বিদ্যাসাগর রি-ভিজিটেড : সমকালীন সংকটে উত্তর

 


বিদ্যাসাগর রি-ভিজিটেড :

 সমকালীন সংকটে উত্তর

অয়ন মুখোপাধ্যায়

বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আমরা প্রায়শই ভক্তিভরে বলি—‘দয়ার সাগর’। এই একটি বিশেষণে তাঁর জীবনকে বেঁধে ফেলা সহজ। কিন্তু তাঁর মধ্যে কেবল দয়া নয়, ছিল যুক্তি, দৃঢ়তা, বিদ্রোহ, মানবিকতা। তাঁর জীবন আসলে এক দীর্ঘ লড়াই—শিক্ষার জন্য, নারীর অধিকার রক্ষার জন্য, সাম্যের জন্য। সেই লড়াই আমাদের আজও প্রশ্ন করে, আজও পথ দেখায়। একবিংশ শতকের সমাজ যতই প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে উঠুক, বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ততই প্রাসঙ্গিক।

শিক্ষার প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সৈনিক। সংস্কৃত কলেজে তিনি প্রাচীন একচেটিয়া শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। শুধু উচ্চবর্ণের ছেলে নয়, নিম্নবর্গেরও শিক্ষার অধিকার আছে—এই দাবিই ছিল তাঁর মূল কথা। একাধারে তিনি নতুন পাঠক্রম চালু করলেন, বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন, আবার মফস্বলে অসংখ্য স্কুল খুললেন। এমনকি গরিব ছাত্রদের বই নিজে কিনে দিতেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের দিনে এই পাঠ কোথায় দাঁড়ায়? শিক্ষা এখন এক বিরাট বাজার। প্রাইভেট স্কুলের ফি সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে। কোচিং ইন্ডাস্ট্রি কোটি কোটি টাকা ঘুরিয়ে নিচ্ছে। রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমশ কমছে। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, শিক্ষা হবে সর্বজনের অধিকার। অথচ আজ, শিক্ষা ধীরে ধীরে পণ্য হয়ে উঠছে। বিদ্যাসাগরের উত্তর এখানেই—শিক্ষাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে ফিরিয়ে আনো।

নারীর প্রসঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই বিধবা-বিবাহের প্রসঙ্গ সামনে আসে। ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাশ করাতে তিনি মুখ্য ভূমিকা নিলেন। কিন্তু শুধু আইন বানালেই তো সমাজ বদলায় না। তাই তিনি নিজে প্রথম বিধবা-বিবাহ অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন, নিজের অর্থ খরচ করে। তবু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আক্রমণ থামেনি। তখন বলা হত—‘ধর্ম নষ্ট হবে’। আজকের সমাজে এই দৃশ্য কতটা পরিচিত! নারী-নিরাপত্তার প্রশ্নে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবে নারী হেনস্তা থামে না। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন আছে, তবু গ্রামে-গঞ্জে অজস্র কিশোরী এখনো অকালবিবাহের শিকার হয়। কর্মক্ষেত্রে নারী বৈষম্য কমেনি। বিদ্যাসাগরের পথ এখানেই জরুরি—আইনের বাইরে গিয়ে সমাজচেতনা বদলাতে হবে। নারীকে সমান মর্যাদা না দিলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।

প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রসঙ্গ আলাদা করে বলতেই হয়। বিদ্যাসাগর যুক্তি দিয়ে, শাস্ত্র উদ্ধৃত করে দেখিয়েছিলেন বিধবা-বিবাহ নিষিদ্ধ নয়। অথচ তবু সমাজের এক বিরাট অংশ তাঁকে গালাগালি দিল, ধর্মদ্রোহী বলল। সেই সময়কার সংবাদপত্রে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে কটূক্তির শেষ ছিল না। আজকের সময়ে কী ভিন্ন ছবি দেখা যায়? বিজ্ঞান, যুক্তি, প্রগতিশীল চিন্তার বিরুদ্ধে আজও আক্রমণ থামে না। আজও নতুন কোনো সামাজিক সংস্কারের কথা উঠলেই বলা হয়, ‘সংস্কৃতি নষ্ট হবে’, ‘ধর্ম আঘাত পাবে’। ইতিহাস যেন নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা এখানেই—প্রতিক্রিয়াশীলতার মুখে যুক্তি ধরে রাখতে হয়, দৃঢ় থাকতে হয়।

নৈতিকতার প্রশ্নে তাঁর জীবন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশাল জ্ঞান ছিল তাঁর, ক্ষমতাও ছিল, অথচ ব্যক্তিগত সম্পদ বলতে কিছুই ছিল না। জীবনের শেষদিকে তিনি প্রায় নিঃস্ব। তবু দানশীলতায় ছিলেন অতুলনীয়। নিজের ভাতের ভাগ গরিবকে খাইয়েছেন। যেকোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজকের সময়ে যেখানে দুর্নীতি রাজনীতির অলঙ্কার, যেখানে স্বার্থপরতা জীবনের নিয়ম, যেখানে ক্ষমতার লোভ সর্বব্যাপী—সেখানে বিদ্যাসাগরের চরিত্র এক ধ্রুবতারা। তিনি দেখিয়েছেন, টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনীতির ওপর দাঁড়ায় না, তার ভিত্তি নৈতিকতা।

জাতপাত ও পরিচয়ের প্রশ্নও তাঁর সময়ে প্রবল ছিল। সংস্কৃত কলেজে শিক্ষার সুযোগ শুধু ব্রাহ্মণদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। বিদ্যাসাগর সেই দ্বার ভেঙে দিলেন। নিম্নবর্গের ছাত্রদের জন্য তিনি দরজা খুললেন। এ যেন আজকের দিনেরও আয়না। জাতপাত, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এখনও আমাদের সমাজকে ছিন্ন করছে। বিভাজনকে অস্ত্র বানিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা হচ্ছে। বিদ্যাসাগর আমাদের শেখালেন, সমাজ টিকবে অন্তর্ভুক্তির ওপর, বিভাজনের ওপর নয়।

আজ আমরা ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে। হাতে স্মার্টফোন, পাশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রযুক্তি প্রতিদিন আমাদের জীবন বদলাচ্ছে। কিন্তু মানুষের মানবিকতা কি বদলাচ্ছে? না কি সংকুচিত হচ্ছে? অ্যালগরিদমের ভিড়ে মানুষ যেন মানুষকেই ভুলে যাচ্ছে। বিদ্যাসাগরের জীবন এখানে আমাদের টেনে আনে অন্য পথে। তিনি বলেছিলেন—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আসল কাজ।

এই জন্যই বিদ্যাসাগরকে রি-ভিজিট করা জরুরি। কেবল ভক্তিভরে স্মরণ করলে চলবে না। তাঁর চিন্তাকে, তাঁর যুক্তিকে, তাঁর নৈতিকতাকে আজকের সমাজে পুনঃস্থাপন করতে হবে। শিক্ষা, নারী, নৈতিকতা, সাম্য—প্রতিটি প্রশ্নে তাঁর উত্তর আজও কার্যকর। তিনি অতীতের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নন। তিনি বর্তমান। তিনি ভবিষ্যতও।

বিদ্যাসাগরের জীবন আমাদের সামনে এক স্পষ্ট পথ রেখে গেছে। সেই পথ মানবিকতার। সেই পথ যুক্তির। সেই পথ সমতার। আজ যদি আমরা সেই পথে হাঁটতে পারি, তবে আমাদের সমাজ সত্যিই অগ্রসর হবে। না হলে ইতিহাস কেবল পুনরাবৃত্তিই করবে। আর প্রতিবারই আমাদের মনে করাবে—বিদ্যাসাগরকে আমরা স্মরণ করি, কিন্তু তাঁর শিক্ষা ভুলে যাই। 







 এই রকম বিজ্ঞাপন দিতে

 যোগাযোগ করতে পারেন 

১ মাসের বিজ্ঞাপন খরচ

 মাত্র ৩০০ টাকা 






style="text-align: justify;">





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার