সুকুমার রায় : মৃত্যুর ওপারে অমর কল্পনার আয়না
সুকুমার রায় : মৃত্যুর ওপারে
অমর কল্পনার আয়না
অয়ন মুখোপাধ্যায়
১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর—একটি তারিখ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্যালেন্ডারে চিরকাল কালো দাগ টেনে রেখেছে। সেদিন চলে গেলেন সুকুমার রায়। মাত্র ছত্রিশ বছরের জীবন, অথচ তাঁর সৃষ্টির ঝলক আজও যেন চোখ-ধাঁধানো আতশবাজির মতো আকাশে ছড়িয়ে আছে। মৃত্যু তাঁকে নেয়নি, মৃত্যু কেবল তাঁর শারীরিক উপস্থিতিকে মুছে দিয়েছে। কারণ, তাঁর লেখা, তাঁর হাসি, তাঁর কল্পনার দুনিয়া আজও জীবন্ত, আমাদের প্রতিদিনের ভাষা, অভ্যাস, মজা আর দুষ্টুমির ভেতর দিয়ে।
সুকুমার রায়কে যদি আমরা কেবল শিশু-কিশোর সাহিত্যের লেখক বলি, তাহলে তাঁকে ভয়ানকভাবে ছোট করে ফেলা হবে। সত্যি কথা বলতে, তিনি ছিলেন কল্পনার এক অসাধারণ স্থপতি। তিনি যে ছড়া লিখেছেন, তার ভেতরে যেমন আছে শিশুমনকে উল্লসিত করার হালকা খুনসুটি, তেমনি রয়েছে সমাজের ভণ্ডামি আর গোঁড়ামিকে খোঁচা দেওয়ার সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ। তাঁর লেখা হ-য-ব-র-ল পড়লে আমরা হাসতে হাসতে আবিষ্কার করি—অর্থহীনতার ভেতর দিয়েও কী অসাধারণ অর্থ তৈরি করা যায়।
তাঁর ছড়ার ভেতর যে শব্দের খেলা, সেই শব্দচাতুর্য বাংলা ভাষাকে এমন এক দিশা দেখিয়েছিল, যা আগে কেউ দেখাতে পারেনি। শিশু সাহিত্যে আগে অনেকেই কাজ করেছিলেন—কিন্তু সুকুমারের মতো শব্দকে ভেঙেচুরে, উলটে-পালটে, মাথায় দাঁড় করিয়ে আবার পায়ে নামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আর কারও ছিল না।
তবে শুধু ছড়া বা কৌতুক নয়, সুকুমার রায় ছিলেন একজন সুনিপুণ চিন্তক। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ, প্রযুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে খেলা করার প্রবণতা, এমনকি ফটোগ্রাফি থেকে ছাপাখানার প্রযুক্তি—সবেতেই তিনি ছিলেন একেবারে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে যে “সাহিত্যের বৈজ্ঞানিক” আখ্যা দিয়েছিলেন, তা নিছক প্রশংসাবাক্য ছিল না।
কিন্তু কী ভয়াবহ ট্র্যাজেডি—যে মানুষটিকে বাংলার সাহিত্য-আকাশে আরও বহু বছর আলো ছড়ানোর কথা ছিল, তাঁকে যক্ষ্মা নামের এক নৃশংস রোগ অকালে কেড়ে নিল। মাত্র ছত্রিশ বছর! ভাবা যায়? অনেকের কাছে এ বয়সে জীবন শুরু হয়, আর সুকুমার রায় তখনই তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলো দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বাক্ষর অমোঘ করে ফেলেছেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদপত্রে, কেবল এক মৃত্যুসংবাদ হিসেবে। কিন্তু সেই খবরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের এক বিশাল ক্ষতি, যা সেই সময়ে হয়তো কেউই সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেনি।
আজ যখন আমরা পিছনে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—সুকুমার রায়ের মৃত্যু মানে বাংলা ভাষার অনেক সম্ভাবনার অকালমৃত্যু। তবু আশ্চর্য এই যে, তাঁর অল্প আয়ুর সৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল তাঁকে অমর করে রাখার জন্য। আমরা যতবার অবলিলার গান বা পাগলা দাশুর গল্প পড়ি, ততবার মনে হয়—এই মানুষটি যেন এখনো আমাদের পাশেই কোথাও আছেন, শুধু হেসে চলেছেন তাঁর দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে।
সুকুমার রায়কে মনে পড়লেই আমরা আসলে এক দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। একদিকে আছে শোক—কারণ, তিনি খুব তাড়াতাড়ি চলে গেছেন। অন্যদিকে আছে আনন্দ—কারণ, তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা এত বিপুল, এত বর্ণিল, যে তা কোনও শোকই ঢাকতে পারে না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এরকম উদাহরণ খুবই বিরল। মৃত্যুকে তিনি যেন কল্পনার মাধ্যমে হাস্যকর করে তুলেছিলেন। আজও আমরা বলি—“সুকুমার মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর লেখা বেঁচে আছে।”
তাঁর ছড়া ও কবিতার ভেতর হাসি যেমন আছে, তেমনি আছে চিন্তার দিকনির্দেশ। ছোটরা প্রথমে মজা পায়, পরে বড় হয়ে বুঝতে পারে, এই মজার ভেতর কতটা ব্যঙ্গ, কতটা প্রতিবাদ লুকিয়ে আছে। বাংলা সাহিত্যের আর কোন লেখক এমন দু’দিককে এত দক্ষতায় একসাথে বুনে দিতে পেরেছেন? সম্ভবত কেউই নয়।
সুকুমার রায় তাই শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—কল্পনা কেবল স্বপ্ন দেখার জন্য নয়, কল্পনা হল বাস্তবকে ভাঙার শক্তি, নতুন দিগন্ত খোঁজার ক্ষমতা। তিনি শিখিয়েছেন—হাসি কোনও হালকা ব্যাপার নয়, হাসিই সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অস্ত্র।
আজ তাঁর মৃত্যুদিনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি শুধু শোকের কারণে নয়, বরং কৃতজ্ঞতার কারণেও। কৃতজ্ঞতা এই জন্য যে, তিনি আমাদের জীবনকে এতটা রঙিন করে দিয়েছেন। তাঁর ছড়ার মতোই আজও আমরা বলতে পারি—
“সব ফুরিয়ে গেলেও হাসি ফুরোয় না।”
মৃত্যু তাই সুকুমার রায়কে পায়নি। তিনি আমাদের হাসির ভেতর, আমাদের ভাষার ভেতর, আমাদের প্রতিদিনের কল্পনার ভেতর বেঁচে আছেন। হয়তো একদিন পৃথিবী ভুলে যাবে অনেক বড় বড় কবি, রাজনীতিবিদ, দার্শনিকের নাম। কিন্তু যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন শিশুরা মুখে মুখে গাইবে তাঁর লেখা ছড়া। এই অমরত্বই তাঁর প্রকৃত সাফল্য।
এই রকম বিজ্ঞাপন দিতে
যোগাযোগ করতে পারেন
মূল্য মাত্র ৩০০ টাকা


style="text-align: justify;">





মন্তব্যসমূহ