দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হেঁটে শতবর্ষে অধ্যাপক সমিতি

 দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হেঁটে

 শতবর্ষে অধ্যাপক সমিতি

শ্রুতিনাথ প্রহরাজ

আমাদের প্রিয় অধ্যাপক সমিতি, যার পোশাকি নাম 'পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি', তা শতবর্ষে পদার্পণ করল। সমিতির ইতিহাস যেটুকু নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে তার থেকে জানা যায়, ১৯২৬ সালে পরাধীন ভারতে এই সংগঠনের পথ চলা শুরু। তখন তার নাম ছিল নিখিল বঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংঘ। অবিভক্ত বঙ্গদেশ সহ পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই সমিতির কর্মধারা প্রসারিত ছিল। দেশভাগের যন্ত্রণা ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষের পাশাপাশি আমাদের সমিতিকেও সইতে হয়। পশ্চিম ও পূর্ব বঙ্গে অধ্যাপক সমিতি দুটি সংগঠনে ভাগ হয়ে যায়। পাশাপাশি স্বাধীন রাজ্যগুলিতেও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের স্বতন্ত্র শিক্ষক সংগঠন তৈরি হয়।

'পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি' নামে নতুন করে পথ চলা শুরু হয় এ রাজ্যে। বাংলাদেশ গড়ে ওঠার পর পদ্মা পারের শিক্ষক সমিতির নাম হয় বাংলাদেশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। আমরা যেমন ওয়েবকুটা নামে পরিচিত তাদের পরিচয় ছিল বাকবিশিস নামে। পরাধীন ভারতে সমিতির নেতৃত্ব দান করেছেন বহু মনীষী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষাদানের নির্দিষ্ট পরিসর ছাড়িয়ে তৎকালীন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনেও যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দীর্ঘদিন অধ্যাপক সমিতির নিয়ম ছিল এর সভাপতি হবেন কলেজের অধ্যক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধ্যাপক। সাধারণ সম্পাদক হবেন কলেজের কোন অধ্যাপক। ১৯২৬- ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক সমিতির সম্মেলনে যারা সভাপতিত্ব করতেন তারাই সমিতির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হতেন । সেই হিসেবে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, অধ্যাপক সি ভি রমন, অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা, অধ্যক্ষ কে সি নাগ, অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী, অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন চক্রবর্তী প্রমুখ খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সমিতির সভাপতির পদ অলংকৃত করেছেন। এঁদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে এসে বহু বিপ্লবী স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।               

দেশভাগের পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এপার বাংলা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ সাহায্য করার প্রশ্নে অধ্যাপক সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অধ্যাপক সমিতি সদস্য বন্ধুদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সাহায্য করেছে। এমনকি একবার বাংলা থেকে কয়েক হাজার টাকার বই কিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে ওপার বাংলার কলেজগুলিতে পাঠিয়েছে যাতে ছাত্রছাত্রীদের উপকার হয়।পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার অধ্যাপক সমিতির সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে স্বীকৃতি দিয়েছে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত অধ্যাপক মৃন্ময় ভট্টাচার্যকে সম্মানিত করে। দুঃখের বিষয় হল, সেই বাংলাদেশে আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সর্বাধিক আক্রান্ত। নানাবিধ সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি সেইসময় ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও অধ্যাপক সমিতি পথে নেমে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।

অধ্যাপক সমিতি শুধু শিক্ষকদের পেশাগত দাবি দেওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে বহু ঐতিহাসিক লড়াই আন্দোলনের পথ ধরে শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। স্বাধীনতা উত্তর কালে শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের যশস্বী নেতৃবৃন্দের বরিষ্ঠ নেতৃত্ব, সমিতিকে সর্বমতের শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে। আমরা যারা সমিতির কাজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তাদের সকলের কাছে এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের গোড়ায় হুগলির কামারপুকুর কলেজে একসাথে ১৪ জন অধ্যাপক ও একজন গ্রন্থাগারিককে কোন কারণ না দেখিয়ে ছাঁটাই করা হয়। তখন সমিতির সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক দিলীপ চক্রবর্তী। এই ঘটনার প্রতিবাদে সমিতির নেতৃত্বে সারা রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়। অধ্যাপক সমিতির দাবি ছিল এই সমস্ত অধ্যাপক ও গ্রন্থাগারিককে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য চাকুরীর নিরাপত্তা জনিত বিধি চালু করতে হবে। সমিতির দাবি মেনে তৎকালীন সরকার ‘সার্ভিস সিকিউরিটি এক্ট’ চালু করে। রাজ্যের বর্তমান সরকার নতুন রেগুলেশন চালু করে শিক্ষকদের মর্যাদার সঙ্গে কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বন্দোবস্ত করেছে। নানাবিধ ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। এর বিরুদ্ধে সমিতির নেতৃত্বে নতুন করে লড়াই চলছে। বর্তমানে কর্মরত অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা জানেনই না, অধ্যাপক সমিতির লড়াই না থাকলে তাঁরা চাকুরীর নিরাপত্তা পেতেন না। এমনকি সকল অধ্যাপককে ইউজিসি পে স্কেল-এর আওতায় আনার ক্ষেত্রেও সমিতি দীর্ঘ লড়াই করেছে। বর্তমান সরকার 'স্টেট এডেড কলেজ টিচার' নামে নতুন এক ধরনের কলেজ শিক্ষক (মূলতঃ চুক্তিভিত্তিক) নিয়োগের মাধ্যমে ইউজিসির আওতাভুক্ত শিক্ষক শিক্ষিকার সংখ্যা কমিয়ে সরকারি তহবিলে উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দের দায় এড়িয়ে যেতে চাইছে। এই শিক্ষকদের বেতন বা সাম্মানিক স্থায়ী পদে কর্মরত শিক্ষকদের তুলনায় অনেকটাই কম। কাজ না পাওয়া মেধাবী যুবক-যুবতীরা বাধ্য হচ্ছেন এই বঞ্চনার শিকার হতে। অথচ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এরাই এখন শিক্ষাদানের বেশিরভাগ কাজ করেন, কারণ স্থায়ী শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ প্রায় হচ্ছে না বললেই চলে। বেশ কিছু কলেজ আছে যেখানে স্থায়ী শিক্ষকদের তুলনায় এদের সংখ্যা বেশি, অথচ এঁরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। এদের নিয়েও সমিতির লড়াই চলছে। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি চালু হওয়ার পর দেশজুড়ে এবং আমাদের রাজ্যেও বিপুল সংখ্যক বেসরকারি শিক্ষার বাজার গড়ে উঠেছে, যাদের মুনাফাই প্রধান লক্ষ্য। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় ইন্টার্নশিপের নামে আউটসোর্সিং বাড়ছে। এইসব বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রে যুক্ত শিক্ষক- শিক্ষাকর্মীদের একটা বড় অংশ বেতন ও চাকুরীর নিরাপত্তার প্রশ্নে চরম বঞ্চনার শিকার। সমিতি বা ইউনিয়ন গড়ে তোলার অধিকারও এরা পাননা। আগামী দিনে এইসব বেসরকারি ক্ষেত্রে যুক্ত শিক্ষকদেরও অধ্যাপক সমিতির পতাকার নীচে সংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এঁদের বা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে কর্মরত সংখ্যাগরিষ্ঠ আংশিক, অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের সংগঠনের বাইরে রেখে অধ্যাপক সমিতির পক্ষে সার্বিক শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠা এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সারা ভারত জুড়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন সংগ্রামের ক্ষেত্রে প্রেরণা যুগিয়েছে। বস্তুতঃ এ রাজ্যের অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে গড়ে ওঠে এদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্ববৃহৎ শিক্ষক সংগঠন 'সারা ভারত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষক সংগঠন' যা এ আই ফুক্টো নামে পরিচিত। অধ্যাপক অমিয় দাশগুপ্ত, অধ্যাপক মৃন্ময় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক অনিল বসাক, অধ্যাপক সত্যসাধন চক্রবর্তী, অধ্যাপক শ্যামাপদ পাল, অধ্যাপক অজয় বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক অনিল ভট্টাচার্য প্রমুখ প্রয়াত নেতৃবৃন্দ রাজ্যের শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে সঞ্চয় করে সর্বভারতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আমার মনে পড়ে, সমিতির সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে প্রয়াত জননেতা ও এরাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসু বারবার একটা কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন, "আমি বহু জায়গায় বহু সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। কিন্তু আপনাদের মত এরকম সর্বমতের ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ আমি খুব কম দেখেছি। দেখবেন যেন আপনাদের এই সংগঠনের ঐক্য অটুট থাকে। একে ভেঙে যেতে দেবেন না।" অধ্যাপক সমিতির পরিচালন কাঠামো এমন ভাবে তৈরি যেখানে তথাকথিত বিরোধী মতের শিক্ষকদেরও মতদানের অধিকার সাংবিধানিক ভাবে সুরক্ষিত। কর্মসমিতির নির্বাচনে সরাসরি যারা জয়ী হন তাদের সাথে, হেরে যাওয়া প্যানেল থেকেও এক তৃতীয়াংশ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান। এ এক বিরল বৈশিষ্ট্য যা আমাদের সমিতির কার্যধারায় বর্তমান। এই কারণেই অধ্যাপক সমিতি হল প্রকৃত অর্থে সর্বমতের সম্মীলন মঞ্চ। জানিনা রাজ্যের অন্য কোন শিক্ষক বা কর্মচারী সংগঠনে এ ধরনের নিয়ম বা সুযোগ আছে কিনা। অধ্যাপক অমিতোষ চক্রবর্তী, অধ্যাপক কালিপদ ব্যানার্জি, অধ্যাপক মৃন্ময় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক শ্যামাপদ পাল, অধ্যাপক দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক সন্তোষ মিত্র, অধ্যাপক অব্যয় দাশগুপ্ত, অধ্যাপক আশিস রায়, অধ্যাপক জ্যোতি চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক মিহির গুহ, অধ্যাপক সৌরিন ভট্টাচার্য, অধ্যাপক রবি রায়, অধ্যাপক সুধীর ভট্টাচার্য, অধ্যাপক সুদর্শন রায়চৌধুরী, অধ্যাপক অরুণ চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক মনীন্দ্রনাথ রায় প্রমুখ ভিন্ন ভিন্ন মতের বহু দিকপাল শিক্ষক নেতৃত্বকে, একসাথে সমিতির দপ্তরে বসে শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের নানা জরুরী বিষয়ে সহমতে পৌঁছানোর অনুশীলনে মগ্ন হতে দেখেছি আমরা। এঁদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। তবে সমিতির দৈনন্দিন কার্যধারায় সেই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলেছে...তবে সর্বমতের মিলিত মঞ্চ কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

দুঃখের হলেও একথা সত্যি, জ্যোতিবাবুর সেই মূল্যবান পরামর্শ আমরা রক্ষা করতে পারিনি। গত দেড় দশকে সমিতির কিছুটা অঙ্গহানি ঘটেছে যা এরাজ্যের ঐক্যবদ্ধ শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের উর্বর জমিকে দুর্বল করেছে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান শাসক দল কতৃক ' শিক্ষকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে শিক্ষা আন্দোলনকে দুর্বল করা'-র নীতি এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এ কথা ঠিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ এখনো অধ্যাপক সমিতির পতাকার নীচে সঙ্ঘবদ্ধ থেকে প্রতিদিনের আন্দোলনে সামিল হচ্ছেন। অল্প কিছু বন্ধু, শাসক দলের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নানান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার নেশায় মেতে, স্বতন্ত্র সংগঠন তৈরি করেছেন। রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বর্তমানে কর্মরত একটা বড় অংশের অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করে এই নতুন সংগঠনের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেখানো হচ্ছে। এমনকি শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা (এদের একজন প্রাক্তন, শিক্ষামন্ত্রী যিনি বর্তমানে জেলে আছেন) এই সংগঠনের সভাপতির আসন অলংকৃত করেছেন বা করছেনও।

বর্তমান সরকার ও শাসক দল যেভাবে তাদের তৈরি করা নতুন সংগঠনকে সামনে রেখে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপর ভয়ংকর মানসিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে তা সামগ্রিক শিক্ষা জগতের মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক অনুশাসন বজায় রাখার ক্ষেত্রে খুবই উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই গর্বের সংগঠন এক স্বতন্ত্র মর্যাদার জায়গায় থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রকে কলুষমুক্ত রাখার চেষ্টা করতো, যা এখন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। গত শতাব্দীর সত্তরেরর দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে যখন চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়, অধ্যাপক সমিতির নেতৃত্বে রাজ্যের শিক্ষক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে সেই নৈরাজ্যের মোকাবিলা করেছিল। রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐক্যবদ্ধ সংগঠনের এই বিভাজন, শিক্ষাক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকা শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও উপাচার্যদের সংগঠন প্রত্যক্ষভাবে এই নৈরাজ্যকে মদত জুগিয়ে চলেছে। শিক্ষকদের একটা বড় অংশ অন্তর থেকে চাইলেও ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এই নৈরাজ্যকে রুখে দেওয়ার চেষ্টায় শামিল হতে পারছেন না। উল্টে এই অনাচারের প্রতিবাদ করায় বহু ক্যাম্পাসে গত দেড় দশকে উপাচার্য- অধ্যক্ষ- অধ্যাপক- অধ্যাপিকা সহ শিক্ষাকর্মী ও ছাত্র-ছাত্রীদের চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে দলীয় দখলদারী সুনিশ্চিত করতে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা না রাখার কারণে এই ঘটনাগুলির কোন বিচার হয়নি। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও একইভাবে নির্বিকার বা কিছু ক্ষেত্রে দুষ্কৃতিদের মদতদাতার ভূমিকায় থাকায় ক্যাম্পাসগুলি এখন কার্যত আতঙ্কের আঁতুড়ঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের চরম-নিগ্রহের ঘটনা এসবেরই অংশমাত্র। মাতৃসমা শিক্ষিকাও এই আক্রমণের বাইরের নন।

একটা কথা এই প্রসঙ্গে বলা দরকার। শাসকদলের মদতপুষ্ট বিকল্প শিক্ষক সংগঠনে নাম লেখানো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সবাই যে ক্যাম্পাসে বেড়ে চলা এই অস্থিরতা কে সমর্থন করেন, তা নয়। এমনকি শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সরকারি সিদ্ধান্তকেও তারা বহু ক্ষেত্রে মেনে নিতে পারেন না। এ নিয়ে সমিতির বহু আন্দোলনকে এরা আড়াল থেকে সমর্থন করেন, এমনকি আদালতে লড়াই করবার জন্য গোপনে অর্থও দেন। তবু মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী মানসিকতার কোপে পড়ে ফিক্সেশন, প্রমোশন, পেনশন সহ অন্যান্য পেশাগত অধিকার হারানো বা বিলম্বিত হওয়া এবং শাসকদলের আশ্রিত দুষ্কৃতিদের হাতে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে, বাধ্য হচ্ছেন শাসক দলের আশীর্বাদধন্য এই শিক্ষক সংগঠনের খাতায় নাম লেখাতে। আর অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের তো প্রকাশ্যেই ধমক খেতে হচ্ছে-- হয় এই সংগঠনে থাকতে হবে নতুবা ক্যাম্পাস ছাড়তে হবে। ওরা একান্তই নিরুপায়। অধ্যাপক সমিতি সবটাই নজরে রেখেছে। আর তাই ঐক্যবদ্ধ বৃহত্তর শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের স্বার্থে সমিতি থেকে সরে যাওয়া এইসব শিক্ষক-শিক্ষিকা বন্ধুদের জন্য সমিতির দরজা সব সময় খোলা রয়েছে, সময়ের দাবি মেনে খোলা রাখতেও হবে আগামী দিনে। অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের মর্যাদার সঙ্গে সম কাজে সম বেতনের অধিকার সুনিশ্চিত করতে একমাত্র অধ্যাপক সমিতিই পথে নেমে আন্দোলন করবার পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালতেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ওরা তা জানেন, তবু অসহায় ভাবে শাসকদলের মিছিলে পা মেলাতে বাধ্য হচ্ছেন। ওদের এই ভয় কাটাতে পারলে অধ্যাপক সমিতির জয় সুনিশ্চিত। 

আরো একটি বিষয় প্রসঙ্গত উল্লেখ করা জরুরী। কলেজের অধ্যক্ষ-অধ্যক্ষাগণ বরাবরই অধ্যাপক সমিতির সদস্য হিসেবে কাজ করে এসেছেন। যেহেতু অধ্যক্ষ এবং শিক্ষক -শিক্ষাকর্মীদের সম্পর্ক মালিক শ্রমিকের নয়, তাই এ নিয়ে অতীতে কখনো কোন সমস্যা হয়নি। বোঝাপড়ার কোথাও ঘাটতি হলে সমিতির হস্তক্ষেপে দ্রুত তা মীমাংসা করার চেষ্টা হতো। গত শতাব্দীর নব্বই এর দশকে অধ্যক্ষরা নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন যার নাম-- নিখিল বঙ্গ অধ্যক্ষ পরিষদ বা অল বেঙ্গল প্রিন্সিপালস কাউন্সিল। সেই সময় এই স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে উঠলেও কলেজগুলিতে এ নিয়ে কোন বাড়তি সমস্যা ছিল না, কারণ তারা একই সাথে অধ্যাপক সমিতিরও সদস্য হতেন। ঠিক যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষক বন্ধুরা তাদের নিজস্ব সংগঠনের পাশাপাশি অধ্যাপক সমিতির সদস্যপদ রক্ষা করেন। ২০১১ সালে নতুন সরকার আসার পর অধ্যক্ষদের এই সংগঠনটি কার্যত শাসকদলের ক্যাম্পাস দখলদারির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। অধ্যক্ষ-অধ্যক্ষাদের একটা অংশ, ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ও উচ্চপদ (অধ্যক্ষ বা উপাচার্য পদ, বোর্ড বা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, সরকারের বিভিন্ন কমিটির সদস্য পদ, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতিতে সরকার মনোনীত সদস্য হওয়া ইত্যাদি) পাওয়ার নেশায় শাসকদলের প্রত্যক্ষ এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। কে কত বেশি শাসকদলের সেবা করতে পারে তা নিয়ে পুরোদস্তুর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে এদের মধ্যে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সামগ্রিক গুণমান বৃদ্ধি, শিক্ষার পরিমণ্ডল রক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলি সঙ্গত কারণে গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য বেড়ে চলার এটাও অন্যতম কারণ। ইদানিং এই অধ্যক্ষ পরিষদের রাজ্য দপ্তর দক্ষিণ কলকাতার একটি কলেজ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ভবানীপুরে অবস্থিতঠ শাসকদলের অত্যন্ত প্রভাবশালী সংসদের দলীয় দপ্তরের ঠিকানা নিয়েছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক অধ্যক্ষ বা উপাচার্যদের সংগঠনের দপ্তর শাসক দলের দপ্তরে স্থানান্তরিত হবে-- আমাদের রাজ্যে এই জিনিস ভাবারও অতীত ছিল। এখন এর সবটাই হচ্ছে। আর সেই কারণে, রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বেশ কিছু ক্যাম্পাস এখন কার্যত শাসকদলের শাখা অফিসের কাজ করছে। অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি দলীয় দখলদারি সুনিশ্চিত করতে ভয় দেখানোর সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে এই পথ ধরে। অবশ্য এখানেও একথা স্বীকার করা দরকার, অধ্যক্ষ-অধ্যক্ষাদের একটা বড় অংশ ক্যাম্পাসের এই অনাচারকে মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। তারা এই অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের ভাগীদার নন। বরং নিয়ম মেনে কলেজ পরিচালনা করতে চান। কিন্তু সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারছেন না চরম নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে। সবাই বিক্রি হয়ে গেছেন ভাবার কোন কারণ নেই। ক্যাম্পাসে সুস্থ শিক্ষার পরিমণ্ডল গড়ে তোলার স্বার্থে, অধ্যক্ষদের এই অংশের সাথেও অধ্যাপক সমিতির যোগাযোগ বৃদ্ধি করা জরুরী।

 শিক্ষার সামগ্রিক পরিমন্ডল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সবচাইতে বেশি দুর্ভোগের স্বীকার বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা। সুযোগ পেলেই তারা এইসব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এড়িয়ে যেতে চাইছে। বর্তমান বছর সহ গত কয়েক বছর ধরে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ধারাবাহিকভাবে ছাত্র ভর্তির সংখ্যা কমছে। এমনকি যাদবপুর-কলকাতা-প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় গুলির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থায় পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি পরিকল্পনামাফিক এই অনাস্থা সৃষ্টির কারণে রাজ্যজুড়ে কর্পোরেট পরিচালনাধীন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাঙের ছাতার মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এইসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা পরিচালনার ব্যয় অনেকটাই বেশি হওয়ার কারণে একটা বড় অংশের ছাত্র-ছাত্রী কার্যত উচ্চশিক্ষার অঙ্গন থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়াও স্কুল কলেজ সর্বত্র শিক্ষক নিয়োগে চরম দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়তো আছেই। সব মিলিয়ে ধ্বংসের মুখে রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষার পরিমণ্ডল। শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী ও ছাত্র-ছাত্রীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলনই শিক্ষাক্ষেত্রকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় সমিতির শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরী কাজ। সমিতির শতবর্ষে এটাই হোক আমাদের শপথ।

class="separator" style="clear: both; text-align: center;">style="text-align: justify;">
style="text-align: justify;">
 
bannerbanner




style="text-align: justify;">


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার