শ্যামাপ্রসাদ:কী চোখে দেখব?
মতামত লেখকের নিজস্ব
মন্তব্যর জন্য সম্পাদক
দায়ী নন
শ্যামাপ্রসাদ:কী চোখে দেখব?
আইনজীবী সুমিত ব্যানার্জী
আমাদের মধ্যে এমন ক'জন বাঙালী আছেন যিনি এক লপ্তে তাঁর জন্মবছর বাংলা সনে বলতে পারবেন ! পলাশীর লড়াই থেকে সিপাহী বিদ্রোহ হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সব আমাদের মুখস্থ ইংরাজি সালের ক্রমান্বয়ে। ব্যতিক্রম শুধু দুটো, ১২৭৬ আর ১৩৫০- দুটো মন্বন্তর। কেমন ছিল মানুষেরই তৈরি সেই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা ? সরকারি মতে ১৫ লক্ষ , বেসরকারি হিসাবে ৩৫ লক্ষ মানুষ বেঘোরে শুধু অনাহারে মরেছিল। আরো প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে ভিখিরি হয়ে যায়। যুগান্তর লিখল, 'অন্নের জন্য লোকে স্ত্রী পুত্র বিক্রয় করে এবং নর্দমার ভিতর কুকুরের সহিত উচ্ছিষ্ট লইয়া কাড়াকাড়ি করে।' বাংলার ৯০ টি মহকুমার মধ্যে ২৯ টিতে এই মারণ দুর্ভিক্ষ তার বিষ দাঁতের স্থায়ী চিহ্ন এঁকে দেয়। এই মন্বন্তরের পিছনে মজুতদার, মুনাফাখোরদের প্রত্যক্ষ ভূমিকাতো তো ছিলই আর বাঙালির এই জাতীয় বিপর্যয়ে আর একজন বাঙালি কম দায়ী ছিল না, তিনি শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মন্বন্তরের আগের বছর ফজলুল হকের সাথে হাত মিলিয়ে সরকার গড়ে ছিলেন যিনি। সে বছর বাংলাদেশে ২৫ লক্ষ টন চালের ঘাটতি অথচ মন্ত্রীসভা জানিয়ে দিল বাংলায় চালের কোনো ঘাটতি নেই। উল্টে গভর্নর স্যার জন আর্থার হার্বার্ট এবং ব্যবসায়ী ইস্পাহানির সাথে হাত মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগে রপ্তানি হয়ে গেল গাড়ি গাড়ি ভর্তি চাল। আর এই চাল সাপ্লাইয়ের দ্বায়িত্ব পেলেন শ্যামা ঘনিষ্ঠ এইচ দত্ত অ্যাণ্ড সনস্। প্রসঙ্গত এই এইচ দত্ত অ্যাণ্ড সনস্ ছিল আবার শ্যামাবাবুর রাজনৈতিক মুখপত্র 'নবযুগ' - এর ফাইন্যানসার। বাংলার মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়ে দত্তরা কামিয়ে ছিল কয়েক কোটি টাকা।
বাংলার আকাশে ঘনিয়ে এল কালো মেঘ, রাস্তায় নামল নিরন্ন মানুষের ঢল। পথে প্রান্তরে আকাশ বিদীর্ণ করা চিৎকার ' একটু ফ্যান দাও ', বিপদ বুঝে পদত্যাগ করল শ্যামা - হকের মন্ত্রীসভা।
এবার ফিরে আসি শ্যামা বাবুর জন্মশতবার্ষিকী, ৬ ই জুলাই, ২০০০। তৎকালীন পশ্চিম বাংলার উপমুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শ্যামা বাবুর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে কেন উপস্থিত থাকেন নিই সেই নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী থেকে ছোট বড় বিভিন্ন মাপের রাজনৈতিক নেতা এবং সাংবাদিকদের কেউ কেউ ওনার তুমুল সমালোচনা করেছিলেন। তৃণমূলের তৎকালীন সাংসদ নীতিশ সেনগুপ্ত আসল সত্যি চেপে গিয়ে যে কথা ২০০০ সালে বলেছিলেন ২০২৫ সালে শ্যামাবাবুর ১২৫ তম জন্মদিনে এসে সেই একই কথা আউড়ে যাচ্ছে জার্সি পাল্টানো বিজেপির নেতা নেত্রীরা, 'শ্যামাপ্রসাদ বাবু না থাকলে না কী গোটা রাজ্যটাই পাকিস্তানে চলে যেত', আসল সত্যটা চাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেস্টা ।
ইতিহাস ঘাঁটলেই জানা যাবে যে, স্বাধীনতার প্রাক্কালে বিধান সভায় পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তি সংক্রান্ত প্রস্তাবের পক্ষে ৫৮ জন সদস্য ভোট দিয়েছিলেন। কমিউনিষ্ট-কংগ্রেসের সব্বাই, মুসলিম লীগের কোনও কোনও সদস্য এবং হিন্দু মহাসভার একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ। তাহলে অঙ্কটা কী দাঁড়ালো সহজেই বোঝা গেল! উল্টে দেশ স্বাধীন হলে হিন্দু মহাসভার কট্টর নেতা জার্সি পাল্টে ভিড়ে গেলেন নেহেরুর ক্যাবিনেট মন্ত্রীসভায়, স্বাধীন ভারতের প্রথম ইন্ডাস্ট্রি অ্যাণ্ড সাপ্লাই মিনিষ্টার। খুবই দুঃখ জনক সেদিন যদি শ্যামাপ্রসাদ পণ্ডিত নেহেরু এবং বল্লভ ভাই প্যাটেলের হাত শক্ত না করতেন তাহলে বাংলা নিশ্চিত ভাগ হোত না। যে মানুষটা সারাজীবন বাংলার সাথে তঞ্চকতা করে গেল তাকে বাংলার রূপকার বলি কী করে ? কানা মনে মনে জানা।
সত্যি কথা বলতে কী, আজ যতই তাঁর নামে রাস্তা, ডক, পোর্ট তৈরি হোক, বাংলার মাটিতে হিন্দু-মুসলমান মহলে দেশবন্ধু, সুভাষ বা কিরনশঙ্কর রায়ের মত কোনোদিনই গ্রহণ যোগ্যতা ছিল না শ্যামাপ্রসাদের।
গোয়েবলস থিওরিতে রাজনীতির ময়দানে শ্যামাবাবু, নাথুরাম, সাভারকারদের যতই বীর বানানোর চেষ্টা করুক বিজেপি আসল সত্যিটা ধামা চাপা দেওয়া খুবই কঠিন।
p>https://bulletinsituatedelectronics.com/kdkucushk?key=809494c14ce58865099940d497ceb56b
style="text-align: justify;">



মন্তব্যসমূহ