ভগত সিং : বিপ্লবের জন্য চিরকালের সফটওয়্যার

 ভগত সিং : বিপ্লবের জন্য

 চিরকালের সফটওয়্যার

অয়ন মুখোপাধ্যায় 

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যেগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা নেই—বরং এক অদৃশ্য বিদ্যুতের মতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। ভগৎ সিং সেই নামগুলির মধ্যে অন্যতম। আমরা তাঁকে শহীদ বলি, বীর বলি, দেশপ্রেমিক বলি। কিন্তু সত্যি বলতে গেলে এই অভিধাগুলো তাঁকে ধরতে পারে না। ভগৎ সিং ছিলেন এক চিরকালীন আপডেট—এক সফটওয়্যার—যা ইনস্টল হলেই যে-কোনো যুগে বিদ্রোহ, ন্যায় আর স্বাধীনতার জন্য চেতনা জ্বলে ওঠে।

আজকের ভাষায় বললে, বিপ্লব কোনো অ্যাপ নয়, যেটা ডাউনলোড করলেই মুহূর্তে কাজ করে। বিপ্লব হলো এক সফটওয়্যার—যার কোড লেখার জন্য লাগে যুক্তি, সাহস আর দৃষ্টিভঙ্গি। আর ভগৎ সিং সেই কোডারের নাম, যিনি ইতিহাসের হার্ডওয়্যারে চিরকালীন প্রোগ্রাম চালু করেছিলেন।

সংসদে বোমা, কিন্তু প্রতীকের ভাষায়

১৯২৯ সালের ৮ই এপ্রিল, দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় যে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত, তা নিছক বিস্ফোরণ ছিল না। সেটা ছিল এক প্রতীকী কর্মসূচি। তাঁরা নিজেরাই বোমার পর ধরা দিলেন পুলিশের হাতে। এর উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—“To make the deaf hear।” বোমা দিয়ে কাউকে মারতে নয়, বরং নিস্তেজ দেশবাসীর ঘুম ভাঙাতে।

আজকের চোখে দেখলে, সেটা ছিল এক ধরনের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘ভাইরাল পোস্ট’। যেমন এখন সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমে হঠাৎ কোনো পোস্ট ভাইরাল হয়ে মানুষকে আলোড়িত করে, তেমনই সংসদের সেই বোমা মুহূর্তে কোটি মানুষের মনে আঘাত হেনেছিল। বোমা ছিল আসলে মেসেজ—আর সেই মেসেজ চিরকালীন।

শহীদ নয়, চিন্তার প্রোগ্রামার

ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এই যে, তিনি কেবল আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবী ছিলেন না। তাঁর মাথার ভেতর ছিল বিপুল চিন্তার ভাণ্ডার। ২৩ বছর বয়সী একজন যুবক যে এত গভীরভাবে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন নিয়ে ভাবতে পারে, তা আজও অবাক করে।

তিনি মার্ক্স, লেনিন, রুশ বিপ্লব নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থাগারে ছিল দারুণ সব বই। তাঁর প্রবন্ধ Why I am an Atheist আজও আধুনিক। সেই লেখায় তিনি যুক্তি দিয়ে বোঝালেন কেন অন্ধবিশ্বাস মানুষকে স্বাধীনতা দেয় না, কেন যুক্তি ও বিজ্ঞানই মানুষের মুক্তির আসল পথ।

আজকের দিনে তাঁর অবস্থান বোঝাতে গেলে বলা যায়, তিনি ছিলেন একধরনের ওপেন-সোর্স কোডার। যে কোড সবাই ব্যবহার করতে পারে, যেটা যে-কেউ নিজেদের মতো করে লিখে নিতে পারে। তাঁর চিন্তা আসলে এক উন্মুক্ত সফটওয়্যার, যা আজও কার্যকর।

স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা কাদের জন্য?

ভগৎ সিংয়ের স্বপ্ন কেবল বিদেশি শাসক তাড়ানো নয়। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে শোষণ থাকবে না, বৈষম্য থাকবে না। কৃষক যেন অভুক্ত না থাকে, শ্রমিক যেন দাসত্ব না করে, আর শিক্ষা যেন কেবল ধনীদের জন্য সীমাবদ্ধ না হয়।

তাঁর স্বপ্নে ছিল এক শ্রেণিহীন, বৈষম্যহীন ভারত। আজও যখন আমরা দেখি ধনী-গরিবের তফাৎ, কর্পোরেট দুনিয়ার শোষণ, ধর্মীয় বিভাজন বা রাজনৈতিক দুর্নীতি—তখন মনে হয় ভগৎ সিংয়ের সেই স্বপ্ন কতটাই না অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

একবার তিনি লিখেছিলেন, “বিপ্লব মানে কেবল সশস্ত্র লড়াই নয়। বিপ্লব মানে নতুন সমাজব্যবস্থা।” তাঁর এই কথা আজকের দিনে আরও প্রাসঙ্গিক। আমরা স্বাধীন হলেও, সত্যিকার অর্থে সমান সুযোগ কি সকলের আছে? নাকি স্বাধীনতার নামে তৈরি হয়েছে আরেকটা কৃত্রিম সফটওয়্যার, যা কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষ চালায়?

আজকের প্রেক্ষাপটে ভগৎ সিং

যদি আজ ভগৎ সিং বেঁচে থাকতেন, তিনি হয়তো হতেন ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্ট। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সে ছড়ানো ভুয়ো খবরের সফটওয়্যার ভেঙে দিতেন, ফেসবুক-টুইটারে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার সার্ভার ক্র্যাশ করে দিতেন। তিনি হতেন আজকের হ্যাকটিভিস্ট, যিনি মিথ্যা ও অন্যায়ের কোড ভেঙে সত্যের নতুন আপডেট দিতেন।

তিনি জানতেন, শুধু তলোয়ার বা বন্দুক দিয়ে কোনো ব্যবস্থা ভাঙা যায় না। লাগে নতুন চিন্তা, নতুন যুক্তি, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আজও তাই তাঁর সফটওয়্যার আমাদের শেখায়—কোনো অন্যায় যদি সিস্টেমের অংশ হয়ে যায়, তাহলে তাকে রিবুট করতেই হবে।

বিপ্লবের অ্যালগরিদম

ভগৎ সিংয়ের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর কাজগুলো যেন এক অ্যালগরিদমের মতো সাজানো।

প্রথমে পাঠ—চেতনা তৈরি।

তারপর সংগঠন—যুবকদের একত্র করা।

এরপর কর্মসূচি—বোমা, লিফলেট, কোর্টে বক্তব্য।

আর শেষে আত্মত্যাগ—যা সিস্টেমকে নাড়িয়ে দেয়।

এই অ্যালগরিদম বারবার রিপ্লে হয় ইতিহাসে। কিউবা থেকে ভিয়েতনাম, আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা—প্রতিটি বিপ্লবে এই অ্যালগরিদমের ছায়া আছে। তাই ভগৎ সিং শুধু ভারতের জন্য নন, বৈশ্বিক বিপ্লবের জন্যও এক চিরকালের সফটওয়্যার।

চিরকালের সফটওয়্যার

সফটওয়্যার মানে এমন কিছু, যা হার্ডওয়্যারের ভেতর প্রাণ সঞ্চার করে। মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র—সবই হার্ডওয়্যার। ভগৎ সিং সেই সফটওয়্যার, যা এই হার্ডওয়্যারে চলতে শুরু করলে মানুষ জেগে ওঠে, প্রশ্ন করে, বিদ্রোহ করে।

তাঁর সফটওয়্যার এমন যে একবার ইনস্টল হয়ে গেলে আনইনস্টল করা যায় না। ফাঁসি দিয়ে তাঁকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল ব্রিটিশরা, কিন্তু মুছে দিতে পারেনি। বরং তাঁর কোড আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। কলকাতার কফিহাউস, বম্বের মিলে, পাঞ্জাবের খেতখামারে—সবখানে ছড়িয়ে গেল ভগৎ সিং-এর কোড।

চিরকালের ছায়া

ভাবুন, ১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ। লাহোর সেন্ট্রাল জেল। গভীর রাত। ফাঁসির মঞ্চে উঠেছেন ভগৎ সিং, রাজগুরু আর সুকদেব। দড়ি ঝুলছে। কারারক্ষীরা প্রস্তুত।

কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল, তিনটি ছায়া দড়ি পেরিয়ে বেরিয়ে গেল জানলা দিয়ে।

একটি ছায়া ঢুকে পড়ল মুম্বইয়ের এক মিলমজুরের মিছিলে।

আরেকটি ছায়া ভেসে গেল কলকাতার কফিহাউসে, তরুণ কবির চোখে।

তৃতীয় ছায়া চলে গেল ভবিষ্যতের টাইমলাইনে, আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায়—যেখানে এখনও কেউ কেউ পোস্ট করে, “ভগৎ সিং জিন্দাবাদ।”

দড়ি কষা হয়েছিল, শরীর নিস্তব্ধ হয়েছিল। কিন্তু সফটওয়্যার মরে না।

ভগৎ সিং আসলে চিরকালের প্রোগ্রাম—যাকে একবার চালু করলে আর কখনও বন্ধ করা যায় না।

কোডের পরেও

ভগৎ সিংকে শুধু শহীদ বললে কম বলা হয়। তিনি ছিলেন বিপ্লবের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বিদ্রোহের অ্যালগরিদম লেখক, ন্যায়ের হ্যাকটিভিস্ট। তাঁর প্রোগ্রাম এখনও আমাদের শেখায়—স্বাধীনতা মানে কেবল পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানে সমান অধিকার, ন্যায়বিচার, আর মানুষের মুক্তি।

আজকের যুগে দাঁড়িয়ে, যখন আমরা দেখি গণতন্ত্র অনেক সময় অ্যালগরিদমে বন্দি, যখন সত্যকে মিথ্যা ঢেকে দেয়, তখন ভগৎ সিংয়ের কোড আবারও দরকার। কারণ বিপ্লব কখনও পুরোনো হয় না। বিপ্লব সবসময় এক নতুন সফটওয়্যার—আর ভগৎ সিং সেই সফটওয়্যারের চিরন্তন ডেভেলপার।














style="text-align: justify;">





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার