ফ্লোটিলার আলো আর মানুষের জেগে থাকা

ফ্লোটিলার আলো

 আর মানুষের 

জেগে থাকা


অয়ন মুখোপাধ্যায়

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মুহূর্ত অনেকবার এসেছে, যখন অচেনা মানুষ একে অপরের জন্য দাঁড়িয়েছে। কোনও ভূখণ্ডের সীমান্তের মধ্যে আটকে না থেকে, কোনও জাতীয়তাবাদী গর্বে না ভেসে গিয়ে, তারা দাঁড়িয়েছে কেবল মানুষ হিসেবেই। আজ যখন আমরা ভাবছি, আদর্শ বলে কিছু বাকি নেই, স্বপ্ন বলে কিছু নেই, প্রত্যেক মানুষ শুধু নিজের মুনাফা গোনে, নিজের আরামের ঘেরাটোপে লুকিয়ে থাকে—ঠিক সেই সময়ে সমুদ্রের বুকে ভেসে উঠেছে এক অভাবনীয় দৃশ্য। ফ্লোটিলা।

এটা কোনও বাণিজ্যিক বহর নয়, কোনও রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও নয়। প্রায় ৪৪টি দেশের পাঁচ শতাধিক মানুষ একসাথে সমুদ্রযাত্রায় নেমেছেন। লক্ষ্য একটাই—ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানো। গাজার রক্তাক্ত মাটির জন্য, শ্বাসরুদ্ধ মানুষের জীবনের জন্য, স্বাধীনতার ডাকের জন্য তারা পাড়ি দিয়েছে এক অনিশ্চিত সমুদ্রপথে। ভেসে চলেছে বারোটি জাহাজে, ঝড়ের ভয় উপেক্ষা করে। সেই যাত্রার সঙ্গী হয়েছে ডলফিনের দলও। প্রকৃতিও যেন এই স্বপ্নযাত্রার অংশীদার।

কিন্তু বাস্তব কতটা নিষ্ঠুর। গভীর রাতে ইজরায়েলি নৌসেনা থাবা বসিয়েছে। বাজেয়াপ্ত করেছে বারোটি জাহাজ। আটক করেছে মানুষগুলোকে। তাদের রুখতে চেয়েছে ক্ষমতার অহংকার। অথচ এভাবে কি কোনও স্বপ্নকে আটকে রাখা যায়?

ইউরোপ জুড়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে তখনই। ইটালি, স্পেন, জার্মানি, বেলজিয়াম—প্রায় প্রতিটি শহরে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। মিছিল হয়েছে রাতভর। এক অচেনা জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার দাবিতে তারা স্লোগান তুলেছে। শ্রমিক সংগঠন ডেকেছে বন্ধ। ইউরোপের রাস্তায় সাধারণ মানুষ দেখিয়েছে, অন্যের শিকল তাদেরও নিঃশ্বাস রোধ করে।

আজকের পৃথিবীতে অনেকেই বলে, আদর্শ মরে গেছে। আমাদের সময়ে কেউ আর কোনও বিশ্বাসে বাঁচে না। স্বপ্ন বেচে গেছে ক্ষমতার কাছে, মানুষের হৃদয় বন্দি হয়েছে ভোগের মোহে। সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে নিস্পৃহতা, স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস। এমন এক সময়ে ফ্লোটিলা যেন ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো এক প্রতীক। দেখিয়ে দিচ্ছে, স্বপ্ন এখনও আছে, আদর্শ এখনও আছে। আছে বলেই মানুষ নিজের সীমানা ভেঙে অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

শ্রমিকের মিছিল যখন শহরের চত্বরে নেমে আসে, তখন তা কেবল এক রাজনৈতিক দাবি নয়। তখন সেটা এক নৈতিক ঘোষণা। ৫০টিরও বেশি দেশের মানুষ যখন একসাথে দাঁড়ায়, তখন সেটা কেবল গাজার প্রতি সহানুভূতি নয়—তখন সেটা এক প্রমাণ, মানুষ এখনও মানুষ হতে চায়।

ফ্লোটিলা এখানে শুধু জাহাজ নয়। এটা আমাদের বিবেকের আয়না। প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, আমরা কি সত্যিই স্বপ্নহীন? আমরা কি সত্যিই নিছক ভোগের দাসে পরিণত হয়েছি? যদি তাই হতো, তবে আজ এই সমুদ্রযাত্রা সম্ভব হতো না। যদি তাই হতো, তবে ইউরোপের শ্রমিকেরা নিজেদের রুটি-রুজি ছেড়ে এক অচেনা ভূমির জন্য পথে নামতো না।

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, স্বপ্ন কখনও এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ভিয়েতনামের সংগ্রামে যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন দূরের দেশগুলির মানুষ ভিয়েতনামের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার এপারথাইডের বিরুদ্ধে যখন লড়াই চলছিল, তখনও হাজারো অচেনা মানুষ জেগে উঠেছিল। আজ গাজার মানুষের জন্য দাঁড়ানোও সেই ঐতিহ্যেরই পুনর্জন্ম।

এই দৃশ্যের একটা গভীর তাৎপর্য আছে। সেটা হচ্ছে—পৃথিবীর মানুষ বুঝে গেছে, কোনও এক দেশের স্বাধীনতা অন্য দেশের নিরাপত্তার সাথে বাঁধা। গাজার শিশুর কান্না আমাদেরও কানে পৌঁছায়। ফিলিস্তিনের ওপর চালানো বোমা আমাদেরও অন্তর কাঁপায়। পৃথিবী নামের এই ছোট্ট গ্রহে অন্যের অশান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়। তাই অন্যের পাশে দাঁড়ানো মানে নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

কিন্তু রাষ্ট্রগুলো কি তা বোঝে? রাষ্ট্র মানে ক্ষমতার আসন। রাষ্ট্র মানে প্রাচীর তোলা। রাষ্ট্র মানে ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে মানুষকে বন্দি রাখা। রাষ্ট্রের এই মায়াজালে আমরা প্রায় ভুলে গেছি, আসলে আমরা সবাই একই মানবসমাজের অংশ। ফ্লোটিলা সেই ভুল ভাঙাচ্ছে। বলছে, তোমার সীমানা আমার সীমানা, তোমার লড়াই আমার লড়াই।

ইজরায়েলি সেনা হয়তো আজ ফ্লোটিলার জাহাজ বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু তারা কি মানুষের বিশ্বাস বাজেয়াপ্ত করতে পেরেছে? তারা কি মানুষের সংহতি কেড়ে নিতে পেরেছে? ইতিহাস প্রমাণ করেছে, সেনার বন্দুক দিয়ে দেহ ধরা যায়, কিন্তু মানুষের স্বপ্নকে ধরা যায় না।

আজকের সময়ে সবচেয়ে বেশি দরকার এই স্বপ্নের পুনর্জাগরণ। আমাদের সমাজ, আমাদের রাজনীতি, আমাদের অর্থনীতি—সব কিছুতেই ভেসে উঠছে অবিশ্বাস, প্রতারণা আর ভয়। এই আঁধারে ফ্লোটিলা এক প্রদীপ। এক মশাল।

শ্রমিকদের পথে নামা, ছাত্রদের পতাকা ওড়ানো, সাধারণ মানুষের রাতভর স্লোগান—এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী এখনও মরে যায়নি। এখনও মানুষ বাঁচতে চায় অন্যের সাথে মিলেমিশে। এখনও মানুষ বিশ্বাস করে ন্যায়বিচারে।

হয়তো এ আন্দোলন আগামীকাল হারিয়ে যাবে খবরের কাগজের পাতার ভিড়ে। হয়তো রাষ্ট্র আর পুঁজির দমনযন্ত্র আরও শক্ত করে ফেলবে তার গ্রাস। কিন্তু তবুও ফ্লোটিলা থেকে যাবে এক চিহ্ন হিসেবে। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে—এই সময়েও মানুষ একবার জেগে উঠেছিল।

কেউ কেউ বলছে, এ শুধু এক ক্ষণস্থায়ী প্রতিবাদ। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী হলেও তা অর্থহীন নয়। ক্ষণস্থায়ী আগুনও অন্ধকার ভেঙে আলো দেখায়। ক্ষণস্থায়ী জেগে ওঠাও প্রমাণ করে, নিদ্রা কখনো সম্পূর্ণ নয়।

ফ্লোটিলা তাই আমাদের সময়ের এক আলোকবর্তিকা। প্রতিদিনের বঞ্চনা, ভোগ, মুনাফার লোভে যে অন্ধকার তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে এই যাত্রা যেন এক অসাধারণ ঘোষণা।

ঘুমিয়ে পড়া পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার—এখনও কেউ কেউ জেগে আছে।






 



style="text-align: justify;">




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার