বিশ্ব ইজতেমার হাত ধরে পুঁইনানের খ্যাতি আজ বিশ্ব জুড়ে
বিশ্ব ইজতেমার
হাত ধরে
পুঁইনানের খ্যাতি
আজ বিশ্ব জুড়ে
সেখ জিন্নাত আলি
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পোলবা-দাদপুর ব্লকের পুঁইনান গ্রামটি বর্তমানে কেবল একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ নয়। আজ অর্থাৎ 2026 সালে এটি বিশ্বের আধ্যাত্মিক মানচিত্রে এক অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিশ্ব ইজতেমার জন্য পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পুঁইনান লক্ষ লক্ষ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় এবছর।
হৃদয়ের সন্ধানে বিশ্ব ইজতেমা,
বাংলার পল্লিপ্রকৃতির শান্ত কোলে অবস্থিত হুগলির পুঁইনান গ্রামটি এবছর কয়েক দিনের জন্য এক বিশাল জনারণ্যে পরিণত হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ভিড় থাকলেও, এর মূল সুরটি হলো আধ্যাত্মিকতা, আত্মশুদ্ধি এবং বিশ্বশান্তির জন্য প্রার্থনা। দিল্লির নিজামুদ্দিন ইজতেমার আদলেই এখানে তবলিগি জামাতের উদ্যোগে এই সম্মেলন আয়োজিত হয়।
পুঁইনানের ইজতেমা কেবল একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়। এটি মানুষের অন্তরের কলুষতা দূর করার এক পাঠশালা বলা যেতে পারে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সামিয়ানার নিচে যখন এক কোটির অধিক মানুষ একসাথে কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে সিজদাহ করেন, তখন সেখানে কোনো ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকে না। ইসলামের মূল শিক্ষা—শান্তি, ভ্রাতৃত্ব এবং পরমতসহিষ্ণুতা—এখানে অত্যন্ত সহজভাবে প্রচার করা হয়।
পুঁইনান ইজতেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যবস্থাপনা। কয়েক হাজার তরুণ ও বৃদ্ধ কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। আগত মেহমানদের জন্য রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা, খাওয়ার জল সরবরাহ করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা—সবই চলে ঘড়ির কাঁটার মতো নির্ভুলভাবে। এটি আধুনিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাছেও এক বড় বিস্ময়।
হুগলির এই প্রান্তিক এলাকায় ইজতেমা চলাকালীন এক অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় সব ধর্মের মানুষই এই বিশাল আয়োজনকে সফল করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। পথচলতি মানুষের সেবা করা বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় ক্লাবের সদস্যদের ভূমিকা বাংলার চিরায়ত "সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা"র ছবিকেই উজ্জ্বল করে তোলে।
পুঁইনানের ইজতেমায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। উন্নত সাউন্ড সিস্টেম, বিশাল জায়গাজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। তবুও, মাটির ওপর চট বা মাদুর পেতে বসে থাকা আর সাধারণ খাবার খাওয়ার সেই আদিম সারল্য আজও অমলিন।
ইজতেমার শেষ দিন অর্থাৎ 'আখেরি মোনাজাত'-এর মাহেন্দ্রক্ষণটি সবচেয়ে আবেগপূর্ণ। দুহাত তুলে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চান, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের জন্য এবং দেশের কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেন, তখন এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে গোটা এলাকায়। সেই সম্মিলিত কান্নার শব্দে যেন আকাশের বাতাসও ভারী হয়ে ওঠে।
পুঁইনানের বিশ্ব ইজতেমা কেবল সংখ্যার বিচারে বড় নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের প্রশস্ততারও পরিচয় দেয়। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে এসে কয়েকটা দিন স্রষ্টার স্মরণে এবং মানবতার সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দেওয়ার বিশ্বখ্যাত এই ধারা পুঁইনানকে আজ এক পুণ্যভূমিতে পরিণত করেছে।
কোটি কোটি মানুষের সমাগম সত্বেও শান্তি এবং নিরাপত্তা কোন ভাবেই বিঘ্নিত হয়নি। ভিন ধর্মের মানুষ বা ব্যবসায়ীদের এখানে বয়কট করা হয়নি। তবুও কি আশ্চর্য! প্রথম সারির গন মাধ্যমে এত বিশাল এক কর্মকাণ্ডের সেভাবে কোন প্রচার নেই। এটা মিডিয়ায় দ্বিচারিতা বলা যেতে পারে। আগামীতে হয়তোবা এই প্রথম সারির মিডিয়া ইজতেমাকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে কলুষিত করার চেষ্টা করবে। যেমনটা করেছিল কোভিড - 19 শুরুর সময়। যাইহোক, আশার আলো হল আজ সোশ্যাল মিডিয়া প্রথম সারির মিডিয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং গ্রহণযোগ্য হয়েছে উঠছে, তাই প্রথম সারির মিডিয়া ইজতেমার ময়দান থেকে সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া শান্তি, সম্প্রীতি ও সাফল্যের বার্তাকে আড়াল করতে চাইলেও পারবেনা এমনটা আশা করা যেতেই পারে।
style="text-align: justify;">












মন্তব্যসমূহ