পুরোহিত, হস্তরেখা ও শাসকের সত্য
পুরোহিত, হস্তরেখা ও
শাসকের সত্য
অয়ন মুখোপাধ্যায়
শান্তা দত্তের উক্তিটি একাধারে দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক। তিনি বলেছেন, পুরোহিত জানেন ভগবান বলে কিছু নেই, হস্তরেখাবিদ জানেন হাতের দাগে ভবিষ্যৎ লেখা নেই, আর শাসক জানেন স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। এই তিনটি দৃষ্টান্ত আসলে একই সূত্রে গাঁথা। প্রতিবারই যাঁরা একটি ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশাধিকার পান, যাঁরা তার অন্তর্লোক দেখেন, তাঁরাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন সেই ব্যবস্থার ভেতরে কতটা ফাঁপা আর কতটা ভ্রান্তি লুকিয়ে আছে। সাধারণ মানুষ বাইরে থেকে যা বিশ্বাস করে, যা ভক্তিভরে মেনে চলে, ভেতরের মানুষ জানেন তার প্রকৃত রূপ।
ধর্মের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। সাধারণ মানুষ দেবতার কাছে প্রার্থনা করে, দুঃখে কাতর হলে মন্দিরে যায়, পূজার্চনায় মন দেয়। কিন্তু পুরোহিত জানেন দেবতা আসলে মূর্তির মধ্যে নেই, তাঁর কাছে দেবতা হচ্ছে আচার, মন্ত্র আর প্রতীক। পুরোহিতের অস্তিত্ব টিকে আছে ভক্তের বিশ্বাসের উপর, অথচ পুরোহিত নিজে জানেন সেই বিশ্বাসের কতটা মায়া। ইতিহাসে দেখা যায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বহু সময়েই মানুষের আবেগকে শাসনের হাতিয়ার বানিয়েছে। দেবতা বা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্তৃত্বের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ প্রশ্ন না তোলে। অথচ পুরোহিত বা ধর্মযাজকেরা নিজেরাই জানেন এর ভেতরের শূন্যতা। এই দ্বিচারিতার ভিতরেই ধর্মের ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে।
অন্ধবিশ্বাস বা অলৌকিক বিশ্বাসও এরকমই কাজ করে। হস্তরেখাবিদ, জ্যোতিষী বা ভাগ্য গণনাকারীরা যাঁরা আছেন তাঁরা জানেন মানুষের হাতের দাগ কোনো দিনও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। একজন জ্যোতিষীর জীবন গড়ে ওঠে মানুষের অনিশ্চয়তা, ভয়ের মধ্যে দিয়ে। মানুষ জীবনের অজানা দিকগুলোতে নিশ্চয়তা খোঁজে, ভাগ্যের দিকনির্দেশনা চায়, তাই সে হস্তরেখাবিদের কাছে যায়। এই চাহিদাকে পুঁজি করে একটি ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়, অথচ ব্যবসার চালক ভালো করেই জানেন তাঁর পদ্ধতির ভিতর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এও এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ভ্রান্তি, যেখানে জানাশোনা মানুষ অজ্ঞাত জনতাকে অন্ধকারে রাখে।
style="text-align: justify;">






মন্তব্যসমূহ