আইনের অনুশাসন বলবৎ করা হবে। গত এক মাসে আমাদের অভিজ্ঞতা কি? অপরাধীর অপরাধ আইনানুগ প্রমাণ হওয়ার আগেই তাকে অন্তর্বাস পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে রাস্তায় ঘোরানো হচ্ছে। এটা কোন ধরনের আইনের অনুশাসন? এই দৃশ্য গা-সওয়া হয়ে গেলে ভবিষ্যতে এই সরকার পুলিশকে দিয়ে যে কোন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক অপছন্দের ভিত্তিতেও কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্য রাজপথে ঘোরাতে পারে। কোনো সভ্য সমাজে এ জিনিস চলতে পারে? পুলিশ পৌঁছানোর আগেই শাসক দলের কর্মীরা অভিযুক্তের বাড়ির সামনে পৌঁছে যাচ্ছেন ডিম এবং জুতো ছোঁড়ার মহান দায়িত্ব নিয়ে। সংবাদমাধ্যমে তা দেখানো হচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে। আমজনতা তৃণমূল কংগ্রেসের অত্যাচারে তিতিবিরক্ত এ কথা ঠিক। তবে তাঁরাও চান আইন মেনে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। প্রকাশ্যে হেনস্থা করে বা যোগীরাজের স্টাইলে এনকাউন্টার করে আইনের অনুশাসন হয় না, শাসকের আইন জারি হয়। তাই শত অপরাধের কান্ডারী সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনাকেও মান্যতা না দিয়ে নিন্দা করাই যুক্তিযুক্ত। ওদের কৃতকর্মের পাল্টা যদি এরাও একইভাবে আইন হাতে তুলে নিয়ে এই কাজ করতে থাকেন তবে 'আইনের অনুশাসন' কথার কথাই থেকে যাবে, সর্বত্র শাসকের আইন নতুন মাত্রায় বলবৎ হবে। ঠিক যেমনটা আমরা লক্ষ্য করেছি তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় ঘোর অন্ধকারময় দেড় দশক জুড়ে। নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধহীন ক্ষমতালোভী একটি রাজনৈতিক দল দুর্নীতি, তোলাবাজি, গুন্ডাগিরির প্রাতিষ্ঠানিকতায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন দুর্বিষহ করে তুলেছিল। মানুষ এই নরক যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ চেয়েছেন তাই বিজেপি ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছে। এস আই আর, অর্থবল সহ আরও কিছু কারণ আছে বিজেপির এই জয়ের পিছনে একথা ঠিক, তবে প্রধান কারণ হল স্বৈরাচারী তৃণমূলের বিরুদ্ধে জমে ওঠা পাহাড় প্রমাণ অসন্তোষ। এই চরম সত্যের উপলব্ধি শাসকদলের থাকা সবচেয়ে জরুরী, তবেই আইনের অনুশাসন নিশ্চিত করার তাগিদ তৈরি হতে পারে। রাজ্যজুড়ে হিন্দুত্বের জাগরণের কারণে এই বিপুল জয় ঘটেছে-- এহেন ভাবনা নিতান্তই অমূলক এবং ভবিষ্যৎ-এর প্রশ্নে আশঙ্কারও বটে।
রাজ্যের মানুষ এখন টিভিতে মেগা সিরিয়াল ধারাবাহিক ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মন্ত্রীদের সম্পত্তির সিরিয়াল দেখছেন। পদত্যাগের নাটকবাজির সিরিয়াল দেখছেন। এদের কেউ কেউ গ্রেফতারও হচ্ছেন। তবে একটা বড় অংশ রাতারাতি সাধু সাজার চেষ্টায় পাল্টি খেয়ে বিজেপির দরজায় কড়া নাড়ছেন। এরা মমতা-অভিষেক জমানার যাবতীয় কুকীর্তির অংশীদার। তোলাবাজি করেছেন, দখলদারি করেছেন, মেয়েদের উপর অত্যাচার করেছেন.. ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু করেছেন পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে। অভিযোগ জানিয়ে কোন লাভ ছিল না। উল্টে অভিযোগকারীকেই আক্রমণের শিকার হয়ে ঘর ছাড়তে হতো। হঠাৎ সেই দুষ্কৃতীরাই মমতা-অভিষেকের সমালোচনা করে বলতে শুরু করেছেন, তারা নির্দোষ। সেই জমানায় নাকি কথা বলার সুযোগ পেতেন না তাই চুপ করে থাকতেন। আসল লক্ষ্য যেভাবেই হোক নিজেদের অপরাধের ঝাঁপি আড়াল করে দুর্নীতির অপরাধে গ্রেপ্তার এড়াতে, বিজেপির গুড বুকে আসার। তৃণমূল দল ভাঙছে। বলা ভাল শাসক দলের সাজানো চিত্রনাট্যে ভেঙে চৌচির হচ্ছে। সাজানো বলছি এই কারণে, ৪ তারিখে ভোটের ফলাফল তৃণমূলের পক্ষে গেলে এই সব সংলাপ অন্যরকম হত। এখন তাই ভালো তৃণমূলের ব্যাখ্যা গিলে বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলেছেন, "কেউ চা খেতে আসতে চাইলে আমি তো না বলতে পারিনা"। সত্যিই তো তাই। তবে তৃণমূলের সাংসদ বিধায়কগণ রাতারাতি সোনালী অতীতকে এড়াতে এখন যেভাবে বিজেপির দরজায় কড়া নাড়ছেন, তা শুধুই চা খেতে না অন্য কিছু তা সময় বলবে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক এবং প্রধান বিরোধী দল যখন এক কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, আমজনতার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার পরিসর সংকুচিত হতে বাধ্য।
এই রাস্তা ধরেই এক সময় তিলজলা- তপসিয়া-কসবা এলাকার ত্রাস জাভেদ খান ও তার কাউন্সিলর পুত্র বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ এখানকার মানুষজন এই বাপ বেটার বিরুদ্ধে ভুরি ভুরি অপকর্মের অভিযোগ আনছেন, আগেও এনেছেন লাভ হয়নি। আরেক দুষ্কৃতী, পূর্বতন সরকারের স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী স্বীকৃত বোমাবাঁধার কারিগর ও ক্যানিং-ভাঙড়ের ত্রাস বেচারা শওকত মোল্লা পাল্টি খাওয়ার কায়দাটা সময় মত রপ্ত করতে না পারায় এন আই এ-র তাড়া খেয়ে রাতের অন্ধকারে সুন্দরবন হয়ে বাংলাদেশে পালাবার রাস্তা খুঁজতে গিয় শেষমেষ ধরা পড়েছে এন আই এ-র জালে। এইসব কীর্তিমানদের কত কীর্তি এখন টিভিতে দেখছে সাধারণ মানুষ। এই সময়ে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ হওয়া হাজার হাজার অসহায় শ্রমজীবী হকার ও বস্তিবাসীদের জীবন যন্ত্রণার কথা সচেতন ভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওদের পুনর্বাসনের প্রশ্নে রাজ্য সরকারের কোনো হেলদোল নেই। এদের পাশে থেকে পথে নেমে প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, রাত জাগছে একমাত্র বামপন্থীরাই। অন্যসব জীবন জীবিকার জরুরী ইস্যুগুলো ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য টিভির চ্যানেলগুলির পর্দা জুড়ে অনেকটা সময় নিয়ে রোজ এই সার্কাসের সিরিয়াল চলছে।
এই আবহে কে প্রকৃত অপরাধী আর কে সেই অপরাধের মদতদাতা তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে সর্বস্তরে নৈরাজ্য চরম পর্যায়ে পৌঁচেছিল এ কথা কমবেশি সকলের জানা। এই যে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন রুমে অন্যান্য জিনিস সহ কাঁড়ি কাঁড়ি উইয়ে খাওয়া টাকা (প্রায় ৫০-৬০ লক্ষ) উদ্ধার হয়েছে এতো অসহায় ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া তোলা আদায়ের টাকা। মদ্যপান থেকে শুরু করে যাবতীয় অপকর্মের জন্য কলেজে আলাদা দুটো ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে বরাদ্দ করা হয়েছিল তা কি কলেজ কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল? আমার মনে আছে, এই সুরেন্দ্রনাথ কলেজে একসময় অনুমতি থাকা সত্ত্বেও শতবর্ষ প্রাচীন অধ্যাপক সংগঠন ওয়েবকুটাকে ছুটির দিনে মিটিং করবার জন্য একটি ঘর খুলে দেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। তৎকালীন অধ্যক্ষ চিন্ময় বাবুকে বারংবার টেলিফোনে অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে অধ্যাপক সমিতি বৈঠকখানা বাজারের রাস্তায় বসে মিটিং করেছিল। অথচ তৃণমূলের নেতাদের ফুর্তির জন্য দেদার টাকা খরচা করে দুটি ঘর সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ এই ঘটনায় অপরাধী হিসেবে ওই অঞ্চলের 'বিশিষ্ট সমাজসেবী' ও আইনজীবী (এই নামে কলেজের সামনে দীর্ঘদিন বিশাল হোর্ডিং ঝুলতে দেখেছি) দেবাশীষ এবং তার গুণধর পুত্রকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি এই অপরাধকে কলেজের ভেতর থেকে যারা এতদিন শিক্ষারত্ন উপাধি সহ নানাবিধ সরকারি সুবিধা লাভের আশায় আগাগোড়া মদত দিয়েছেন, তাদেরকেও একই সাথে ধরা দরকার। আমরা দিনের পর দিন লক্ষ্য করেছি, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভেতরে এই নৈরাজ্যের পেছনে থাকা দুষ্কৃতিদের নিয়মিত মদত জুগিয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষের একাংশ। সেখানে স্কুল সার্ভিস কমিশনের একদা চেয়ারম্যান জেল খাটা সুবিরেশদের মত অল্প কিছু কলেজের অধ্যক্ষের পাশাপাশি শাসক দল মদতপুষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সংগঠনের একাংশের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। না হলে ক্যাম্পাসের ভেতরে এই নৈরাজ্য সংগঠিত করা সম্ভব হতো না। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসি কান্ড নিয়ে এত হইচই হচ্ছে অথচ কলকাতার গুরুদাস কলেজের সোস্যালে গান গাইতে আসা প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কে কে-র মৃত্যু নিয়ে তদন্ত বেমালুম ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অভ্যন্তরে নির্বাচিত ছাত্রসংসদ না থাকা সত্ত্বেও তাদের নামে এত টাকা লেনদেন হত কিভাবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া জরুরী। এই সময়ে কলেজগুলির স্থায়ী আমানত কিভাবে খরচ হয়েছে তারও বিশেষ অডিট হওয়া দরকার। তবেই কারা প্রকৃত অপরাধী আর কারা তাদের মদতদাতা সবটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার বেরিয়ে আসবে। যারা এখন নিজেদের অপরাধ ঢাকতে রাতারাতি হাত ধুয়ে ফেলে ভয়ে করেছেন বলে সাধু সাজতে চাইছেন তাদেরকেও ধরা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি ভালো একটা জিনিসও আমরা দেখেছি যা উল্লেখ করা দরকার। যে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য বা অধ্যক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মাথা উঁচু রেখে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন সেখানে দুষ্কৃতীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রসঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য প্রাক্তন উপাচার্য শান্তা দত্তের কথা উল্লেখ করতেই হয়। স্টুডেন্টস ইউনিয়ন রুমে তালা ঝুলিয়ে দুষ্কৃতীদের ক্যাম্পাসে ঢোকা বন্ধ করেছিলেন। অন্যদিকে, সমাজ মাধ্যমে দেখলাম বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য যেদিন কাজে যোগ দিচ্ছেন ছাত্র নামধারী কিছু দুষ্কৃতি সেদিন তাঁকে মমতা ও অভিষেকের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে ক্যাম্পাসে স্বাগত জানিয়েছিল। উনি তা উপভোগ করেছেন, আপত্তি করেননি। সরকার বদলের পর আবার সমাজ মাধ্যমে দেখলাম, নতুন একদল ছাত্র নামধারী দুষ্কৃতী এই সেদিন ঐ উপাচার্যকেই জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করেছে। আগেই আপস করে বসায় সেদিন উনি বাধা দেওয়ার সাহস পাননি। দুই উপাচার্যের দুটি ঘটনা প্রমাণ করে তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত দেড় দশকে অধ্যাপক সংগঠন ওয়েবকুটাও শিক্ষাঙ্গনের এই সীমাহীন নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী সংগঠনগুলিকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। সমিতির নেতৃত্ব বহু ক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়েছেন, তবু লড়াই থেমে থাকেনি।
তৃণমূল জমানার বদলের পর বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায় আসায় অনেকে স্বপ্নের ইমারত গড়তে শুরু করেছেন। সরকার গড়ার একমাসের মধ্যে অবশ্য সেই ইমারত ভাঙতে শুরু করেছে। সরকারি ও সরকার পোষিত অন্য সব সংস্থার কর্মী ও শিক্ষক শিক্ষা-কর্মীদের জন্য হুমকির সার্কুলার জারি হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, সরকারের কোনো কাজের সমালোচনা করা যাবেনা। অন্য সব বিজেপি শাসিত রাজ্যের মত এখানেও পেনশন প্রথা উঠে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে অসহায় শরণার্থীদের ভায়া ডিটেনশন ক্যাম্প দেশ থেকে তাড়ানো শুরু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে জুলাই মাস থেকে এরাজ্যেও প্রি-পেইড স্মার্ট মিটার চালু হবে। সত্যি তা হলে সাধারণ মানুষকে কয়েকগুণ বেশি বিদ্যুতের বিল মেটাতে হবে। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশে সহ অন্যান্য রাজ্যে এ নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এরাজ্যেও তা চালু বিক্ষোভ প্রতিরোধ শুরু হবে। নেতৃত্ব দেবে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বামপন্থীরাই, কারণ রাস্তায় আর কেউ নেই।
বস্তুতঃ সরকারি কর্মীসহ সর্বস্তরের শিক্ষক শিক্ষা-কর্মীদের একটা বড় অংশ বর্তমান শাসক দলকে সমর্থন করেছেন এই আশায়, ভোট মেটার পর সরকার গঠন হলেই হাতে গরম বকেয়া ডি এ আর সপ্তম বেতন কমিশন গড়ার সুখবর পাবেন। আগের মুখ্যমন্ত্রী এপ্রিল মাস থেকে চার শতাংশ ডি এ দেওয়ার কথা বললেও আজ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। সপ্তম বেতন কমিশন গড়ার কথা তিনিও বলেছিলেন, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন। কিন্তু সবটাই রয়েছে নীতিগত স্তরের বোঝাপড়ায়। খাতায়-কলমে তা কবে কার্যকর হবে আমরা কেউ জানিনা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বকেয়া ডি এ মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলা হলেও বর্তমান সরকার আজ পর্যন্ত কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। আগের সরকার শুধুমাত্র রাজ্য সরকারি কর্মীদের সরাসরি না হলেও একটা অংশ দিলেও অন্য অংশের গ্র্যান্ট-ইন-এড শিক্ষক-কর্মচারিদের কথা ভাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। এই পরিস্থিতিতে যাদের ধারণা ছিল, ডাবল ইঞ্জিন সরকার হলে রাজ্যের সব অংশের শিক্ষক- কর্মচারীরা রাতারাতি কেন্দ্রীয় হারে ডি এ পেতে শুরু করবেন-- তারা এখন হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছেন কত ধানে কত চাল। ত্রিপুরায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও সমহারে ডি এ পাননা সেখানকার রাজ্য সরকারি কর্মীরা। সব মিলিয়ে কেন্দ্রের সাথে ফারাক উনিশ শতাংশ। এখন দেখার এ রাজ্যের সর্বস্তরের শিক্ষক কর্মচারীদের বকেয়া সহ কেন্দ্রীয় হারে ডি এ পেতে পরের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত সময় গড়ায় কিনা।


মন্তব্যসমূহ