রামমোহন থেকে রাইট টু ইনফরমেশন : প্রশ্নের ভেতরেই স্বাধীনতা
রামমোহন থেকে
রাইট টু ইনফরমেশন :
প্রশ্নের ভেতরেই স্বাধীনতা
অয়ন মুখোপাধ্যায়
রামমোহন রায়কে আমরা যতই ভক্তিভরে স্মরণ করি না কেন, তিনি আসলে ছিলেন একেবারে অস্বস্তিকর মানুষ। কারণ তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন। সমাজ যখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিল, তখন তিনি এসে বললেন—“বিধবাকে কেন পুড়তে হবে?” সমাজ যখন ভেবেছিল, মেয়েদের শিক্ষার দরকার নেই, তখন তিনি বললেন—“মেয়ে মানুষ, ওদেরও মাথা আছে।” একে তখনকার গোঁড়ারা দেখলেন ভয়ঙ্কর ধাক্কা হিসেবে। প্রশ্ন মানেই আসল সমস্যা। অন্ধকারে সবাই ভালো ঘুমোয়, আলো জ্বলে উঠলেই চোখে ঝাঁঝ ধরে।
আজ যখন 2025 এ আমরা নিজেদের গর্ব করে বলি—আমরা গণতান্ত্রিক নাগরিক। কিন্তু এই নাগরিকের পরিচয়টাই আসলে তৈরি হয় প্রশ্ন করার ভেতর দিয়ে। আর সেই প্রশ্ন করার আইনগত অধিকার আমাদের দিয়েছে Right to Information। নাম শুনলেই অনেকে কুঁকড়ে যান। কারণ RTI মানে তো সরকারকে, আমলাকে, নেতাকে, ঠিকাদারকে, দপ্তরকে জবাব দিতে হবে। অথচ তাঁরা তো অভ্যস্ত প্রশ্ন করতে, উত্তর দিতে নয়। ফলে RTI-র আবেদন পড়লে অনেক দপ্তরের অবস্থা হয় ঠিক যেমন রামমোহনের বক্তৃতা শুনে পাড়ার গোঁড়াদের হতো—মুখ গম্ভীর, ভুরু কুঁচকানো, ঠোঁট থেকে ভাঁটার মতো ফোঁসফোঁস আওয়াজ।
আসলে প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার এই ধারণা আমাদের সুবিধাজনক নয়। ভোটের সময় প্রশ্ন করার জায়গা থাকে, কিন্তু ভোট শেষ হলেই নাগরিক যেন আবার ‘প্রজা’ হয়ে যায়। স্কুলে শিক্ষক নেই কেন, হাসপাতালে ওষুধ মিলছে না কেন, পঞ্চায়েতের টাকা রাস্তার বদলে নেতার বাড়ির বারান্দায় গেল কেন—এসব প্রশ্ন করলেই উত্তরদাতা গম্ভীর হয়ে যান। কেউ বলেন, “অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমপ্লেক্সিটি।” কেউ বলেন, “প্রসেস চলছে।” আর কেউ বলেন, “তথ্য পাবেন না, সিকিউরিটি ইস্যু।” একেবারে নিখুঁত কৌশল—কথা যত জটিল হবে, প্রশ্ন তত ঠান্ডা হয়ে যাবে।
কিন্তু RTI আইন নাগরিককে দিয়েছে ফাইল ঘেঁটে দেখার অধিকার। টেন্ডার কাকে দেওয়া হলো, বরাদ্দ কত, খরচ কত, কাজ কতদূর এগোল—সবকিছুর উত্তর চাইতে পারে সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ আমলাদের সেই সযত্নে পালিশ করা মুখোশে আঁচড় কাটার ক্ষমতা এসেছে জনগণের হাতে। এ যেন রাষ্ট্রের ঘরে হঠাৎ করে টর্চ জ্বেলে দেওয়া। তাতে সাপ, বিচ্ছু, টিকটিকি সব একসঙ্গে ছুটোছুটি শুরু করে।
রামমোহনের সময়ও সমাজ চমকে উঠেছিল। সতি প্রথার প্রশ্নে তৎকালীন পুরোহিত সমাজের মাটি সরে গিয়েছিল। অনেকেই তাঁকে ইংরেজ সরকারের দালাল বলেছিল। আজও RTI ব্যবহার করলে অনেককে বলা হয় “অ্যাকটিভিস্ট”—যেন শব্দটা গালাগালি। প্রশ্ন করলেই লেবেল সেঁটে দেওয়া হয়। এ এক আশ্চর্য মিল—সমাজের গোঁড়া হোক বা রাষ্ট্রের আমলা, প্রশ্ন তাদের জন্য সমান বিপজ্জনক।
এই প্রশ্নের দাম অনেক সময় প্রাণ দিয়েও চোকাতে হয়েছে। ভারতে একশোরও বেশি RTI কর্মী খুন হয়েছেন। এটাই প্রমাণ করে, প্রশ্ন এখনো ক্ষমতার কাছে আতঙ্ক। যেমন রামমোহনের কলমে অস্থির হয়েছিল সমাজ, তেমনই আজ এক কাগজের আবেদনে অস্থির হয় মন্ত্রক।
তবু আশার কথা এই যে, প্রশ্ন একবার শুরু হলে আর থামানো যায় না। রামমোহন একসময় ছিলেন একা, কিন্তু সময়ের স্রোত শেষে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল ইতিহাস। RTI-র ক্ষেত্রেও তাই। আজ দপ্তর হয়তো উত্তর দিতে চায় না, কাল হয়তো আদালত চাপ দেবে। আজ হয়তো আবেদনকারী হেনস্তা হচ্ছেন, কাল হয়তো সেই তথ্য দিয়েই বের হবে কেলেঙ্কারি। প্রশ্নের প্রভাবকে চিরকাল আটকানো যায় না।
আমরা আজ নতুন স্লোগান শুনি—ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্মার্ট গভর্নেন্স, পোর্টালের যুগ। কিন্তু যতই ওয়েবসাইট বানুক, যতই বিজ্ঞাপন ঝলমল করুক, শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ হয় না যতক্ষণ না নাগরিক সরাসরি প্রশ্ন করছে। তথ্য প্রকাশের যে প্রাকৃতিক প্রবণতা রাষ্ট্রের হওয়া উচিত, সেটি যদি না হয়, তবে নাগরিকের হাতেই ভরসা। আর এটাই আসল গণতন্ত্র।
যদি কল্পনা করি, রামমোহন আজ বেঁচে থাকতেন, তিনি হয়তো প্রথমেই RTI দিয়ে শিক্ষা বাজেটের হিসেব চাইতেন। হয়তো লিখতেন, “নারী সুরক্ষা তহবিলের খরচ কোথায় গেল?” হয়তো তিনি হাসতেন দেখলে, সেদিন যেমন পুরোহিতরা গাল দিয়েছিল, আজ তেমনি ট্রোলরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষ উগরে দিচ্ছে। তবু তিনি থামতেন না। কারণ তিনি জানতেন—ভবিষ্যৎ ইতিহাস তৈরি হয় প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে, চুপচাপ থাকার ওপর নয়।
এই জন্যই বলা দরকার, স্বাধীনতা মানে কেবল ভোট নয়। স্বাধীনতা মানে ফাইল ঘেঁটে দেখা। স্বাধীনতা মানে সেই হিসেবটা চাওয়া—আমার টাকায় কী হলো। স্বাধীনতা মানে পঞ্চায়েতের প্রকল্পের বোর্ডে লেখা নামের বাইরে গিয়ে সত্যিকারের কাজের পরিমাণ জানা। স্বাধীনতা মানে মন্ত্রীর হাসি নয়, বরং তার স্বাক্ষরিত ফাইল।
রামমোহন থেকে RTI—এটাই আসল যাত্রাপথ। সতি প্রথা প্রশ্নে ভেঙেছিল, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা একদিন প্রশ্নেই ভাঙবে। ইতিহাস বারবার শেখায়, প্রশ্ন ছাড়া আর কিছুই আলো জ্বালাতে পারে না। তাই আজকের দিনে নাগরিকের দায়িত্ব একটাই—প্রশ্ন করো। না করলে রাষ্ট্র তোমাকে প্রজা ভেবে নেবে। আর প্রজা মানে বোবা।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, প্রশ্ন করার সাহসই আমাদের নবজাগরণের আসল শিক্ষা। সেই শিক্ষা থেকেই জন্ম নেবে নতুন স্বাধীনতা—তথ্যের স্বাধীনতা। যে জাতি প্রশ্ন করতে জানে, সে জাতিকে চুপ করানো যায় না। আর যে জাতি প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, তার ভাগ্যে অপেক্ষা করে কেবল অন্ধকার।
এই রকম বিজ্ঞাপন দিতে
যোগাযোগ করতে পারেন
১ মাসের বিজ্ঞাপন খরচ
মাত্র ৩০০ টাকা
style="text-align: justify;">







মন্তব্যসমূহ