এপস্টীন ফাইলস: যেখানে ‘সিনিস্টার সাইকোপ্যাথি’ মুনাফার চূড়ান্ত মাধ্যম

 এপস্টীন ফাইলস: যেখানে

 ‘সিনিস্টার সাইকোপ্যাথি’

 মুনাফার চূড়ান্ত মাধ্যম


সৌম্য ব্যানার্জী

মার্কিন কর্পোরেট টাইকুন জেফ্রি এপস্টীনের ব্যবসায়ী জীবনের কুকর্মের নথি যত বেরিয়ে আসছে, ‘এপস্টীন ফাইলস’ তত ট্রেন্ডিং হচ্ছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া থেকে স্যোশাল মিডিয়ায়। আপাতত ৩.৫ মিলিয়ন পাতার ডকুমেন্ট, ১,৮০,০০০ ছবি আর প্রায় ২০০০ ভিডিও নিয়ে এপস্টীনের ঢেউ আছড়ে পড়ল ভারতে। শিশু-ধর্ষণ ও তরুণী-পাচার চক্রের অন্যতম আন্তর্জাতিক নথি হিসেবে পরিচিত এপস্টীন ফাইলস। সেখানে মোট ৩০ বার উল্লেখ করা হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম! এছাড়াও নামের তালিকার মধ্যে রয়েছে বিজেপি নেতা হরদীপ সিং পুরি, শিল্পপতি অনিল আম্বানি আর আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা লেখক দীপক চোপড়া। সর্বভারতীয় কর্পোরেট মিডিয়া এই বিষয়কে যত আড়ালে রাখার চেষ্টা করছে, সংসদে বিরোধী দলগুলো থেকে শুরু করে স্যোশাল মিডিয়ায় তরুণ প্রজন্ম বিষয়টা নিয়ে তত আওয়াজ তুলছে। দেশে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান আর অন্যান্য মানবাধিকারের প্রশ্নে উদাসীন হয়ে থাকা কট্টর মোদী-ভক্তরা এবার লজ্জার খাতিরে “বিশ্বাস করি না! ছবি-ভিডিওর প্রমাণ দেখাও!” মার্কা মন্তব্য করতে পারছে না। ব্যবসা জীবনের শুরু থেকেই জেফ্রি এপস্টীনের সংস্থা কাজ করত বহু আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার হিসেবে। অর্থনৈতিক পরামর্শের পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ ডলারের বিনিময়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালীদের গোপন ইচ্ছে পূরণের পরিবেশ দেওয়া আর সেই ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো পাবলিকের থেকে গোপন রাখা ছিল এই জে.এপস্টীন অ্যান্ড কম্পানি-এর ব্র্যান্ড পোজিশনিং। ২০১৭ সালে জেফ্রি এপস্টীন কাতারের ব্যবসায়ী জাবর ইউসেফ আল-ধানী’কে পাঠানো ই-মেইলে লিখেছেন “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী পরামর্শ নিলেন। এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুবিধার্থে ইজরায়েলে নাচ-গান করলেন। তাঁরা কিছু হপ্তা আগে সাক্ষাৎ করেন… এটা কাজ করেছে!” এখানে প্রসঙ্গ আর পরিস্থিতি নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে সায় দিচ্ছে না। কেন্দ্র সরকারের হয়ে রাফেল চুক্তি সই করার কয়েক মাসের মধ্যে জেফ্রি এপস্টীনের সঙ্গে অনিল আম্বানির যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০১৭ সাল থেকে ২০১৯ সালে এপস্টীনের গ্ৰেফতার ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর আগে অবধি, দুজনের মধ্যে ব্যবসার সূত্রে ভালোই যোগাযোগ ছিল। একবার আম্বানিকে ই-মেইল মারফত সুইডিশ ব্লন্ড তরুণী আয়োজন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন এপস্টীন। আম্বানি রিপ্লাই দেন “আয়োজন করে দাও।” এপস্টিন ফাইলে নাম আসার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিফ-অফ-স্টাফ মর্গান ম্যাকসুইনি ইতিমধ্যে পদত্যাগ-ও করেছেন। এর বিপরীতে ফাইলের তথ্য থেকে কিউবার প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান ফিদেল কাস্ত্রো-র প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এপস্টীনের ব্যবসা বিস্তারের সামনে ভয়ঙ্কর প্রতিবন্ধকতা হিসেবে। কাস্ত্রো যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এপস্টীন ও মার্কিন শাসকদের ডানা মেলার সুযোগ হচ্ছিল না। কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর সেই সুযোগ কিছুটা পাওয়া গেছে এমন কথা ই-মেইলের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন এপস্টীন।

এপস্টীনের বেশিরভাগ কুকর্ম চলতো ফ্লোরিডার পাম বিচ ম্যানশন থেকে। প্রায় ১৪,০০০ স্কোয়ার ফুট জমির ওপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর্কিটেকচারে বানানো, ৬টা বেডরুম, ৮টা বাথরুম, সেরামিক টাইল্স বাঁধানো সুইমিং পুল আর গাছগাছালির সারিতে ঘেরা এই ম্যানশন ছিল টিনেজ-গার্ল ট্র্যাফিকিংয়ের হেডকোয়ার্টার। এই ম্যানশন থেকেই এপস্টীন পরিচালনা করতেন ক্লায়েন্ট রিলেশন। ক্লায়েন্টদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প, জর্জ মিচেলদের মতো হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-সেনেটর থেকে শুরু করে বিল গেটস, রিচার্জ ব্র্যানসনদের মতো কর্পোরেট টাইকুন হয়ে মাইকেল জ্যাকসন, উডি অ্যালেনের মতো হলিউড ব্যক্তিত্ব অনেকেই রয়েছেন। এপস্টীনের ব্যবস্থাপনায় ক্লায়েন্টদের জন্য থাকত লাগামছাড়া মোচ্ছব করার অ্যাম্বিয়েন্স আর প্রাইভেসি প্যাকেজ। সেখানে বডি ম্যাসাজ সার্ভিসের নামে মূলত অনাথ নাবালিকাদের ব্যবহার করা হতো। এই ৮-১৬ বছরের নাবালিকাদের সংগ্ৰহ করা চলতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অরফ্যান হাউস আর পথশিশুদের মধ্য থেকে। স্কুলের ছাত্রীদের কখনো পকেটমানি আয় করার কখনো বা ইন্টার্নশিপের টোপ দিয়ে তাদের পার্ট টাইম দেহব্যবসায় নিয়োগ করা হতো। কোনো স্কুলগার্ল তার বান্ধবীকে এই ব্যবসায় আনতে পারলে রেফারারকে দেওয়া হতো ইনসেনটিভ। এই টিনেজ গার্লদের অনেককেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো নিউ মেক্সিকোয় মডেলিং শো করাতে কখনো নিউ ইয়র্কের প্রাইভেট ডিনার পার্টিতে ভাড়ার খাটতে আনতেন। ২০০৬ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ফ্লোরিডা পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে জেফ্রি এপস্টীনের ওপর অপারেশন লিপ ইয়ার শুরু করলে এপস্টীন নিজের ব্যবসাকেন্দ্র ফ্লোরিডা থেকে লিটল জেমস আইল্যান্ডে পুরোপুরিভাবে সরিয়ে নিয়ে যান।‌ অপারেশন লিপ ইয়ার বন্ধ করে এপস্টীনকে আদালতে বেকসুর প্রমাণ করতে এগিয়ে আসেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রাক্তন শ্রমমন্ত্রী তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল আলেকজান্ডার আকোস্টা। এপস্টীন নিজের রাষ্ট্রশক্তি-কর্পোরেট আঁতাতকে কাজে লাগিয়ে অগাধ পুঁজির জোরে কঠোর শাস্তি হওয়া থেকে বেঁচে যান। আমেরিকার মূল ভুখন্ড থেকে দূরে লিটল জেমস দ্বীপের আবাসনে এপস্টীন তরুণীদের ওপর চালু করেন অলিখিত অমানবিক এমপ্লয়মেন্ট কন্ডিশন: হয় মুনাফা দাও নয় প্রাণ দাও। কোনো তরুণী সেই টার্মস এন্ড কন্ডিশনস-এর প্রতি বেসুরো হলে তাকে খুন করে ডেডবডি লোপাট করে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। স্বাভাবিকভাবেই অনাথ মানুষ নিখোঁজ হলে তাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ থাকেনা। আটলান্টিক মহাসাগর আর ক্যারিবিয়ান সাগরে ঘেরা কুখ্যাত ‘এপস্টীন আইল্যান্ড’ থেকে সাঁতরে বেঁচে পালানো সহজ নয়।


নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে হার্বার্ট হাউস ছিল জেফ্রি এপস্টীনের প্রথম বাসস্থান। অট্টালিকার এক একটি ঘরে এক এক রকম ওয়ালপেপার, ফ্লোর ম্যাট ও তার সঙ্গে মানানসই আলো ব্যবহার করে এপস্টীন ঘরগুলোর অ্যাম্বিয়েন্স তৈরি করেন। ঘরগুলো ছিলো আজকালকার কর্পোরেট অফিসের মতোই বাইরের জগতের রোদ-আলো, শব্দ-গন্ধ, দিন-রাত, পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন: যেখানে মালিক ভিতরের অ্যাম্বিয়েন্সকে কাজে লাগিয়ে ক্লায়েন্টের ওপর মানসিক প্রভাব কায়েম রাখতে পারবে আর কর্মচারীদের স্থান-কাল-পাত্র ভুলিয়ে ইচ্ছেমতো খাটিয়ে নিতে পারবে। পুঁজিপতি বন্ধুর ব্যবস্থাপনায় কখনো সেই হার্বার্ট হাউসের প্রাইভেট পার্টিতে কখনো প্রাইভেট প্লেনে হাঁটুর বয়সী তরুণীদের সঙ্গে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় কাটাতেন যার ছবি পাওয়া গেছে ফাইল থেকে। হার্বার্ট হাউসের প্রাইভেট ড্রয়ারগুলো থেকে নাবালিকাদের ছবিতে ভরা বেশ কিছু অ্যালবাম উদ্ধার হয়েছে। ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট অনুযায়ী সেই নাবালিকাদের অনেকেই এপস্টীন কম্পানির অত্যাচারে মৃত।


পুরো বিষয়টাই এপস্টীনের মুনাফাখোরী থেকে সিনিস্টার সাইকোপ্যাথিতে অবতরণ। এটা এমন এক মানসিক স্তর যেখানে পুঁজিপতি তার সমস্ত মরাল কম্পাস খুইয়ে মানুষকে পণ্য করে অকল্পনীয়ভাবে নিংড়ে নিতে পিছপা হয় না। এখানে পুঁজিপতির ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য শ্রমশক্তির পাশাপাশি শ্রমিকের শরীরও একটি আস্ত পণ্যে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে শ্রমিক তার শরীরকে নিজের মনে করা থেকেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কালো চামড়ার মানুষদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখার কয়েকশো বছরের ইতিহাসেও এই সিনিস্টার সাইকোপ্যাথি'র অসংখ্য নিদর্শন আছে। এই অবস্থার লক্ষ্য শুধু শরীরকে পণ্য করে পুঁজির দখল নয়, বরং সেই পুঁজিকে ক্রমাগত আরও বেশি পুঁজিতে পরিণত করা। সহজ কথায়, বিত্তশালী ক্লায়েন্টরা ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইস নিতে এপস্টীনের কাছে আসতেন যা ছিল কম্পানির পরিষেবা। ক্লায়েন্টের কাছে সেই পরিষেবার মেমোরেবল আইডেন্টিটি তৈরি করতে এপস্টীন ব্যবস্থা করতেন ক্লায়েন্টের প্রয়োজনমতো অ্যাম্বিয়েন্স আর প্রাইভেসি। অ্যাম্বিয়েন্স আর প্রাইভেসি প্যাকেজ থেকে আরো মুনাফা বাড়ায় তাকে উন্নত করার লক্ষ্যে তরুণীদের ব্যবহার এবং ক্রমাগত ট্রাফিকিং, আর শেষে স্লেভারীর অবস্থায় পরিণত করা। কথায় বলে “The last capitalist will hang itself by the rope he sold us.” ১০ই আগস্ট, ২০১৯ নিউ ইয়র্ক মেট্রোপলিটন সংশোধনাগারে নিজের কুঠুরিতে এপস্টীনকে গলায় ফাঁস লাগানো, ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে: সেটা আসলে আত্মহত্যা না রাষ্ট্রশক্তির পরিকল্পনামাফিক খুন তার কোনো কিনারা হয়নি।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার