বাংলার বিপন্নতা বাঙালি অস্মিতার প্রধান সংকট
বাংলার বিপন্নতা বাঙালি
অস্মিতার প্রধান সংকট
শ্রুতিনাথ প্রহরাজ
আবার একটা বাংলা নতুন বছরের দোরগোড়ায় হাজির আমরা। ১৪৩৩ কেমন যাবে এ নিয়ে বিস্তার সংশয় আমাদের মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ' শুভ নববর্ষ ভালো থাকুন' বলতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে। প্রিয়জনদের জন্য শুভকামনা তো করাই যায়, কিন্তু ভালো থাকবার উপায়টা কি? বর্তমান সময়ে কেউ কি আমরা ভালো আছি? চাষী তার ফসলের দাম পাচ্ছেন না। ক্ষেতমজুরের নূন্যতম মজুরির নিশ্চয়তা নেই। গ্রাম শহর নিরপেক্ষে বেকার যুবক যুবতীদের কাজের সুযোগ নেই। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত দিনরাত গতর খাটা মানুষের ন্যূনতম মজুরির নিরাপত্তা নেই। সামাজিক সুরক্ষা নেই। শ্রমিকের আট ঘন্টা কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সরকারি বন্দোবস্ত হিসেবে শ্রম কোড চালু হয়েছে। ইউনিয়ন করা, ধর্মঘট করা, ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সাত থেকে সত্তর-- নারীদের নিরাপত্তা নেই। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে-- শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নেই। যেখানে তা আছে সেখানে ছাত্রছাত্রী নেই। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেওয়ার পরিকাঠামো নেই। এই নেই রাজ্যের চরম নৈরাজ্যের আবহে ভালো থাকা কি আদৌ সম্ভব?
'বাঙালি অস্মিতা' তো আম-বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্ম সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত শব্দবন্ধ। বাঙালি জাতিসত্তার এই বোঝাপড়ার মধ্যে কখনো কোন ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত বা ভাষার বেড়া ছিল না। ছিল বাংলার এই ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী সব মানুষের সম্মিলিত অহং বোধ। সেই কবে থেকে শুনে আসছি, আজ বাংলা যা ভাবে সারা দেশ তা কাল ভাবে। এই ভাবনার মধ্যেও লুকিয়ে আছে বাংলা ও বাঙালির শিক্ষা সংস্কৃতি ও উন্নত চেতনাবোধের পরিচয়। বাঙালি ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিবাদী ও কেন্দ্রীকতা বিরোধী। সে যেমন তার সামূহিক আত্মপরিচয়কে ভারতীয় জাতীয়তাবোধ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেনি, ঠিক তেমনই এই বৃহদংশের মাঝে তার স্বকীয়তাকে বিলীন হতে দেয়নি। এই চেতনা কতটা রাজনৈতিক আর কতটা সাংস্কৃতিক তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তবে একে অস্বীকার করার উপায় নেই। উনিশ শতকের শেষের দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড এলগিন তার লন্ডনে পাঠানো রিপোর্টে বলেছিলেন, 'বাঙালি সত্যিই এক অদ্ভুত জাতি। আমরা যাই বলি না কেন, তারা হুবহু মেনে নেবে-- এমনটা আশা করা ভুল। নিজের মগজ খাটিয়ে, জ্ঞানভিত্তিক বিচার-বিশ্লেষণ করে তারা দৃঢ় মতামত গড়ে তোলে। প্রগতিশীলতায় অনেক সময় যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ভারতে অন্য কোথাও আমরা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।'
আজ এই সামগ্রিক বোধের জায়গায় ধাক্কা লাগছে বারবার। টিভি খুললেই বিজেপি নেতাদের মুখে ধর্মের নামে হুংকার। সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ধর্মাচরণের সঙ্গে যার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা নেত্রীরাও কম যান না। ওরা জয় শ্রীরাম বললে এরা পাল্টা স্লোগান দেন জয় মা দূর্গা, জয় বাংলা! এই চিৎকারে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলা ও বাঙালির উন্নত আত্মচেতনা বোধ। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাঙালি সংখ্যালঘু মানুষ, যারা এই অস্মীতারই অংশ। ধরুন এই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যে সংস্কৃতি। এর তো শুরু বাংলার গ্রামীণ জনপদ থেকে। এই বর্ষবরণের উৎসব ছিল একান্তই লোকজ এবং অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন। এর মধ্যে কোন ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। ফসল ওঠার কারণে সব ধর্মের প্রজাদের এই সময়ে খাজনা দিতে হতো জমিদারদের কাছে। তারপর শুরু হতো ফসল তোলার আনন্দের উৎসব। এই নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ হল গ্রামীণ মেলা যেখানে গ্রামের কুমোরের তৈরি নানা সরঞ্জাম ও বাহারি খেলনার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষিজাত ও ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পজাত পণ্য বিক্রি হত। মেলাকে কেন্দ্র করে বসতো সারি, জারি, বাউল গানের আসর। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ এই মেলায় অংশ নিতেন, এখনও নেন। সঙ্ঘ পরিবার ও তার রাজনৈতিক মুখ বিজেপি বাংলার এই বহুত্ববাদী মিলনের চেতনাকে ভাঙতে চাইছে। বিভেদ সৃষ্টির জন্য নিরন্তর উস্কানিমূলক রাজনৈতিক বক্তৃতা চলছে। ধর্মকে হাতিয়ার করে নাগরিক চেতনাকে ক্ষতবিক্ষত করার চেষ্টা চলছে। অসহায় শরণার্থীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চলছে।
এস আই আর কে কেন্দ্র করে সারা দেশের সঙ্গে এরাজ্যের মানুষও চরম বিপন্নতার শিকার। মৃত এবং ভুয়ো ভোট বাদ যাক এটা তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি বাদে সবাই চায়। বিজেপি মুখে যাই বলুক, নির্বাচন কমিশনের দখল নিয়ে ভোটার লিস্টের এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় তাদের প্রধান লক্ষ্য রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি। তাই আমজনতার স্বার্থ গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে ভোটাধিকার রক্ষার অজুহাতে নাগরিকত্ব বিক্রির বিলি বন্দোবস্ত হচ্ছে। ভোটার লিস্টে তাদের অনেকেরই নাম কাটা পড়ায় বিপন্নতা বেড়েছে, যার দায় বিজেপি এড়াতে পারে না। এই সমগ্র এস আই আর প্রক্রিয়াকে গুলিয়ে দেওয়ার পেছনে তৃণমূল কংগ্রেসেরও একটা বড় ভূমিকা আছে। সরকারি প্রশাসনকে পুরোদস্তুর কাজে লাগিয়ে এই কাজ করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস চায়না ভোটার লিস্ট মৃত ও ভুয়ো ভোটার মুক্ত স্বচ্ছ হোক। তাই প্রথম থেকে বিরোধিতার নামে বিস্তর নাটকবাজি হয়েছে। এর পেছনে আরো একটা বড় কারণ আছে। সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, বেকারি, কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়া ইত্যাদি জরুরী বিষয়গুলোকে আড়াল করা। মানুষ মেতে থাকবে এস আই আর নিয়ে। ভুলে যাবে অন্য বিষয়গুলো। তৃণমূল কংগ্রেস এতদিন পঞ্চায়েত পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের নামে প্রহসন করেছে। ঠিক যেমনটা করেছে বিজেপি ত্রিপুরায় ক্ষমতায় আসার পর। উভয় দলই ক্ষমতা দখলে নেশায় এস আই আরকে হাতিয়ার করে মানুষের জীবন জীবিকার ইস্যুগুলিকে আড়াল করতে ময়দানে নেমে পড়েছে। এতে আমজনতার দুর্ভোগ, আশঙ্কা আরো বাড়ছে। অসহায় ভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন কেউ কেউ। বছরের পর বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ করা মানুষগুলো জানতেও পারছেন না কোন অপরাধে তাদের ভোট দেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বিবৃতি অনেকসময় বিজেপির রাজনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে না। একমাত্র সিপিআই(এম) সহ বামপন্থী দলগুলি প্রথম দিন থেকে অসহায় মানুষদের পাশে থেকে এস আই আর-এর নামে এই হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ প্রতিরোধের সংগ্রামের পাশাপাশি কখনো এদের ফরম পূরণ করায় সাহায্য করছেন আমাদের কর্মীরা, আবার কখনো সাথে করে নিয়ে যাচ্ছেন বিডিও /এসডিও দপ্তরে কথা বলার জন্য। তবু চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানুষগুলির উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দিনে আরো কি অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে-- এই আশঙ্কায় দিন গুনছেন তারা। আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান হারানো বাংলা ও বাঙালি অস্মিতার এই চরম সংকটে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস-- দুই রাজনৈতিক দলই সমান দায়ী। বাংলার বিপন্নতা কাটাতে দুটো দলকেই এই রাজ্য থেকে উৎখাত করা খুব জরুরী।
বাংলার অর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। আর্থিকভাবে চরম আক্রমণের মুখে এ রাজ্যের সর্বস্তরের শ্রমজীবী মানুষ। নির্বাচনের আগে নগদ অর্থ বিলিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি-- উভয় দলই। এতে গরিব মানুষের দুর্দশা কমবে না একথা হলপ করে বলা যেতে পারে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে কেবলমাত্র পাঁচ বছরের জন্য ভাতার সংস্থান করে সংকটের স্থায়ী সমাধান হয় না। একই কথা প্রযোজ্য অন্য প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেও। চাই কর্মসংস্থান গড়ে তোলার উপযোগী নির্দিষ্ট শিল্প গঠনের উদ্যোগ। চাই সমস্ত সরকারি শূন্য পদে মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ। চাই ১০০ দিনের কাজের পরিধি ও মজুরি দুই বাড়ানো যাতে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একইভাবে চাই স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে পুনর্গঠন করা, মহিলাদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে। একমাত্র বামপন্থীরাই তাদের বিকল্প কর্মসূচির ইশতেহারে এই দাবিগুলিকে মান্যতা দিয়েছে। নিয়মিত এসএসসি ও পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা অতীতে নিয়মমাফিক করে দেখিয়েছে বামপন্থীরা। সদিচ্ছা থাকলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এটা বামপন্থীরাই প্রমাণ করেছে অতীতে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন। যে কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ঘটিয়ে কৃষির ভিত-এর উপর দাঁড়িয়ে শিল্প গড়ে তোলার শপথ নিয়েছিল বামপন্থীরা। কাজ শুরুও হয়েছিল পুরো দমে। এতে ভয় পায় বিরোধীরা, ভয় পায় কর্পোরেট শক্তিও। ক্ষমতা দখলের নেশায় বেকার যুবক-যুবতীদের ভবিষ্যৎ কে বাজি ধরেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। তাকে সঙ্গ দেন বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং সহ কর্পোরেট শক্তি। ক্ষমতার নেশায় রাজ্যের সামগ্রিক শিল্প সম্ভাবনাকে ভাগাড়ে পাঠানোর শপথ নিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী সহ তার রামধনু জোট। সফল হয়েছেন তারা, ক্ষমতায়ও এসেছেন মমতা দেবী। শুধু শিল্প আর নতুন করে গড়ে ওঠেনি। উল্টে পিছিয়েছে কৃষি উৎপাদন ও কৃষি নির্ভর অন্যান্য ক্ষেত্র গুলির আর্থিক বিকাশ। মানুষের আর্থিক দুর্দশা দিন দিন বাড়ছে।
রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল। দুটো দলেরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটা বড় অংশ এখন লুমপেনদের দখলে। তাই রাজ্যজুড়ে হিংসা হানাহানির ঘটনা বেড়েছে। ঈদ-রামনবমী ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিধানসভায় দুই দলের নেতা-নেত্রী কে কত বড় হিন্দু তা জাহির করার প্রতিযোগিতায় নামেন। ফলে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিভাবে বাঁচানো যায় তা নিয়ে বিধানসভায় আলোচনা হয় না। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্নীতি মুক্ত করে সাধারণ মানুষের কাছেই আরো বেশি বেশি করে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য পরিকাঠামোগত উন্নতি কিভাবে করা যায় তা নিয়া আলোচনা হয় না। বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা হয় না। মহিলাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের কি ভূমিকা হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা হয় না। বিজেপি মেতে থাকে রাম মন্দির হনুমান মন্দির নিয়ে। আর মমতা তার পাল্টা দিতে মেতে ওঠেন সরকারি টাকায় গড়া জগন্নাথ মন্দির মহাকাল মন্দির ইত্যাদি নিয়ে। বামপন্থীরা না থাকায় বিধানসভায় আমজনতার জীবন জীবিকার দৈনন্দিন ইস্যুগুলো তোলার এখন কেউ নেই। তাই বামপন্থীদের জয়ী করা সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার স্বার্থে জরুরী। কারণ একমাত্র বামপন্থীরাই পারে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সংসদ ও বিধানসভার ভেতরে এবং বাইরে ধারাবাহিক লড়াই আন্দোলন গড়ে তুলতে এবং একই সাথে জনস্বার্থবাহী নীতিগুলি কার্যকর করতে। বাংলা ও বাঙালি অস্মিতা রক্ষার লড়াই-এর সাথে যা অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে।
বাংলার সামাজিক সংস্কৃতিও আজ বিপন্ন। আরএসএস সারাদেশে শিক্ষা সংস্কৃতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির দখল নিয়েছে হিন্দুত্বের প্রচার প্রসার ও হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে। একইভাবে রাজ্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির দখল নিয়েছে এখানকার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে দুই দলের মধ্যে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম নিউক্লিয়াস ক্লাব সংগঠনগুলিকে শাসকদলের পক্ষ থেকে নিয়মিত আর্থিক অনুদান যুগিয়ে দখল নেওয়ার চেষ্টা চলছে। নির্বাচনে সমর্থন না দিলে আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমিতে অন্নদাশঙ্কর রায়, অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বসা চেয়ারে এখন ব্রাত্য বসু বসেছেন। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা রসাতলে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকার অসংখ্য মেধাবী যুবক-যুবতী। ফাঁকা খাতা দিয়ে অথবা পরীক্ষায় না বসে শুধুমাত্র শাসকদলের নেতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন অযোগ্য প্রার্থীরা। আজকের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু বাবুও এই অপরাধের অন্যতম অংশীদার। কারণ যখন তৃণমূল এই জোচ্চুরি করেছে তখন শুভেন্দু বাবু ছিলেন এই দলের নেতা। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে একথা স্বীকার করেছেন। স্কুলের বাচ্চাদের এখন বাধ্যতামূলকভাবে মমতা দেবীর লেখা আজগুবি কবিতা পড়তে হয়। শিক্ষায় সীমাহীন নৈরাজ্য সামাজিক সংস্কৃতির অবনমনের আরও একটা বড় কারণ। রাজ্যজুড়ে মদ গাঁজা সাট্টার ঠেক বাড়ছে। ডিয়ার লটারির মালিক তৃণমূল কংগ্রেস দলকে ৫৪২ কোটি টাকা জুগিয়ে রাজ্যজুড়ে গরীব মানুষের সামান্য উপার্জনের টাকা টুকুও লুট করার ঢালাও লাইসেন্স পেয়েছে। ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ যুগিয়েছে একটা ওষুধ কোম্পানি। এর জন্য আরো কত চড়া দামে আমাদের ওষুধ কিনতে হবে, বা আরো কত প্রসূতি মাকে জাল স্যালাইনের ঠেলায় মরতে হবে আমরা জানিনা। কর্পোরেট পুঁজিতে পুষ্ট হওয়ার তালিকায় এক নম্বরে অবশ্য বিজেপি। তারা ক্ষমতায় এলে কি করবেন জানিনা তবে আমরা তাদের মদতদাতা এই কর্পোরেট শক্তির আক্রমণে সর্বস্বান্ত হব একথা নিশ্চিত। রাজ্যজুড়ে হিন্দুত্বের নামে বিভেদের রাজনীতি সামাজিক সংস্কৃতিকে আরো বিপন্ন করবে একথা হলপ করে বলা যেতে পারে। এই যে পিসি ভাইপো সহ বিজেপির নেতা-নেত্রীরা হেলিকপ্টারে গোটা রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন এর তেলের পয়সা জোগাচ্ছে কারা? হেলিকপ্টার গুলির ভাড়াইবা দিচ্ছে কে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজুন, তবেই বুঝবেন কেন বামপন্থীদের ক্ষমতায় আসা জরুরী। একমাত্র বামপন্থীরাই পারে দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কৃতিকে রক্ষা করে এই কর্পোরেট আগ্রাসনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করতে।
কেউ কেউ বলছেন, বামপন্থীদের ভোট দিয়ে কি হবে, তারা তো সরকার গড়তে পারবে না। এই ভাষ্য তৈরি করার পেছনে বিজেপি বা তৃণমূলের যেমন একটা ভূমিকা আছে ঠিক তেমনই কর্পোরেট শক্তিরও মদত আছে, যাদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রধান লড়াই। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। গোটা রাজ্যে প্রায় এক ছবি। স্বয়ং নেত্রীর প্রতিদিনের শরীরী ভাষ্যেও তা ফুটে উঠছে। বিজেপি এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে কর্পোরেটপুষ্ট মিডিয়াগুলিতে তাদের আসার সম্ভাবনা প্রচার করছে যার সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল নেই। ওই সব মিডিয়ায় বসা তৃণমূল বিজেপির হয়ে আগাম আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে থাকা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা জ্যোতিষীর দল এটা ভালো জানেন এমনিতেই এ রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনের কোন সুযোগ নেই। ২০২১ এর থেকে এবার আসন আরো কমবে। সচেতন ভাবেই বামপন্থীদের আসার সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ১৯৭৭ সালের বিধাসনসভার নির্বাচনের কথা আরেকবার মনে করিয়ে দিই। দেশে তখন আধা ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস কাটিয়ে জনতা পার্টির সরকার। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা জনতা পার্টিকে ২৯৪ টা আসনের মধ্যে ৫৬ শতাংশ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু জনতা পার্টি একাই ৭০ শতাংশ আসনে লড়বার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে জোট ভেস্তে যায়। বামফ্রন্ট একা লড়বার সিদ্ধান্ত নেয়। সবাই ধরে নিয়েছিল জনতা পার্টি সরকার আসবে কংগ্রেসকে হারিয়ে। কিন্তু ফল বেরোনোর পর দেখা যায় বামফ্রন্ট ২৯৪ টি আসনের মধ্যে ২৩১ টি আসনে জয়লাভ করেছে। সিপিআইএম পেয়েছিল ১৭৮ টি আসন। যদি বলেন ওটা মিরাক্যাল ছিল তাহলে বলি এবারও সেই মিরাক্যালের সম্ভাবনা প্রবল। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রতিফলিত হবে ইভিএম এর ব্যালটে। হুমকি লাঞ্ছনা এড়িয়ে মানুষ বামপন্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের কথা শুনছেন, ভবিষ্যৎ আন্দোলনের প্রশ্নে মূল্যবান পরামর্শ দিচ্ছেন। তৃণমূল- বিজেপি ভয় পেয়ে তাদের বাইনারির প্রচার মিডিয়ায় যত বাড়াবে বামপন্থীদের জমি তত মজবুত হবে। একমাত্র বামপন্থার পুনর্জাগরণই পারে বাংলাকে রক্ষা করতে। বাংলা ও বাঙালি অস্মিতাকে সংকট মুক্ত করতে। মানুষ সেই পথেই এগোচ্ছেন। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

মন্তব্যসমূহ