বুজরুক
বুজরুক
বৈদ্যনাথ পাল
🔴 ফেরিঘাট থেকে বেশ কিছুটা দূরে বেড়াকলমির জঙ্গল কেটে দরমার বেড়া দিয়ে মাথা গোঁজার ডেরাটা কোনোমতে খাড়া করেছে নিলয় শাস্ত্রী। বর্ষায় নদী যখন উত্তাল হয় তখন জায়গাটায় খুচখাচ ভাঙন ধরলেও এই ভাঙনধরা নদীতীর-ই মধ্যতিরিশের নিলয় শাস্ত্রীর জীবনের ভাঙন অনেকটাই রুখে দিয়েছে। জায়গাটা জনমানবহীন হওয়ায় বেশ নিরুপদ্রব। নিলয় শাস্ত্রীর লুকোছাপা জীবন তাই এখানে ষোলো আনা ছাপিয়ে সাড়ে ষোলো আনা খাপ খায়।
নিলয় শাস্ত্রী এর আগে প্রায় পাঁচ বছর কালীঘাটে তার গুরু প্রণবানন্দ শাস্ত্রীর খিদমতগারি করেছে। বাবা প্রণবানন্দ শাস্ত্রী নিজেকে বলতেন কামাখ্যাসিদ্ধ তান্ত্রিক -জ্যোতিষী। এহেন বাবার প্রসাদগুণে নিলয় শাস্ত্রী জ্যোতিষীর জীবন -জীবিকায় এক কদম এগিয়েই ছিল। এই কালীঘাটে থাকার সময় চুল-দাড়ি-গোঁফ কাটতে নিলয় শাস্ত্রী কখনো এক পয়সাও খরচ করেনি। পাঁচ বছরের মতো সুদীর্ঘ সময়ে তার চুল -দাড়ি-গোঁফ তেলে -জলে বেড়ে উঠেছে তরতরিয়ে। নিলয় শাস্ত্রীর শরীরে এখন যেন চুল-দাড়ি-গোঁফের মহাবিপ্লব।খালি গায়ে থাকলে তার লম্বা ছুঁচলো দাড়িটা নাভিকুণ্ডলকে চুমু খেতে খেতে দোল খায়। কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে থাকে বিনুনির মতো জড়ানো চুলের জটা। বাবা প্রণবানন্দ শাস্ত্রীর অনুগত শিষ্য নিলয় শাস্ত্রীর শরীরে-মনে ফুটে ওঠে একটা জ্যোতিষ-জ্যোতিষ ভাব।
নিঝুম রাতের নিশ্চিন্ত নিদ্রাভঙ্গ করে সকালের সূর্যকিরণ যখন তার ডেরায় উঁকি দেয় তখন চোখেমুখে জল দিয়ে কাছেই নদীর ঘাটে চান করতে বেরিয়ে পড়ে নিলয় শাস্ত্রী।চানঘাটে যাতায়াতের পথে ফেরিঘাটের আশপাশের লোকজন নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলে।কথার ফাঁকে তারা এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে বলে মন খোলসা করে।নিলয় শাস্ত্রী কখনো তাদের কথার মধ্যে ঢোকে না। তবে সব সময় কান খাড়া করে রাখে। শুধু চানঘাটে যাতায়াতের পথেই নয়,কান তার সব সময়-ই খাড়া থাকে। আশপাশের মানুষের কথা আপনা-আপনি তার কানের ভেতরে সেঁধিয়ে যায়।নিলয় শাস্ত্রী সেসব কথা ভবিষ্যতের সঞ্চয় ভেবে মনের খাতায় জমা করে রাখে।
চান সেরে নিলয় শাস্ত্রী 'জয় মা কামাখ্যার জয়'বুলি আওড়াতে আওড়াতে ডেরায় ফেরে। চুল-দাড়ি-গোঁফ তার দেহজ সম্পদ হলেও জ্যোতিষীর পরিপূর্ণ রূপ পেতে বাকিটা তাকে
মেক-আপ মারতে হয়। তার গুরুর কথা,"ভেক না ধরলে ভিখ মেলে না।"গুরুবাবা এ-ও বলতেন,
"জোতিষী সবার ভাগ্য বলে দেয় কিন্তু নিজের ভাগ্য জানে না।"নিলয় শাস্ত্রী ডেরায় ফিরে রক্তবস্ত্র পরে গায়ে গলিয়ে নেয় লাল কামিজটা।
হাতে পরে নেয় মোটা রুদ্রাক্ষের বালা, গলায় মোটা রুদ্রাক্ষের মালা। হাতে তুলে নেয় ছোট্ট ত্রিশূলটা। রুদ্রাক্ষের এই বালা-মালা আর ত্রিশূলটা নিলয় শাস্ত্রীর নিজের ছিল না। কালীঘাটে তার গুরু প্রণবানন্দ শাস্ত্রীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে নিজের করে নিয়েছে। শুধু রুদ্রাক্ষের বালা-মালা, ত্রিশূল নয়, জ্যোতিষীর কাজে লাগে এমন আরো অনেক কিছুই। গুরুর-
-ই থলেতে ভরে নিয়ে রাতারাতি চম্পট দিয়েছিল নিলয় শাস্ত্রী।এই অনেক কিছুর মধ্যে ছিল বারোটি রাশি ও সাতাশ নক্ষত্রের পরিচয়াদিসহ
গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান অনুযায়ী ভবিষ্যত ভাগ্য নিরূপণের কয়েকটা ল্যামিনেটেড গোলাকৃতি ছক, গ্রহররাশির চিহ্নরেখাঙ্কিত হাতের পাঞ্জাকৃতির কয়েকটা পিচবোর্ড-কাটা ইত্যাদি ইত্যাদি।এই ইত্যাদির তেমন আর্থিক মূল্য না থাকলেও এই হাতিয়ে -নেওয়া গুরুর ধনকে মূলধন করেই একদিন পাকাপাকি জ্যোতিষী হয়ে গেল নিলয় শাস্ত্রী। নিলয় শাস্ত্রী বিলক্ষণ বুঝত গুরুর ধন চুরি করায় তার কোনো ঝক্কি নাই কারণ যে পরিমাণ গুরুধন সে হাতিয়ে নিয়ে এসেছে তা গুরুর উপকরণসম্ভারে সিন্ধুতে বিন্দুমাত্র। সিন্ধুতে বিন্দু জলের যোগ-বিয়োগে সিন্ধুর মতো তার গুরুদেব -ও জানতে বা বুঝতে পারবে না। গুরুদেবের কাছ থেকে হাতিয়ে -নেওয়া ল্যামিনেটেড বিজ্ঞাপনে গুরুর নামের জায়গায় বসিয়ে নিয়েছিল নিজের নাম।সেই বিজ্ঞাপনে বড় বড় অক্ষরে জ্বলজ্বল করে,--ব্যর্থ প্রেমে বশীকরণ, দাম্পত্যকলহ ,
শত্রুদমন, চাকরি, অবৈধ সম্পর্কে বিচ্ছেদ -
-ক্রিয়ায় কালাযাদু প্রয়োগ করা হয়। ব্যবসায় লক্ষ্মীলাভে শ্রীলক্ষ্মীযন্ত্রম,বিদ্যাবুদ্ধিলাভে সরস্বতীযন্ত্রম প্রদান করে থাকি।বাস্তুদোষ, মাঙ্গলিক দোষ,কালসর্পযোগ,রাহু ও শনির দোষ প্রভৃতি কঠিন ও জটিল সমস্যার আশু সমাধানে শতকরা একশো ভাগ গ্যারান্টি।
সকালে কাঁধে ঝোলাটি ঝুলিয়ে ফেরিঘাট থেকে লাইনের অটো ধরে নিলয় শাস্ত্রী স্টেশনের একধারে তার পাতনচি মেলে বসে।ঝোলা থেকে জ্যোতিষীর উপকরণ বার করে সামনে সাজিয়ে রাখে। গেঁথে রাখে সিঁদুর-মাখানো ত্রিশূলটা। দুপাশে ঝুলিয়ে রাখে ল্যামিনেট-করা বিজ্ঞাপন।
মাইক্রোফোনে বাজে কামাখ্যাসিদ্ধ তান্ত্রিক-জ্যোতিষী নিলয় শাস্ত্রীর হস্তরেখা বিচার,ভাগ্য গণনায় হরেকবিধ গ্রহরাশির প্রতিকার-পদ্ধতি ।
কিছুদিনের মধ্যেই ফেরিঘাটের কর্মচারী, আশপাশের লোকজন, দোকানদার আর অটোওয়ালাদের মধ্যে নিলয় শাস্ত্রী তান্ত্রিক-
-জ্যোতিষী হিসেবে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে।
------------------
নিলয় শাস্ত্রীর দুবেলা খাওয়া আর চা-
-জলখাবার খাওয়ার একটাই ঠাঁই। ফেরিঘাটের
'মাসিমার হোটেল'। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকালে এসেই ডাকে,"কই রে কুসুম।"
"আসুন ঠাকুর। কুসুম কল থে জল আনতে গেয়েছে। এখুনি এয়ে যাবে।একটুন বসুন। ঘুগনিটা হতে একটুন দেরি আছে।"হোটেল-
-মালকিন কুসুমের মা সুযোগ বুঝে কথাটা পাড়ে,"আচ্ছা ঠাকুর, আপনাকে একটা কথা কইবার ছেল।"
"বলো কুসুমের মা কী বলবে।"
"আপনি তো ঠাকুর মানুষের মুখ দেখেই ভূত-ভবিষ্যত সব বেত্তান্ত কয়ে দেন।পেথম পেথম বিশ্বাস হচ্ছিল নে। কিন্তুন নিজের চক্ষে তো দেখলুম টিকিটবাবু নয়ন পোদ্দারকে দেখেই বলে দিলেন তার বউ রাগারাগি করে ভেগেছে।ও মা---!যিদিন তাকে বশীকরণ কবচখান দিলেন তার দুদিন পর -ই টিকিটবাবু এসে কয় কিনা তার বউ ফিরে এয়েচে।আহা-হা-হা, বশীকরণ কবচের কী মাহাত্ম্য ---কী মাহাত্ম্য!"কুসুমের মায়ের কথায় নিলয় শাস্ত্রী চোখ বড় বড় করে বলে,"নয়নবাবুর বউ ফিরে এসেছে?জয় মা কামাখ্যার জয়। বুঝলে কুসুমের মা, মানুষের ভালো করতে মায়ের আশীর্বাদী হাত সব সময় আমার মাথায়।"
কুসুম দুহাতে দুটো জলভর্তি পেল্লাই বালতি নামিয়ে রেখে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে,"বসুন ঠাকুর, আপনার জলখাবার দিচ্ছি।"
"থাম পোড়ারমুখী,একটুন থাম। ঠাকুরের সঙ্গে আজ একটুন কথা বলার সুলুক পেইচি। উনি এ্যাতো নোকের এ্যাতো শনির দশা,রাহুর দোষ কাটিয়ে দিচ্ছেন।তোর কী হবে সেইটে আজ ওনাকে কইতেই হবে।"কুসুমের মায়ের কথায় নিলয় শাস্ত্রী বলে,"অবশ্যই-অবশ্যই কুসুমের মা।"
"একটা কথা ঠাকুর----"কুসুমের মা আরো কিছু বলতে চাইলে নিলয় শাস্ত্রী তাকে হাত তুলে থামিয়ে দেয়। আকারে-ইঙ্গিতে যেন জানিয়ে দেয়,-তোমাকে কিছু বলতে হবে না কুসুমের মা,যা যা বলার তা আমি-ই বলব।চোখ বড় বড় করে কুসুমের দিকে তাকায়,"বোস কুসুম, আমার সামনে স্থির হয়ে বোস দিকি।"
নিলয় শাস্ত্রীর সামনে কুসুম জড়োসড়ো হয়ে বসে তার ডাগর ডাগর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
"দেখি বাঁ হাতটা।"এই কথায় কুসুম জ্যোতিষীর সামনে বাঁ হাতের তালুটা মেলে ধরে। কুসুমের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নিলয় শাস্ত্রী গভীর মনোযোগ সহকারে দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে গম্ভীর হয়ে বলে"হু-উ-ম!রাশিফলে
সূর্য রুষ্ট। কুসুমের মা, মনে হচ্ছে তোমার মেয়ে আমার মতোই ঘোর মাঙ্গলিক। একটা জন্মছক থাকলে বোঝা যেত মঙ্গল প্রথম থেকে দ্বাদশ স্থানের মধ্যে ঠিক কোথায় ঘাঁটি গেড়েছে। একটা জন্মছক তৈরি করতে হবে। ওর জন্মতারিখ আর সময় জানো?"
"আছে ঠাকুর আছে।ষেটেরার দিন ওর বাপ নাম রেখেছিল কুসুমকলি। লাল কালিতে ওর জম্মের দিনক্ষণ নিকে টিনের বাস্কতে রেখে দিইছিল।সেইটৈ ঘরে কাঠের মাচাতেই তোলা আছে ।একটু বসুন। কাছেই তো ঘর।যাব আর আসব।"বলতে বলতে পড়িমরি করে ঘরে ছোটে কুসুমের মা।
কুসুমের মা ঘর থেকে ফিরে এলে কুসুমের জন্মের দিনক্ষণ -লেখা চিরকুটটা হাতে নিয়ে নিলয় শাস্ত্রী বলে,"জন্মছকটা আজ-ই তৈরি করছি।দুশো টাকা খরচা আছে কিন্তু।"
"খরচার লেগে ভাববেন না ঠাকুর।"কুসুমের মায়ের কথা শুনে নিলয় শাস্ত্রী উঠে পড়ে। অটো ধরে স্টেশনে চলে যায়। দুপুরে খেতে ফিরে প্রথমেই ছুড়ে দেয় কথাটা,"বুঝলে কুসুমের মা,
এ হল জ্যোতিষী নিলয় শাস্ত্রীর চোখ।হাত দেখেই বুঝেছিলাম কুসুম সধবা হয়েও কেন তার কুমারীর বেশ।"
"আশ্চর্য! কুসুমের যে বে হইছিলো তা আপনি জানেন?"কুসুমের মা শুধোয়।
"না না, আমি জানব কেন?বলছে ওর জন্মছক।দশম স্থানে মঙ্গল।ঘোর মাঙ্গলিক।ফল
অবশ্যম্ভাবী বিবাহবিচ্ছেদ। প্রতিকার নিয়মিত হনুমান চালিশা পাঠ।লাল ফুল দিয়ে শিবের পুজো। করলে হয়তো, বুঝলে কুসুমের মা, তোমার জামাই কুসুমকে ফিরিয়ে নিলেও নিতে
পারে।" নিলয় শাস্ত্রীর কথায় কুসুমের মা ফুঁসে ওঠে,"অমন মাতাল-লম্পট জামাইয়ের মুখে আগুন। আমি আবার কুসুমের বে দেব। আমাদের পাশে রায়বাড়ির মেয়ে বিপাশার মাঙ্গলিক দোষ ছেল।তাই ওর বে দেবার আগে ঘটা করে গাছের সঙ্গে বে দিয়ে মাঙ্গলিক দোষ কাটালো।"কথাটা শুনে নিলয় শাস্ত্রী 'হো-হো' করে হেসে উঠে বলে,"জ্যোতিষশাস্ত্র এই প্রথা মানে না । তবে একটা উপায় আছ। মাঙ্গলিক দোষ থাকলে বিয়ে একজন মাঙ্গলিক মেয়ে বা পুরুষের সঙ্গে হলেই সব দোষ কেটে যায়।"নিলয় শাস্ত্রীর এই কথায় বলব কী বলব না করেও কুসুমের মা বলেই ফেলে,"ঠাকুর,আজ সকালে বললেন যে আপনিও মাঙ্গলিক।যেদি দোষ না ধরেন তো আপনি -ই আমার কুসুমকে পায়ে ঠাঁই দিন না।"
নিলয় শাস্ত্রী তো মনে মনে এটাই চাইছিল। কিন্তু তা বুকের ভেতর চেপেই বলে,"কিন্তু কুসুম? তার -ও তো মত থাকা চাই।"
"আমার মত-ই ওর মত। আপনি রাজি হলেই হয়।"
"কী রে কুসুম, তাহলে আর দেরি না করে তুই আমার সাধনসঙ্গিনী হয়ে যা।"খাওয়া শেষে নিলয় শাস্ত্রী উঠতে উঠতে বলে।
কুসুমের মা -ও আর দেরি করে না।নিলয় শাস্ত্রীর সঙ্গে আর একপ্রস্থ কথা বলে দিনক্ষণ দেখে চার হাত এক করে দেয়।সেই থেকে এই দম্পতির জীবন আলাদা মাত্রা পায়।নিলয় শাস্ত্রী তার ডেরা ছেড়ে ঢোকে কুসুমদের ঘরে।
-------------------
এখন প্রতিদিন বিকালে ফেরিঘাটের অটো-
-স্ট্যান্ডের পেছনে নিলয় শাস্ত্রী জ্যোতিষ-গণনার কাজে পাতনচি মেলে বসে। সেদিন দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বিকালেও আকাশের মুখ ভার ছিল। মেঘলা দিনে গোধূলির আলো ঢেকেছে রাতের আঁধার। ফেরিঘাটে যাত্রীদের ভিড় পাতলা হয়ে আসে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে পরিষ্কার আকাশে তারা ফুটে উঠেছে। দেখতে দেখতে ফেরিঘাটের শেষ স্পীডবোট ছাড়ার সময় হয়ে এল।। তেমন খদ্দেরপাতি
না-থাকায় কুসুমরা হোটেলের ঝাঁপ ফেলে কখন
বাড়ি চলে গেছে। নিলয় শাস্ত্রীও তার জিনিসপত্র ঝুলিতে গুছিয়ে নিচ্ছে। তার একটু তফাতে
আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে এক মহিলা। সঙ্গে একজন পুরুষমানুষ। নিলয় শাস্ত্রী শুনতে পায় পুরুষটি সঙ্গের মহিলাকে বলছে,"দেখ না উনি তো জানতেও পারেন।"
"কী জানতে চাস বেটি? জ্যোতিষী নিলয় শাস্ত্রী ভূত-ভবিষ্যত সব বলে দিতে পারে। তবে আমার সময় বেশি নাই। আমি এখুনি উঠব।কিছু জানতে চাইলে দুশো টাকা দিয়ে সামনে বসে পড়।"নিলয় শাস্ত্রীর কথায় মহিলাটি কী যেন ভেবে তড়িঘড়ি দুশো টাকা দিয়ে সামনে বসে শুধোয়,"বলুন বাবা আমার স্বামী কোথায়।"
নিলয় শাস্ত্রী গম্ভীর গলায় বলে,"হাতটা দেখি।"মহিলা জ্যোতিষীর সামনে হাতটা মেলে ধরে। নিলয় শাস্ত্রী ঝোলা থেকে আতসকাচ বার করে চোখের সামনে ধরে গভীর মনোযোগে দেখতে থাকে।একটু ভেবে নিয়ে বলে,"তোর নামের প্রথম অক্ষরটি কী বল তো বেটি।"
মহিলাটি 'ত-'অক্ষরটি উচ্চারণ করতেই নিলয় শাস্ত্রী বলে ওঠে,"তাপসী মণ্ডল।"
"আশ্চর্য! আপনি আমার নাম বলে দিলেন?"
নিলয় শাস্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে বলে,"আরো অনেক কিছুই বলে দেব। তুই তো মরতে মরতে বেঁচে গেছিস বেটি।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ। একদম ঠিক বলেছেন বাবা।"মহিলার কথায় নিলয় শাস্ত্রী বলে,"তোকে তোর স্বামী তো অনেক আগেই ছেড়ে চলে গেছে। তাকে এখানে খুঁজে বেড়াচ্ছিস বটে তবে সে এখানে নাই। আমি উঠলাম।"বলেই পাতনচি গুটিয়ে ঝোলা কাঁধে নিয়ে নিলয় শাস্ত্রী হাঁটতে থাকে। মহিলার সঙ্গের পুরুষটি কী ভেবে বলে,"একটু দাঁড়ান বাবা।"নিলয় শাস্ত্রী সে কথায় কান দেয় না। ---------------
পরদিন সকালবেলাতেই ফেরিঘাটে জটলা। সেখানে জড়ো হয়েছে ফেরিঘাটের কর্মচারী, দোকানদার, আশপাশের লোকজন। ফেরিঘাটের যাত্রীরাও ঝামেলা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে।জটলার কেন্দ্রবিন্দু তাপসী মণ্ডল নামের সেই মহিলা আর তার সঙ্গের পুরুষটি। পুরুষ মানুষটি কুসুমের মা -কে বোঝাচ্ছে,"আলো -
-আঁধারিতে দাড়ি-গোঁফের আড়ালে মানুষটাকে ঠিক চেনা না গেলেও গলাটা শুনে খুব সন্দেহ হয়। তারপর উনি যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন কাঁধের ডানদিকে চুলের জটা সরে গিয়ে পরিষ্কার দেখা যায় ঘাড়ের পাশে আলুর মতো টিউমারটা। বুঝতে ভুল হয় না মানুষটাকে।"
লোকটার কথায় কুসুমের মনে পড়ে গতরাতের কথা। নিলয় শাস্ত্রী কাল রাতে যখন বাড়ি ফেরে তখন কুসুমের মা শুয়ে পড়েছিল। লোকটার কথা তাই কুসুমের মা না বুঝলেও কুসুম ঠিক -ই বুঝেছে। নিলয় শাস্ত্রী কাল রাতে শুয়ে কুসুমকে
বলেছিল,"কুসুম, একটা কথা তোমাকে বলা হয় নাই। আগে আমার একবার বিয়ে হয়েছিল।বউটা বড্ড বারমুখো ছিল।তাই আমি ওর মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মেরেছি।"কথাটা শুনে কুসুম ধড়ফড় করে উঠে বসে শুধিয়েছিল,"তুমি বউকে খুন করলে? তাহলে তো আমাকেও তুমি একদি-
------"কুসুমকে থামিয়ে নিলয় শাস্ত্রী বলেছিল,"না
না কুসুম,শয়তানী মরে নাই। বেঁচে আছে। আমি আজ আবার তাকে দেখেছি।"
গতরাতে কুসুম যা জেনেছে,যা বুঝেছে তা ফাঁস করে স্বামীর অধিকার হাতছাড়া করতে পারে না।মা-কে থামিয়ে তাই মহিলার সঙ্গের পুরুষটিকে বলে,"অবশ্যই ভুল হচ্ছে। উনি আর কেউ নন। আমার স্বামী নিলয় শাস্ত্রী।কামখ্যা -
-সিদ্ধ জ্যোতিষী।"
"জ্যোতিষী না ছাই।বুজরুক একটা।"মহিলার সঙ্গের পুরুষটি গলা চড়ায়,"ওর আসল নাম দিবাকর মণ্ডল। বাড়ি বর্ধমান জেলার দিগনগর।
আমার এই মাসতুতো দিদি তাপসী মণ্ডলের স্বামী। লোকটাকে বছর দুয়েক আগে কালীঘাটে একবার দেখেছিলাম। তখন ঠিক ধরতে পারিনি।"ভাইয়ের কথায় তাপসী চেঁচিয়ে ওঠে,
"আমাকে মেরে শয়তানটা ভেগেছিল। ভেবেছিল আমি মারা গেছি। শয়তানটা ভুলে গেছে এখানে
আমার মাসির বাড়ি। ফেরিঘাটে ঘুরতে এসে কাল শয়তানটাকে চিনতে পেরেছি। কোথায় সে?"
"কে--কে--ন?"কুসুম তোতলায়,"মা আর আমি ভোরবেলা যখন এসে হোটেল খুলি তখন ঘরে শুয়েই ছিল।"
"ডাকো ডাকো তাকে।"জটলার মাঝে বেশ
কয়েকজন চেঁচিয়ে ওঠে।
" কুসুম ডাকতে গেলে হবে না। নিজেরা ওদের ঘরে গিয়ে দেখব।"ভিড় ঠেলে টিকিট বাবু নয়ন পোদ্দার এগিয়ে এসে বলে,"বুজরুকটা আমাকে কবচ দিয়েছিল ঠিক-ই কিন্তু মা বলেছিল জ্যোতিষীর কবচে কখনো কখনো উল্টোপাল্টা ফল হয়। মায়ের কথায় তাই আমি কবচটা পরি নাই।বউ আমার এমনিতেই ফিরে এসেছে। চলো সবাই কুসুমদের ঘরে।"
উৎসাহী মানুষের দল কুসুমদের ঘরে গিয়ে দেখে নিলয় শাস্ত্রী তার তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভেগেছে। হতভম্ব কুসুম কী বলবে কিছুই ভেবে পায় না। যে মানুষটাকে কুসুম বিশ্বাস করেছিল
সেই মানুষটার জন্যে এ্যাতোগুলো মানুষের কাছে আজ তার মাথা হেঁট হয়ে গেল।তার-ও
আর বুঝতে বাকি থাকে না নিলয় শাস্ত্রী নামের জ্যোতিষী সত্যিই একটা বুজরুক।হতাশ কুসুম
অবাক -দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তাপসী মণ্ডল নামের মহিলার দিকে। কুসুমের সেই নির্বাক-দৃষ্টির ভাষা,
---তাপসী, তুমি আর আমি একই পথের পথিক,
আমরা দুজনই মানুষ চিনতে ভুল করেছি, একটা বুজরুককে বিশ্বাস করে আমরা দুজনই ঠকেছি।
১২৪/৩/২/১৫৭এস.এস.বোস সরণী
বৈদ্যবাটী-৭১২২২২, জেলা -হুগলী
চলভাষ -৯৪৩২২৮১৫৮০
style="text-align: justify;">











মন্তব্যসমূহ