কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও পরিবেশমিত্র সুরক্ষা মৌলিক অধিকার
কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও
পরিবেশমিত্র সুরক্ষা
মৌলিক অধিকার
বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়
সমাজ ও পরিবেশকর্মী
প্রতিটি মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই কোন না কোন কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ে। দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট ভারতে অবশ্য অনেক শিশু বা নাবালক ছেলেমেয়েরাও পেটের জ্বালা মেটাতে কাজ করে থাকে। অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, নার্সিং হোম, কলকারখানা সহ প্রত্যেকটি কর্মক্ষেত্রে মানুষ কাজ করে এবং প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কর্মক্ষেত্রেই অতিবাহিত হয়।
সম্প্রতি কলকাতার কাছে অবস্থিত আনন্দপুর-এ এক গুদামে ২৭ জন শ্রমিকের জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা এক মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাক্ষি হয়ে থাকল। এই আনন্দপুরে জলা বুজিয়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ বহুতল আবাসন, কারখানা এবং গুদাম। এই ২৭ জন শ্রমিকের মৃত্যুর দায় কার তা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হল। অসহিষ্ণু, রুচিহীন রাজনৈতিক বর্ণমালার চালাচালি হল। নানান সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন বেরোলো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেল, এই মৃত্যু নিয়ে নাগরিক সমাজের তেমন কোনো হেলদোল নেই। অথচ এক বছর আগেই এই নাগরিক সমাজকে আরজিকর-এর ঘৃণ্য ঘটনার প্রতিবাদে আমরা অত্যন্ত সঠিকভাবেই সোচ্চারে পথে নেমে প্রতিবাদে জানাতে দেখেছি। কিন্তু এবারে শ্রমজীবী এই মানুষগুলির মৃত্যু নিয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটি মোমবাতিও জ্বলল না। কেউ পথে নামল না। তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে, এই শ্রমজীবী মানুষগুলির মৃত্যুর দাম নাগরিক সমাজের কাছে নেই! অবশ্যই কয়েকটি রাজনৈতিক দল এবং ট্রেড ইউনিয়ন এই মৃত্যুর প্রতিবাদ করে সত্য উদঘাটনের জন্য তদন্তের দাবি করেছে। কিন্তু গভীর দুঃখের বিষয় হলেও দেখা গেল, মানব সভ্যতার পিলসুজ এই শ্রমজীবী মানুষদের মৃত্যু নিয়ে নাগরিক সমাজ মৌনই রইল।
আরজিকর হাসপাতালে একজন মহিলা ডাক্তারের নৃশংস হত্যার ঘটনার ফলে আমাদের সকলের মনোজগতে যে একটা বিষয় বিশেষভাবে আন্দোলিত হচ্ছে তা হল কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয় । আসমুদ্র হিমাচলের নিদ্রিত ভারতবাসী যেন হঠাৎ করেই জেগে উঠেছে । দলমত নির্বিশেষে সকলে পথে নামছেন, প্রতিবাদ করছেন, আরজিকরের ঘটনার দ্রুত বিচার চাইছেন । মাননীয় সর্বোচ্চ আদালত হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাবিধি প্রস্তুত করার জন্য একটি কমিটি করেছেন, যে কমিটি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও কর্মীদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায় তা স্থির করবে ।
সর্বোচ্চ আদালতের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েও বলতে হয় যে ভারতের অগণিত চাকুরিরত বা বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত শ্রমজীবী মানুষেরও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র রয়েছে যেখানে তাঁরা গায়ের ঘাম ঝরিয়ে, শ্রম দিয়ে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রেখেছেন । এই সমস্ত অফিস বা কলকারখানাতে কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি আইন ভারতে প্রবর্তিত হয়েছে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই আইনগুলির প্রয়োগের ক্ষেত্র প্রায় শূন্য । কারখানাতে শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন "ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট ১৯৪৮" । এই আইনে কারখানার অভ্যন্তরে পুরুষ এবং মহিলা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কয়েকটি নিয়মনীতি প্রবর্তন করা অবশ্য কর্তব্য । বিষয়গুলি কারখানাতে সঠিকভাবে রূপায়িত হচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্ব শ্রমদপ্তরের অধীনস্ত কারখানা পরিদর্শকদের । কিন্তু বাস্তবে কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমজীবী মানুষগুলির জন্য সামান্যতম সুরক্ষার বন্দোবস্তও নেই । বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিকরা ক্রমাগত পেশাগত রোগে আক্রান্ত হন আর আক্রান্ত শ্রমিক কাজ করতে সক্ষম না হলেই কারখানা থেকে বহিষ্কার, হতভাগ্য শ্রমিকটি অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষারত হয়ে যায় । পেশাগত রোগের যন্ত্রণা থেকে তার মুক্তি পাওয়ার একটিই পথ - মৃত্যু । বিভিন্ন পাথরকলে বা খাদানে কাজ করতে গিয়ে কত মানুষ যে সিলেকোসিস নামক মারণ রোগের শিকার হয়েছেন তার হিসেব নেই ! কারণ সিলেকোসিস রোগে আক্রান্ত শ্রমিক, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, সবাই অত্যন্ত গরীব এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ । ভারতীয় সংবিধানে যতই গর্বিত বিষয় বর্ণিত হোক না কেন প্রান্তিক মানুষ প্রকৃতপক্ষে এক অদ্ভুত আঁধারের আবর্তের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করে।
১৯৪৮ সালের কারখানা আইন ছাড়াও ভারতে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে যেগুলিতে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে । যেমন 'ডেঞ্জারাস মেশিন রেগুলেশন অ্যাক্ট ১৯৮৩', বিড়ি শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য ১৯৬৬ সালের আইন বা আন্ত:রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ১৯৭৯ সালের আইনে শ্রমজীবী মানুষদের জন্য অনেক কথা বলা হলেও কার্যত তা কোনোদিনই প্রযোজ্য হয়নি । পশ্চিমবঙ্গের যে কোন ইটখোলাতে গেলে দেখতে পাবেন কী অবর্ণনীয় অবস্থার মধ্যে সেখানকার শ্রমিকরা তাঁদের পরিবার ও বাচ্চাদের নিয়ে সামান্যতম সুযোগ সুবিধা না পেয়েও কাজ করতে বাধ্য হন । সেখানে না আছে ঘর, চিকিৎসার বন্দোবস্ত কিংবা বাচ্চাদের পড়াশুনোর বন্দোবস্ত । এই আদিম নিষ্ঠুরতাই যেন ওদের একমাত্র প্রাপ্য । ওরা প্রকৃত অর্থেই এক নেই রাজ্যের মানুষ!
সাম্প্রতিককালে মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের এই উদ্যোগের ফলে হাসপাতাল, নার্সিংহোম বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষাজনিত আইন প্রণীত হলেও তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসকদের উপর । যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসকরা আজও ভারতবর্ষের বুকে কর্মস্থলে সুরক্ষার আইনগুলি কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছেন । প্রশাসকদের এই ব্যর্থতা সর্বজনবিদিত । ভারতবর্ষে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তাঁদের নির্দেশে প্রশাসকরা আইনগুলিকে কার্যকর করেন ।ভারতবর্ষে বামপন্থী বা দক্ষিণপন্থী মূল রাজনৈতিক দলগুলি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সময়ে রাজ্যে বা কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসীন ছিলেন কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বা পরিবেশমিত্র সুরক্ষার বিষয়টি কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ কোন উদ্যোগ ছিলো না, আজও নেই । এই পরিস্থিতিতে স্বভাবতই প্রশ্ন থেকে যায় সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন কার্যকরী হবে কি না।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত, কারণ আজও সিলেকোসিস রোগে আক্রান্ত শ্রমিক কিংবা পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জনস্বার্থ মামলা করতে হয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে, যদিও মাননীয় বিচারালয়ে সেই সমস্ত মামলা প্রতীক্ষারতই থেকে যায় । মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতিরা তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা না পেলে সর্বোচ্চ আদালতে দরখাস্ত করার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত রাজ্যের মুখ্য সচিবদের সশরীরে বিচারালয়ে হাজিরা দিতে হয় । কিন্তু শ্রমজীবী মানুষদের দাবি উপেক্ষিত থাকলে আইন কার্যকরী না করার জন্য রাজ্যের মুখ্য সচিবকে ডাকা হয়েছে এমন উদাহরণ পাওয়া দুষ্কর ।
সবশেষে বলতেই হয়, মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই এক চলমান সংগ্রাম । এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে একমাত্র তাহলেই ডাক্তার থেকে নার্স, কারখানায় কর্মরত শ্রমিক কিংবা ইটখোলার অন্ধকারের নেই রাজ্যের মানুষরা জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পাবেন । রবীন্দ্রনাথের ভাষাতে বলতে হয় - নিদ্রিত ভারত জাগে, দারুণ বিপ্লব মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে।

মন্তব্যসমূহ