সুকান্ত ভট্টাচার্য: একবিংশ শতকের প্রেক্ষাপটে এক ‘অকালপক্ব’ কবির পুনরাবিষ্কার
সুকান্ত ভট্টাচার্য: একবিংশ
শতকের প্রেক্ষাপটে এক
‘অকালপক্ব’ কবির
পুনরাবিষ্কার
অয়ন মুখোপাধ্যায়
কোনো কোনো কবিকে আমরা তার কবিতা পড়ে নয়, তার জীবনদীপ হঠাৎ নিভে যাওয়ার মুহূর্তে আবিষ্কার করি। সুকান্ত ভট্টাচার্য তার নিখাদ উদাহরণ। মাত্র ২১ বছরে ফুসফুস যক্ষ্মায় শেষ হয়ে গেলেন, কিন্তু চলে যাওয়ার আগে বাংলা কবিতার শরীরে গেঁথে দিয়ে গেলেন এক চিরস্থায়ী কাঁটা—ক্ষুধা, অভাব, প্রতিবাদ আর বিদ্রোহের কাঁটা।
আজকের পাঠক যখন তাঁর লেখা পড়ে, তখন আশ্চর্য হয়—এই তরুণ কবি কি সত্যিই ১৯৪০-এর দশকে লিখছিলেন? নাকি আজকের গ্লোবাল অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, কৃষকের আত্মহত্যা, শহুরে বেকারত্বের জন্যই শব্দ বানাচ্ছিলেন?
ক্ষুধার ভাষা, চাঁদের উপমা
“চাঁদকে আমি দেখেছি পোড়া রুটির মতো।”
বাংলা কবিতায় এমন চিত্রকল্প খুব কমই আছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে এতটা প্রাসঙ্গিক থেকে গেছে। কবিতার ইতিহাসে চাঁদ বরাবরই ছিল রোমান্টিকতার প্রতীক। সুকান্ত সেই ঐতিহ্যকে বিদ্রোহের হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেললেন। এক মুহূর্তে রূপকথার চাঁদ নেমে এল বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত রান্নাঘরে।
এই কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচক অরুণকুমার সরকার লিখেছিলেন--
> “সুকান্তের কাব্যে ক্ষুধা কেবল সামাজিক নয়, নন্দনের অন্তর্গত সত্য।”
আজকের সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো বলবেন, তিনি আসলে food politics–এর প্রথম কবি।
বিশ্বসাহিত্যের প্রতিধ্বনি
যুবক বয়সে চলে যাওয়া কবিদের তালিকা দীর্ঘ। ইংরেজি সাহিত্যে জন কীটস বা আর্থার র্যাঁবো যেমন, বাংলায় সেই জায়গায় সুকান্ত। তবে কীটসের মতো রোমান্টিক, বা র্যাঁবোর মতো অরাজক নন তিনি। তাঁর চোখ ছিল পাড়ার মুদি দোকানের দিকে, গ্রামের ধানখেতের দিকে, শহরের ট্রামলাইনের দিকে।
তবু সমালোচকেরা তাঁকে প্রায়শই বলেছেন—“The Keats of Bengal”। আসলে এই তুলনা এসেছে অকালপক্ব প্রতিভার মৃত্যুহেতু থেকে, প্রকৃত কবিতার ভাষা থেকে নয়।
সমাজতান্ত্রিক ছাপ—আজকের পাঠে
সুকান্ত ছিলেন স্পষ্টভাবে মার্ক্সবাদী চেতনার অনুসারী। তাঁর কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের জন্য বারবার আহ্বান এসেছে। আজকের দিনে এই ভাষা অনেক পাঠকের কাছে স্লোগানধর্মী মনে হতে পারে। সমালোচক সমর সেন এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন—
> “সুকান্তের কাব্যে রাজনৈতিক শ্লোগান ও কাব্যিক রূপক প্রায়শই একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে।”
তবে প্রশ্ন হলো, ২০২৫ সালের পাঠক কি এই কবিতাকে ‘বিপ্লবের ডকুমেন্ট’ হিসাবে পড়বে, না ‘মানবিক অভিজ্ঞতার দলিল’ হিসাবে? হয়তো দুটোই।
আধুনিকতার সঙ্গে সেতুবন্ধন
আজকের পৃথিবীতে যখন জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষিজীবী ভেঙে পড়ছে, যখন মেট্রো শহরে হাজারো তরুণ Uber চালিয়ে দিন গুজরান করছে, তখন সুকান্তের “হে মহাজীবন”–এর পঙ্ক্তি নতুন করে অনুরণিত হয়।
“আমাদের দিন ফুরায় নি, আমরা আজও ক্ষুধার্ত।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই লাইন হ্যাশট্যাগে পরিণত হতে পারে, যেমনভাবে পাশ্চাত্যে পাবলো নেরুদা বা ল্যাংস্টন হিউজের কবিতা আজও আন্দোলনের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায়।
সমালোচকের চোখে পুনর্মূল্যায়ন
আজকের সাহিত্য সমালোচক দেবেশ রায় একসময় বলেছিলেন—
> “সুকান্ত আসলে কবি নন, কবি-যোদ্ধা।”
দেশ–আনন্দবাজার ধরনের পাঠক যখন সুকান্তকে পড়বেন, তাঁরা হয়তো ভাববেন—তাহলে কি কবিতার কাজ কেবল নান্দনিক রূপ নির্মাণ, না কি নৈতিক অস্ত্রও?
উপসংহার
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা তাই এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে দাঁড়ানো। একদিকে তাঁর ছন্দে অনভিজ্ঞ কিশোরের সরলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক আত্মত্যাগের পরিণত দৃঢ়তা। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়—আজকের দিনে তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো Instagram পোস্টে লিখতেন, YouTube রিডিংয়ে শোনাতেন, আবার মিছিলে হ্যান্ডমাইক হাতে শ্লোগান দিতেন।
এই দ্বৈততাই তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। সুকান্ত কেবল অতীতের কবি নন; তিনি আজও বাংলা সাহিত্যের আয়নায় ক্ষুধার ছায়া, প্রতিবাদের মশাল, আর ভবিষ্যতের অদৃশ্য প্রশ্নচিহ্ন।
এরকম বিজ্ঞাপন দিতে ইচ্ছুক হলে
আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন
খরচ মাত্র ৩০০ টাকা।


style="text-align: justify;">

.jpg)
মন্তব্যসমূহ