নিঃসঙ্গতার কালো চশমা, চির প্রশান্ত বাগচীর কবিতা
নিঃসঙ্গতার কালো চশমা,
চির প্রশান্ত বাগচীর কবিতা
অয়ন মুখোপাধ্যায়
১
বাংলা কবিতার মানচিত্রে চিরপ্রশান্ত বাগচীর নাম উচ্চারণ করলেই এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে আসে। তিনি যে ক’টি কবিতা লিখেছেন, সেখানে নেই কোনও সান্ত্বনা, নেই কোনও ভরসার আলো। আছে শুধু মৃত্যুর ঘন ছায়া, শোকের রক্তমাখা চিহ্ন, আর অবসানের অন্তহীন প্রতিধ্বনি। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, এই মৃত্যুমুখী কবিতাগুলো পড়তে পড়তে পাঠক বিচলিত হলেও ছুঁড়ে ফেলতে পারেন না। কারণ কবিতা কেবল জীবনকে নয়, মৃত্যুকেও সত্য করে তোলে।
জীবনানন্দ দাশ একদিন লিখেছিলেন—
“প্রত্যেক দিনই মৃত্যুদিন।”
এই উচ্চারণের উত্তর-স্বর যেন শোনা যায় চিরপ্রশান্তর কবিতায়
২
“পুনশ্চ মৃত্যু”-তে তিনি বলেন—
“মরণমধ্যেই মৃত্যু খুব কাছে এসে যায়—
সেদিন আমার অন্ধকার থেকে অনিবার্য নিস্ফলতার কথা মনে পড়ে।”
এখানে মৃত্যু আসছে দূর থেকে নয়, বরং জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই দেহে-দেহে ঘাপটি মেরে বসে আছে। আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসেই তার ছায়া। চিরপ্রশান্তর কবিতা এই ভয়কে ঘৃণা করে না, আড়ালও করে না—বরং প্রকাশ্যে টেনে আনে। পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় মৃত্যুর আয়নার সামনে।
এই দৃষ্টিকোণেই তাঁর কবিতা ভিন্ন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুকে কখনও রোমান্টিক করে ফেলতেন, জীবনানন্দ তাকে প্রকৃতির স্নিগ্ধতাতে মিশিয়ে দিতেন, কিন্তু চিরপ্রশান্ত ঠান্ডা মাথায় মৃত্যুকে দেখান “শিকারি ও শিকারের” সম্পর্কের মতো। অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য, নিষ্ঠুর।
৩
“অশ্রু প্রসঙ্গে” কবিতায় তিনি লেখেন—
“গেল রাত্তিরে অশ্রু কাটাকুটি’র পর মনে হল, আর নয়।”
কান্নারও তো একটা সীমা আছে। কান্নারও ক্লান্তি আছে। অশ্রু শুকিয়ে গেলে থাকে কেবল অসাড়তা। এই অসাড়তাই বাগচীর কবিতার সুর। তাঁর কাছে শোক মানে আর্তনাদ নয়, বরং শোকের অচলাবস্থা। যে অবস্থায় শব্দও ফুরিয়ে যায়।
শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন—
“যে-কবিতা কেবল শব্দ নয়, যে-কবিতা জীবনকে কেটে নিয়ে যায়, তার শরীর থেকে রক্ত পড়ে।”
চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতার শরীরও সেই রক্তক্ষরণে ভরা, তবে সেটা নিঃশব্দ রক্তপাত। কোনও চিৎকার নেই, কেবল সাদা কাগজে জমাট অন্ধকার।
৪
কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে—পাঠক কেন এমন কবিতা পড়বেন, যেখানে নেই কোনও আশার আলো? কেন তিনি বারবার ফিরে আসবেন এই মৃত্যুর গহ্বরের কাছে?
সমালোচক অশোক মিত্র লিখেছিলেন—
“কবিতা মানেই প্রতিদিনের বিপর্যয়ের ভিতর থেকে আত্মার উত্তরণ।”
কিন্তু বাগচীর কবিতায় উত্তরণ নেই। আছে কেবল নামতে থাকা—সিঁড়ি বেয়ে নীচে, অন্ধকারের আরও গভীরে। পাঠক এই নামার পথেই আটকে যান, কারণ এই অন্ধকার আসলে তাঁর নিজেরই অন্ধকার। দিনের বেলায় যেটা আমরা চেপে রাখি, সমাজের আড়ালে ঢেকে রাখি, সেই গোপন ভয়কেই বাগচী শব্দে প্রকাশ করেন।
৫
“ঘ্রাণ বিষয়ক” কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“প্রতিদিনই আমাদের মৃত্যুর রং পরিবর্তনশীল।”
মৃত্যু একদিনের ঘটনা নয়, প্রতিদিনের সঙ্গী। কখনও কালো, কখনও ধূসর, কখনও লতাপাতার মতো ছিঁড়ে পড়া। প্রতিদিনের অভ্যাসের মতো সে আমাদের ঘিরে রাখে।
এই নির্মম স্বীকারোক্তি আমাদের চমকে দেয়। কবিতা তখন কেবল সৌন্দর্যের খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে সত্যের আয়না।
৬
এখানেই জয় গোস্বামীর মুক্ত গদ্যের ছায়া পড়তে দেখি। জয় যেমন লিখেছিলেন—
“সব কবিতা মানেই বেঁচে থাকার কবিতা নয়, কখনও কবিতা মানে না-বেঁচে থাকার সাহস।”
চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতা সেই “না-বেঁচে থাকার সাহস”-এর দলিল। তাঁর শব্দে নেই উদ্দীপনা, নেই উল্লাস, বরং আছে এক নীরব মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার শিক্ষা।
এ যেন মৃত্যু নয়, মৃত্যুকে দেখার শক্তি।
৭
চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতার ভাষা লক্ষ করলে দেখা যায়—তিনি অলঙ্কারের ব্যবহার করেন না, জটিল প্রতীকের আড়ালে যান না। তাঁর শব্দগুলো ধারালো, প্রায় শুষ্ক, সরাসরি।
এখানেই তাঁর কবিতা আধুনিক হয়ে ওঠে। কারণ আধুনিকতার মূলে আছে সরলতায় লুকোনো জটিলতা।
কবিতায় তিনি বলেন—
“মৃত্যুরও তো ঘ্রাণ আছে—কখনও পচা মাংসের মতো, কখনও দগ্ধ অস্থির ধোঁয়ার মতো।”
এখানে প্রতীক নয়, বাস্তব ঘ্রাণ। পাঠক শব্দ পড়তে পড়তেই যেন নাকে অনুভব করেন মৃত্যুর গন্ধ।
৮
কিন্তু এই সব মৃত্যুচেতনা সত্ত্বেও তাঁর কবিতায় এক অদ্ভুত নীরব দীপ্তি আছে। পড়তে পড়তে পাঠক আতঙ্কিত হলেও এক ধরণের শান্তিও অনুভব করেন। কারণ মৃত্যু যখন প্রতিদিনের সত্য, তখন তার সঙ্গে লড়াই না করে তাকে গ্রহণ করার মধ্যেই শান্তি।
আমি একে বলব—“আতঙ্কের মধ্য দিয়ে শান্তি।”
৯
এখানে আরেকটা কথা বলা দরকার। বাংলা কবিতায় মৃত্যু কোনও নতুন বিষয় নয়। জীবনানন্দ থেকে শক্তি, বিনয় মজুমদার থেকে জয় গোস্বামী—সবাই মৃত্যুকে লিখেছেন। কিন্তু বাগচীর বিশেষত্ব হলো—তিনি মৃত্যুকে চূড়ান্ত রোমান্টিকতা থেকে মুক্ত করেছেন। তিনি মৃত্যুকে নৈঃশব্দ্যের মতো সাধারণ করে তুলেছেন। যেন মৃত্যু মানেই প্রতিদিনের ঘুমের মতো অভ্যাস।
এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর কবিতাকে আলাদা করে।
১০
কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমি বারবার ভাবি—চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতা আসলে পাঠকের জন্য আয়না।
আপনি যদি এই কবিতা পড়েন, হয়তো বিরক্ত হবেন, ভয় পাবেন, ক্লান্ত হবেন। কিন্তু সেই ক্লান্তিই আপনাকে মনে করিয়ে দেবে—আপনার ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক অনিবার্য অন্ধকার।
কবিতা তখন কেবল পাঠ নয়, আত্ম-স্বীকারোক্তি হয়ে ওঠে।
১১
শঙ্খ ঘোষের এক উক্তি মনে পড়ে—
“কবিতা মানে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। কখনও আনন্দে, কখনও দুঃখে, কখনও কেবলই শূন্যতায়।”
চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতা সেই শূন্যতার ভিতর আমাদের টেনে আনে। পাঠকের জন্য এই যাত্রা সহজ নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ মৃত্যুকে না মেনে কোনও জীবনকেই তো পুরোপুরি ধরা যায় না।
১২ : উপসংহার
চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতা আমাদের শেখায়—কবিতা শুধু ফুলপাতার রোমান্টিকতা নয়, কবিতা জীবনের নিষ্ঠুর সংবাদও হতে পারে। জয় গোস্বামীর মতো বলতে পারি—
“শুধু শব্দে নয়, মৃত্যুর কালো চশমার ভেতর দিয়েও কবিতাকে দেখতে হয়।”চিরপ্রশান্ত বাগচীর কবিতা সেই কালো চশমাই।
যেখানে আলো নেই, কিন্তু আছে আলোর অনিবার্য অভাবের সত্য।
যেখানে কান্না নেই, কিন্তু আছে কান্নার ক্লান্তি।
যেখানে জীবন নেই, কিন্তু আছে মৃত্যুর ঘ্রাণ।
আর পাঠক, শেষ পর্যন্ত, এই কবিতার ভেতর দিয়েই মৃত্যুর দিকে তাকাতে শেখেন—স্থির, নিরুপায়, অথচ অদ্ভুত শান্ত এক চোখ।
এরকম বিজ্ঞাপন দিতে ইচ্ছুক হলে
আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন
খরচ মাত্র ৩০০ টাকা।


style="text-align: justify;">

.jpg)
মন্তব্যসমূহ