মুখ্য নিয়োগকর্তা গ্র্যাচুইটি দিতে বাধ্য
মুখ্য নিয়োগকর্তা
গ্র্যাচুইটি দিতে বাধ্য
আইনজীবী বিশ্বজিৎ মুখার্জি
ভারতের কেন্দ্রীয় এবং সমস্ত রাজ্য সরকারগুলিতে ঠিকাদারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কর্মী নিয়োগ হয়ে চলেছে। কেবল সরকারি সংস্থা নয়, সরকারের দেখানো পথ ধরে বিভিন্ন কারখানা ও অন্যান্য সংস্থায় ঠিকাদারের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে। এই নিয়োগগুলি করার পেছনে একটিই উদ্দেশ্য যে আইনকে ফাঁকি দিয়ে শ্রমিকদের প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা। যদিও ভারতের বুকে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ বাতিল করার উদ্যোগের জন্য ১৯৭০ সালে কন্ট্রাক্ট লেবার রেগুলেশন অ্যাবোলিশান অ্যাক্ট তৈরি হয়। কিন্তু কার্যত ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে আইন তৈরি হলেও সেই আইন কখনোই কার্যকরী হয়নি। উপরন্তু নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, নানান সরকারি দপ্তরে ও কলকারখানায় ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ হয়েই চলেছে।
চন্দননগরের আইন সহায়তা কেন্দ্র ও শ্রমিক কল্যাণ সমিতি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই অমানবিক, অসাংবিধানিক এবং শ্রমবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাচ্ছে। কখনো প্রয়োজন হলে রাস্তাতে নেমেও আন্দোলন করেছে। সাম্প্রতিককালে কলকাতা হাইকোর্ট দুটি মামলায় সুনির্দিষ্টভাবে আইন জারি করেছে যে, কারখানা বা অফিসে ঠিকাদারের মাধ্যমে কর্মী বা শ্রমিক নিয়োগ হলে যদি সেই ঠিকাদার কর্মী বা শ্রমিকদের প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি ও মজুরি প্রদান না করে, সেক্ষেত্রে মুখ্য নিয়োগ কর্তাকে পাওনাগন্ডা মেটাতে হবে।
রাজ্য সরকার পরিচালিত মাদার ডেয়ারি সংস্থার কর্মী শিবপ্রসাদ সূত্রধর ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োজিত হয়ে সেখানে দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি কাজ করেছেন। শিবপ্রসাদ চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর ঠিকাদার গ্র্যাচুইটি দিতে অস্বীকার করলে তিনি চন্দননগর আইন সহায়তা কেন্দ্রের সাহায্য নিয়ে মাদার ডেয়ারির বিরুদ্ধে শ্রম দপ্তরে মামলা করেন। কিন্তু রাজ্যের শ্রম দপ্তর মাদার ডেয়ারিকে শিবপ্রসাদের পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দেবার জন্য কোন আদেশ প্রদান করে না। উপরন্তু, সূত্রধরের মামলাটিকেও বাতিল করে দেয়। এ সত্ত্বেও আইন সহায়তা কেন্দ্র বার বার যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে যে, মাদার ডেয়ারি মূল নিয়োগকর্তা এবং আইনত মাদার ডেয়ারিকেই গ্র্যাচুইটির টাকা মেটাতে হবে। শ্রম দপ্তরের আদেশের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়। বিগত ৩০ জুন, ২০২৫ তারিখে কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি শম্পা দত্ত পাল আইন সহায়তা কেন্দ্রের বক্তব্যকে মান্যতা দিয়ে শ্রম দপ্তরের আদেশটিকে বাতিল করেন এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মাদার ডেয়ারি কর্তৃপক্ষকে সূত্রধরের পাওনা গ্র্যাচুইটি সুদ সহ প্রদান করতে নির্দেশ দেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নমুনা জরিপ সংস্থায় ঠিকা শ্রমিক গৌরাঙ্গ কর্মকার চাকরিরত অবস্থায় মারা যান। তাঁর স্ত্রী নীলিমা কর্মকার গ্র্যাচুইটির জন্য আবেদন করেন। নীলিমার আবেদনকে মান্যতা দিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রম দপ্তর কিন্তু গ্র্যাচুইটির টাকা প্রদান করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু জাতীয় নমুনা জরিপ সংস্থা এই টাকা মিটিয়ে দিতে অস্বীকার করে। ঘটনাটি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারের শেষে মাননীয় বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায় সুনির্দিষ্ট ভাবে জানিয়ে দেন যে, জাতীয় নমুনা জরির সংস্থাকে আগামী ৪ সপ্তাহের মধ্যে নীলিমা কর্মকারকে গ্র্যাচুইটির টাকা সুদ সহ প্রদান করতে হবে। ঠিকা শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটি পাওয়ার বিষয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, কলকাতা উচ্চ আদালতের এই বিশেষ রায়ে তার অবসান ঘটলো। আগামী দিনে ভারতের বুকে হাজার হাজার ঠিকা বা পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁরা অবসরের পর গ্র্যাচুইটি পান না, তাঁদের গ্র্যাচুইটি পাওয়ার পথ প্রশস্থ হল। কিন্তু কেবল আইন বা শ্রমজীবীদের গ্র্যাচুইটি পাওয়ার পক্ষে আদালতের রায় থাকলেই হয় না, তাকে কার্যকরী করার জন্য ট্রেড ইউনিয়নগুলিরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের শ্রম দপ্তরের বিভিন্ন হাসপাতালে, শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমাগত ঠিকা কর্মী বা ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে। এঁদের সমস্ত ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, পশ্চিমবঙ্গের শ্রম দপ্তরেই অসংখ্য ঠিকা শ্রমিক চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। অবসরের পর তাঁদের ন্যূনতম আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হবে কি না তাও নিশ্চিত নয়। পুলিশেও ব্যাপক পরিমাণে সিভিক ভল্যান্টিয়ার নিয়োগ করা হচ্ছে। এঁদের ক্ষেত্রেও সরকার কোন অবসরকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কি না জানা নেই। এঁদের পদোন্নতিরও কোন ব্যবস্থা আছে কি না তাও অজানা। তাই পুলিশের মধ্যেও এ সমস্ত কর্মিদের নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে এই সিভিক পুলিশরাও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কলকাতা হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছে যে, হাইকোর্টে যে সমস্ত অস্থায়ী কর্মিরা কাজ করেন, আইনত তাঁদেরও নানান সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। বহুদিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছে যে, সম কাজে সম বেতন দিতে হবে। কিন্তু আজও সে বিষয়টি কার্যকরী হয়নি। মানুষের অধিকারের লড়াই এক চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার সঠিক রূপায়নই একমাত্র পন্থা।
style="text-align: justify;">


মন্তব্যসমূহ