ভারতের বুকে পরিবেশ আইনের গতিপ্রকৃতি

 ভারতের বুকে পরিবেশ আইনের গতিপ্রকৃতি



বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়, 

সমাজ ও পরিবেশকর্মী

মানুষ যেদিন তার দু'হাতকে ভূমি থেকে মুক্ত করে নিতে পেরেছিল, সেদিন থেকেই মানব সভ্যতার জন্ম। সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ প্রকৃতিকে ভয় পেয়েছে, ভক্তি করেছে আবার ভালবেসেছে। সভ্যতার যত অগ্রগতি ঘটেছে, প্রকৃতি ততই নিষ্ঠুরভাবে দলিত হয়েছে তারই সন্তান মানুষের হাতে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা যে অত্যন্ত জরুরি -- এই চিন্তাভাবনা মানুষের মনে উদয় হলেও, সেই চিন্তার সুষ্ঠু প্রযুক্তি আজও ঘটেনি। সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণেই আইনের জন্ম হয়। আমাদের দেশে অর্থাৎ ভারতবর্ষে প্রথম পরিবেশ রক্ষার্থে আইন সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের সময়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের জোয়ার তখন সমস্ত বঙ্গদেশ জুড়ে। তারই অলক্ষ্যে 'বেঙ্গল স্মোক্ অ্যাক্ট'-এর জন্ম নিয়েছিল কলকাতা শহরতলিতে মূলত অধুনা ভিকেটারিয়া মেমোরিয়ালের শুভ্রতাকে রক্ষা করতে। ইংরেজরা আমাদের দেশে এসেছিল রাজত্ব করতে, সেবা করতে নয়। সুতরাং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে তাদের বিশেষ কোন দায় বা দায়িত্ব ছিল না। 

ইংরাজ শাসনের অবসানের পর পরিবেশ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার আগেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ ভাগ, বৈদেশিক আক্রমণ, জাতপাতের লড়াই ও বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যা নিয়ে আমাদের জর্জরিত থাকতে হয়েছে যা আজও প্রকটভাবে জীবন্ত। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা হয়েছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে শিল্পায়নের দিকে নজর দিলেও শিল্পায়নজনিত প্রকৃতির যে ক্ষয়ক্ষতি হবে সে ব্যাপারে কোন চিন্তাভাবনা পরিকল্পনাতে স্থান পায়নি। অর্থাৎ সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়নি। ফলে সত্তর দশকের পূর্বে সুনির্দিষ্ট পরিবেশ রক্ষার্থে কোন আইন জন্ম নেয়নি। 'সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ'র ১৯৭২ সালে স্টকহলম্ সিদ্ধান্ত তথা ভারতের সামাজিক চেতনার মিলিত প্রয়াসে ১৯৭৪ সালে পরিবেশ রক্ষার্থে সুনির্দিষ্ট আইন সৃষ্টি হয়। বর্তমানে নিম্নলিখিত আইন সমূহ পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সৃষ্টি হয়েছে।

১. জল (দূষণ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৭৪: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য নদী, কুয়ো এবং যে কোনও জলাশয় ও মৃত্তিকার উপরিভাগে ও নিম্নে জল দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং শুদ্ধতা রক্ষা করা।

আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

ধারা নং ৪: দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের গঠন পদ্ধতি; ধারা নং ২৫: কোন শিল্প সংস্থা অথবা পৌর সংস্থা যার তরল বর্জ্য নিষ্কাশিত হয় তাকে স্থাপন এবং পরিচালনা করার জন্য পর্ষদের অনুমতি নিতে হবে; 

ধারা নং ২৭: এই ধারায় পর্ষদের অনুমতি নাকচ করা এবং দেওয়া অনুমতি ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে; 

ধারা নং ৩৩এ এই ধারায় শর্তগুলি না পূরণ করার জন্য শিল্প সংস্থার শাস্তির পরিমাপ ঘোষণা করা আছে যার জেলের শাস্তির মেয়াদ ছয় মাসের কম হবে না এবং জরিমানা সহ ছয় বছর শাস্তি হতে পারে; 

ধারা নং ৪৪: এই ধারায় বিনা অনুমতিতে তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শাস্তিবিধানের জন্য আদালতে মামলা করার ক্ষমতা পর্ষদকে দেওয়া আছে।

২. জল (দূষণ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ) উপকরণ আইন, ১৯৭৭: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য: দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কাজকর্ম চালানোর জন্য আর্থিক সংস্থানের ব্যবস্থা করা। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

ধারা নং ৩: স্বায়ত্তশাসিত ও তালিকাভুক্ত শিল্প সংস্থাগুলির এই আইনের বলে পরিমাপিত উপকর দেওয়া বাধ্যতামূলক; 

ধারা নং ৫: এই ধারায় তালিকাভুক্ত শিল্প সংস্থার এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলির নির্দিষ্ট ফর্মে জল ব্যবহারের পরিমাপ অনুযায়ী অর্থ প্রদান এবং হিসাব দাখিল করা বাধ্যতামূলক, 

ধারা নং ১০: এই ধারা অনুযায়ী প্রদেয় উপকর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না দিলে, নির্দিষ্ট অংক অনুযায়ী শিল্প সংস্থাগুলির সুদ দেওয়া বাধ্যতামূলক; 

ধারা নং ১১: এই ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা পর্ষদের আছে; 

ধারা নং ১৪: এই ধারা অনুযায়ী জল ব্যবহারের সঠিক হিসেব দাখিল না করলে এবং উপায় প্রদান না করলে শাস্তি বিচারের কথা বলা আছে যার জেলের মেয়াদ ছয় মাস পর্যন্ত হতে পারে এবং এক হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

৩. বায়ু (দূষণ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৮১: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য শিল্প সংস্থা থেকে নির্গত দূষিত বায়ু, ধোঁয়া, গ্যাস প্রভৃতি থেকে বাতাসের দূষণ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

ধারা নং ২১: এই ধারায় কোন শিল্প সংস্থা স্থাপন এবং পরিচালনা করার জন্য পর্ষদের অনুমতি অবশ্যই গ্রহণীয়; 

ধারা নং ৩১এ এই ধারায় অনুযায়ী পর্ষদকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শিল্প সংস্থাকে বন্ধ করার এবং সংস্থার জল ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য আদেশ দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে; 

ধারা নং ৩৭ এবং ৩৯: এই ধারায়, ধারা ২১ এবং ২২ নম্বরের শর্তগুলি পূরণ না করার জন্য আইন মোতাবেক শাস্তির পরিমাপ ঘোষণা করা আছে।

৪. পরিবেশ (সুরক্ষা) আইন, ১৯৮৬: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য পরিবেশকে সর্বরকম দূষণের হাত থেকে রক্ষণ ও উন্নয়ন করা এবং তার জন্য বিভিন্ন বিধি প্রণয়ন করা। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

ধারা নং ৫: এই ধারায় কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত ক্ষমতানুযায়ী রাজ্য সরকারের এবং পর্ষদের শিল্প সংস্থাগুলিকে বন্ধের আদেশ দেওয়া এবং তার জল ও বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া আছে; ধারা নং ২৫: এই ধারায় পরিবেশ (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৮৬ আইনের ধারাগুলিকে বলবৎ করার নিমিত্ত বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া আছে।

৫. ক্ষতিকর বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার) বিধি, ১৯৮৯: পরিবেশ (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৮৬-এর ভিত্তিতে প্রবর্তিত এই বিধির প্রধান উদ্দেশ্য হল, বিভিন্ন শিল্প সংস্থা থেকে উদ্ভূত ক্ষতিকারক বর্জ্যের মজুতি, ব্যবস্থা এবং নিষ্পত্তিকরণ এবং দেখা যাতে বর্জ্য পদার্থ যত্রতত্র বর্জিত বা রক্ষিত না হয়। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল:

বিধি নং ৫: ক্ষতিকর বর্জ্য নিষ্কাশনকারী সংস্থা সমূহকে অবশ্যই পর্ষদের অধিকার প্রদানপত্র নিতে হবে; 

বিধি নং ১১: বিদেশ থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য আমদানি করতে হলে পর্ষদের অনুমোদন মোতাবেক কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতিপত্র নিতে হবে।

৬. ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের উৎপাদন, মজুতিকরণ এবং আমদানিকরণ বিধি, ১৯৮৯: পরিবেশ (সুরক্ষা) আইন, ১৯৮৬-এর ভিত্তিতে প্রবর্তিত এই বিধির প্রধান উদ্দেশ্য হল সুষ্ঠুভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের উৎপাদন মুতীকরণ ও আমদানি। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

বিধি নং ৫: দুর্ঘটনাকালে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের উৎপাদন, মজুতি এবং আমদানিকারী শিল্প সংস্থাকে যথাযথ বিভাগীয় আধিকারিককে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে; 

বিধি নং ৭: এই ধরনের শিল্পসংস্থা যদি প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী তার অধিষ্ঠানগত প্রতিবেদন যথাযোগ্য অধিকার ও আধিকারিককে উৎপাদন শুরু করার তিন মাস আগে না জানায় তবে সেই সংস্থা এই সকল রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ে কাজ করতে পারবে না।

৭. গণ দায়বদ্ধতামূলক বিমা আইন, ১৯৯১: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য কারখানার বাইরে কারখানার জন্য পরিবেশ সংক্রান্ত দুর্ঘটনাকালীন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে ক্ষতিপূরণ দান। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

ধারা নং ৪: এই ধারায় দুর্ঘটনায় শিল্পসংস্থার দায়বদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।

৮. জীব আরোগ্য বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার) বিধি, ১৯৮৯: এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রের বর্জ্য পদার্থের সুষ্ঠু নিষ্পত্তিকরণ। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

বিধি নং ৪: এই সমস্ত বর্জ্য ব্যবহার এবং নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় সমস্ত প্রকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির কর্তব্যের কথা উল্লেখ আছে; 

বিধি নং ৮: এই বিধি অনুযায়ী এই প্রকার বর্জ্য উৎপাদনকারী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলির পর্ষদের কাছ থেকে যথাযথ অনুমোদন এবং ভুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক।

৯. নবীকৃত প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার বিধি, ১৯৯৯: ১৯৮৬ সালের পরিবেশ (সুরক্ষা) আইন মোতাবেক গঠিত এই বিধির প্রধান উদ্দেশ্য প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহারের বিধি নিষেধ। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

বিধি নং ৪: এই বিধিবলে নবীকৃত প্লাস্টিক দ্বারা উৎপাদিত ক্যারিব্যাগে কোনও খাদ্যদ্রব্য বহন করা নিষিদ্ধ; 

বিধি নং ৮: এই বিধিতে নতুন এবং নবীকৃত প্লাস্টিক দ্বারা নির্মিত যে কোন ক্যারিব্যাগ ২০ মাইক্রনের কম ঘনত্বের হতে পারবে না।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশোধন আইন, ২০২১ অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর, ২০২২ থেকে ১২০ মাইক্রনের কম ঘনত্বের প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ-এর উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিলি, বিক্রি ও ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয়।

১০. পরিবেশ (সুরক্ষা) (দ্বিতীয় সংশোধিত) বিধি, ১৯৯৯-- আতসবাজির শব্দ পরিমাপ বিধি সংক্রান্ত এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য আতসবাজির শব্দের পরিমাপ নিয়ন্ত্রণ করা।

১১. শব্দদূষণ (প্রনিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ) বিধি, ২০০০: ১৯৮৬ সালের পরিবেশ (সুরক্ষা) আইনের ভিত্তিতে প্রবর্তিত এই বিধির প্রধান উদ্দেশ্য লাউডস্পিকার থেকে উদ্ভূত শব্দদূষণের নিয়ন্ত্রণ। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

ধারা নং ৪: এই বিধি অনুযায়ী জেলাশাসক এবং পুলিশ আধিকারিকদের লাউডস্পিকারে শব্দদূষণ এবং তার নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্বের কথা বলা আছে।

১২. পৌরবিষয়ক কঠিন বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার) বিধি, ২০০০: পরিবেশ (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৮৬-এর ভিত্তিতে প্রবর্তিত এই বিধির প্রধান উদ্দেশ্য বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পৌরবিধি অনুযায়ী বর্জ্যের নিষ্পত্তিকরণ। আইন বলবৎকারী প্রধান বিধিগুলি হল: 

বিধি নং ৪: এই বিধিতে পৌর সংস্থাগুলির করণীয় দায়িত্বের উল্লেখ আছে; 

বিধি নং ৬: এই বিধিতে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এবং রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের করণীয় দায়িত্বের উল্লেখ আছে।

উপরিউক্ত আইনগুলি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ কার্যকর করে থাকেন। ভারবর্ষের বুকে অন্যান্য সংস্থা যথাক্রমে জেলাশাসক, পুলিস দপ্তর, পৌর বিষয়ক দপ্তর, মৎস্য দপ্তর, শ্রম দপ্তর, বন দপ্তর ও পরিবহণ দপ্তর বিভিন্ন আইন কার্যকর করে থাকেন। এই সমস্ত আইনের মধ্যে পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন নিয়মনীতির কথা ঘোষিত হয়েছে।

আইনের সঠিক প্রয়োগ নির্ভর করে সুষ্ঠু প্রশাসন, সক্রিয় বিচার ব্যবস্থা ও সামাজিক চেতনার ওপর। পরিবেশ রক্ষার্থে আইন সৃষ্টি হলেও তার প্রয়োগ সঠিকভাবে সম্ভব নয় যদি না সাধারণ মানুষ পরিবেশ রক্ষার্থে সচেতন হয়। এ ব্যাপারে গণচেতনা অত্যন্ত প্রয়োজন। অবশ্য সুষ্ঠু চেতনা সৃষ্টি করার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও আইনের বাধ্যবাধকতা একান্ত প্রয়োজন। ইদানীংকালে ভারতের বিচার ব্যবস্থা থেকে কয়েকটি অত্যন্ত মূল্যবান সিদ্ধান্ত উচ্চারিত হয়েছে। ভারতের বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্থান সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বলেছেন, মানুষের মৌলিক অধিকার দূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করা। সামাজিক চেতনার ফলশ্রুতি অনুযায়ী সাধারণ মানুষ সুস্থ দূষণমুক্ত পরিবেশ পাওয়ার জন্য মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে বিচার ব্যবস্থার কাছে আবেদন করছেন। 

প্রাসঙ্গিকভাবে বলা প্রয়োজন, ভারতের বুকে ১৯৭৪ সাল থেকে ক্রমাগত আইন তৈরি হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৪ সালের জল দূষণ নিবারণ আইনই হচ্ছে ভারতের বুকে প্রথম পরিবেশ বিষয়ক আইন। ১৯৭৪ সালের পর পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আইনগুলির কার্যকারিতা সেরকম ভাবে দেখা যাচ্ছে না। আর যেটুকু কার্যকারিতা চোখে পড়ছে, তা বিচার ব্যবস্থার জন্য। আইনের এই কার্যকারিতার জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কুলদীপ সিং এবং পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্ট এর বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দুজন বিচারপতি তাঁদের বিচারের বাণীর মধ্য দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, দূষণমুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকা মানুষের নাগরিক অধিকার। একই সঙ্গে তাঁরা বলেছেন, যে কোনও উন্নয়নের কাজ সব সময় পরিবেশ-বান্ধব হতে হবে। আরও বলেছেন, সমাজে যারা দূষণ সৃষ্টি করবে, তাদেরই দূষণ-মূল্য চোকাতে হবে। 

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একুশ শতকে যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসছে, তারা এই আইনগুলিকে সরলীকরণ করে দিয়ে এর কার্যকারিতাকে হ্রাস করে দিচ্ছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট-এর নানান নির্দেশনামাকেও মান্যতা দিচ্ছে না। এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা বন সংরক্ষণ বিষয়ক আইনগুলোকে তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে এমনভাবে সংশোধন করছে যাতে আগামী দিনে পরিবেশ সংরক্ষণকারী আইনের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে। এটা ঠিকই যে বিগত ৫০ বছরে ভারতে যত আইন তৈরি হয়েছে, তার বেশিরভাগটাই পরিবেশ বিষয়ক আইন। ভালো করে চারিপাশে একটু নজর করলেই দেখা যায় কারখানাগুলো থেকে কীভাবে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আকাশকে ঢেকে ফেলছে, গঙ্গা কীভাবে প্রতিনিয়ত দূষিত হয়ে চলেছে, কী বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ প্লাস্টিক এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। চোখের ওপর প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে পরিবেশ আইন ভাঙা হচ্ছে। পুরপ্রতিষ্ঠানগুলি কোন আইনই মানে না। চারিদিকে জলা বোজানো হচ্ছে। শিল্পক্ষেত্র সহ কোথাও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে উল্লেখ্য, আইনের কার্যকারিতার মধ্য দিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষিত হয়। পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তৎসহ কারখানার শ্রমিকদের পেশাগত রোগটিও এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে। অতীব দুঃখজনক হলেও এই জরুরি বিষয়টি কখনও আলোচিত হয় না।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার