অস্ত্রের গৌরবহীন একা

 অস্ত্রের গৌরবহীন একা

অয়ন মুখোপাধ্যায়

(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়)

বাংলার রাজনীতি আজ এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ইতিহাস যেন নিজেকেই ব্যঙ্গ করছে। একসময় এই পশ্চিমবাংলা ছিল মতাদর্শের পরীক্ষাগার, শ্রেণি সংগ্রামের পাঠশালা, আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয়। পাড়ার মোড় মানেই ছিল বিতর্কসভা, রাস্তার মিছিল মানেই ছিল নতুন রাজনীতির জন্ম। নতুন ধারার সিনেমা নতুন ধারার নাটক এ সবেরই সূতিকাগার ছিল এই বাংলা আজ সেই মাটি নিস্তব্ধ।

এখন বাংলার রাজনীতি দেখতে অনেকটা ফাঁকা নাটকের মঞ্চ বা মঞ্চের মতো। আলো জ্বলছে, মাইক্রোফোনে শব্দ ভাসছে, কিন্তু অভিনয় করছেন কেবল একজন—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

 দর্শকসারিতে নিস্তব্ধ বিরোধীরা বসে আছেন, তারা হাততালি দেবে কি দেবে না তা নিয়েই দ্বিধাগ্রস্থ।এটাই আজকের পশ্চিমবঙ্গের প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ত্রিভুজ।এ যেন ইতিহাসের মহা-বিদ্রূপ: যেখানে একদিন হাজারো লাল পতাকা আকাশ ঢেকে দিত, সেখানে আজ একটি সাদা–সবুজ–নীল পতাকার নিচে একক নায়িকা দাঁড়িয়ে আছেন। আর যে বামপন্থীরা যে একদিন সারা ভারতবর্ষের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল , তারা আজ নিছক টক-শোর অতিথি।

কিন্তু এই দৃশ্য কি কেবল এক নেত্রীর উত্থানের গল্প, নাকি গোটা রাজনীতির এক গভীর ব্যর্থতার ইতিহাস? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের এই আলোচনার ভেতর ঢুকতে হবে।

লাল পতাকার উত্তরাধিকার

বাংলার রাজনীতি একসময় ছিল লাল পতাকার দীপ্তিতে ভরপুর । ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েতের বিকেন্দ্রীকরণ, শ্রমিক–কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে বামফ্রন্ট গড়ে তুলেছিল এক ঐতিহাসিক পরিসর।

এটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার ছিল না; এটি ছিল হেজেমনি–গঠন। গ্রামশি যেমন বলেছিলেন:

“The supremacy of a social group manifests itself in two ways, as ‘domination’ and as ‘intellectual and moral leadership’.”

বামপন্থা এই নৈতিক–বৌদ্ধিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পেরেছিল যে তারা ইতিহাসের চালিকাশক্তি। শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী—সবাই ছিল এই সমষ্টির অংশ।

কিন্তু সেই হেজেমনি ক্ষয়ে গেল। বাম আন্দোলনের ঘাম শুকিয়ে গেল সেমিনারের আলোয়, মধ্য মেধার উত্থানে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির উত্থানেচাপা পড়ল টক শো-এর মাইকে। আন্দোলনের মাঠ শূন্য হয়ে গেল। বিরোধী আসনে বামপন্থী কর্মীরা দক্ষিণপন্থীদের মতো ভাবলো ওপরের নেতৃত্ব সব পরিবর্তন করে দেবে কর্মীরা ভাবলো মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান। মানুষ একদিন ভুল বুঝতে পারবে । আবার সবাই বামে ফিরে আসবে এটা যে কত বড় ভুল ভাবনা সেটা বুঝতে বুঝতে আরো কিছু ক্ষতি হয়ে গেল। কারণ পার্টির ভেতরে না পড়াশোনা করা মধ্য মেধার নেতৃত্ব পাড়ায় ক্লাবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো খোঁজ নিয়ে দেখবেন তাদের কোন অবস্থান নেই শুধু তাই নয়, যদিও বা তাদের কে দেখবেন ওর মধ্যে থাকে তার নিজস্ব কোন সত্তা নেই। যেখানে আপনি পার্থক্য করতে পারবেন একজন বামপন্থী মানুষকে।

বিহার বনাম বাংলা: সাবঅল্টার্নের কণ্ঠস্বর কোথায়?

বিহারে আজও সিপিআই(এমএল) প্রান্তিক মানুষের ভরসা। জমি, শ্রম, জাতি নিয়ে তারা আন্দোলন চালাচ্ছে। হয়তো ছোট, কিন্তু স্রোত আছে।

অন্যদিকে বাংলায় উল্টো চিত্র। এখানে আন্দোলন নেই, শ্রেণি রাজনীতি নেই। সাবঅল্টার্নদের কণ্ঠস্বর নিশ্চিহ্ন। সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের ভাষায়, রাজনীতির মূলধারায় প্রান্তিকদের স্থানচ্যুতি ঘটেছে। রণজিৎ গুহ যেমন বলেছেন, “the small voice of history”] বাংলার রাজনীতিতে নিস্তব্ধ।

এই শূন্যতায় প্রবেশ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বামদের হারানো ভাষা, সাবঅল্টার্ন কণ্ঠস্বরকে আত্মস্থ করলেন। তাঁর শাড়ি, হাওয়াই চটি, বক্তৃতার ভঙ্গি—সবই নিম্নবিত্ত মানুষের প্রতীক। এভাবে তিনি প্রমাণ করলেন, “বামেরা যেখানে ব্যর্থ, আমি সেখানে সফল সাবঅল্টার্নের প্রতিনিধি।”

নেতৃত্বহীনতা, ভুল বিশ্লেষণ এবং আলথুসারের রাষ্ট্রতত্ত্ব

আলথুসার রাষ্ট্রকে দেখিয়েছিলেন দুই অংশে—Repressive State Apparatus (দমনমূলক শক্তি) ও Ideological State Apparatus (আদর্শগত শক্তি)।বাম রাজনীতি একসময় এই দুই শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

কিন্তু আজ নেতৃত্বহীন বামেরা কেবল প্রতীকী অস্তিত্ব। পুরনো মুখের পুনরাবৃত্তি, নতুন মুখ আছে কিন্তু নতুন কোন রাজনীতির ভাষা তৈরি করতে পারছে না—ফলে তরুণ প্রজন্ম থাকলেও নিজেদের প্রতিবিম্ব খুঁজে পাচ্ছে না অনেকেই।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো বিশ্লেষণের অক্ষমতা। বামপন্থীরা বারবার তৃণমূল কংগ্রেসকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ধরতে পারেননি যে এটি আসলে কংগ্রেসেরই এক লুম্পেন অংশ—যেখানে সংগঠনের শক্তি নয়, ব্যক্তির ইমেজ এবং রাস্তার রাজনীতির নাটকই মুখ্য। এ ভুল বোঝার কারণেই বামেরা ভেবেছিল মমতার উত্থান ক্ষণস্থায়ী। বাস্তবে দেখা গেল, তিনিই হয়ে উঠলেন সাবঅল্টার্ন কণ্ঠস্বরের একমাত্র প্রতিনিধি।

সাংস্কৃতিক প্রশ্নে বামেদের ব্যর্থতা

রাজনীতি শুধু ভোটের প্রশ্ন নয়, এটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রশ্নও। এখানে বামেরা ভয়ঙ্করভাবে ব্যর্থ।

কিছুদিন আগেই কবি–গীতিকার জাভেদ আখতারকে কলকাতায় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি। মৌলবাদী হুমকির কাছে মমতার প্রশাসন নতজানু হলো, অথচ বামেরা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারত সেটা পারল না।

এটা কেবল একজন শিল্পীর অনুষ্ঠান নয়, ছিল সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। কিন্তু বাস্তবে বামেরা এটাকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারে নি। আর মমতা? তিনি দক্ষতার সঙ্গে এই সাংস্কৃতিক সংকটকেও নিজের মতো করে সামলে দিলেন—কোনও সংঘাত না বাড়িয়ে, কিন্তু সাবঅল্টার্নদের আস্থা ধরে রেখে।

এই ব্যর্থতাই দেখায়, বাম রাজনীতি কেবল ভোটেই নয়, সাংস্কৃতিক পরিসরেও সাবঅল্টার্নদের হারিয়েছে।

সোমনাথ থেকে সিঙ্গুর: পতনের দিক বদল

মমতা ব্যানার্জি সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারানো ছিল সেই সময়ের প্রতীকী ক্ষতি, কিন্তু বামেরা তাতেগুরুত্ব দেয়নি।

তারপর এলো সিঙ্গুর–নন্দীগ্রাম। জমি কেড়ে নিয়ে শিল্পায়নের চেষ্টা ছিল রাজনৈতিক আত্মঘাত। মানুষ বুঝল, যে দলকে তারা নিজেদের প্রতিনিধি ভেবেছিল, তারা রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ড হাতে নিয়েছে।

এই বিশ্বাসঘাতকতার ফাঁক পূরণ করলেন মমতা। তিনি গ্রামীণ মানুষের ক্ষোভকে শক্তিতে রূপ দিলেন। তাঁর চোখের জল, ভাঙা গলায় বক্তৃতা, মাটির গন্ধ—সবই তাঁকে সাবঅল্টার্নের একমাত্র প্রতিনিধি করে তুলল।

নির্বাচনের সংখ্যার নির্মম ভাষা

বছর তৃণমূল বামফ্রন্ট কংগ্রেস বিজেপি অন্যান্য

২০১১- ১৮৪, ৬২, ৪২, ০, ৬

২০১৬- ২১১, ৩২, ৪৪, ৩, ৪

২০২১ ২১৩, ০, ০, ৭৭, ৪

এই সংখ্যাগুলো এক নির্মম ইতিহাস বলে।

২০১১: বামের উপস্থিতি, কংগ্রেসের ভরসা।

২০১৬: তৃণমূল শক্তিশালী, বাম–কংগ্রেস ক্ষীণ।

২০২১: বাম নিশ্চিহ্ন, কংগ্রেস অদৃশ্য, বিজেপি বিকল্প হতে পারেনি।

ফলে বাংলার সাবঅল্টার্ন ভোট এককভাবে তৃণমূলের দিকে গিয়েছে।

মমতার সাবঅল্টার্ন হাইজ্যাক ও নিজস্ব স্টাইল

মমতা আসলে সাবঅল্টার্ন রাজনীতির প্রতীকী দখল করেছেন।পোশাক ও ভাষা: সাদা শাড়ি, হাওয়াই চটি, আঞ্চলিক টোন—এগুলো প্রতীকী দারিদ্র্যের চিহ্ন।

বক্তৃতা: “আমি মাটির মানুষ”—এটা কেবল স্লোগান নয়, নিম্নবিত্তের পুনর্দাবি।

প্রকল্প: খাদ্যসাথী, কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার—এসব কল্যাণনীতি আসলে ভোটব্যাঙ্ক স্থায়ী করার হাতিয়ার।

কিন্তু শুধু এটুকুই নয়—মমতার একটি নিজস্ব স্টাইল আছে। তাঁর রাজনীতি অর্ধেক রাস্তায় লড়াই, অর্ধেক নাটকীয় প্রতীক—যেখানে প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি চোখের জল সাবঅল্টার্নদের মনে আস্থা জাগায়।

RSS-এর ছায়া ও দ্বৈত সম্পর্ক

মমতার উত্থান RSS-এর ছায়া ছাড়া সম্ভব হতো না। কংগ্রেসের পতন, বামের ভাঙন, RSS-এর সাংগঠনিক প্রসার—সব মিলিয়ে তিনি শক্তিশালী হয়েছেন।

কিন্তু এটাও সত্য, বহুক্ষেত্রে মমতা রাজনৈতিক স্বার্থে RSS-এর সঙ্গে দ্বৈত সম্পর্ক ব্যবহার করেছেন। কখনও বিরোধিতা, কখনও পরোক্ষ সমঝোতা—ফলে তিনিই টিকে আছেন, আর বামেরা ক্রমশ নিশ্চিহ্ন।

উপসংহার: একা এবং একা 

বাংলার রাজনীতি আজ দাঁড়িয়ে আছে এক ইতিহাসগত দ্বন্দ্বে।বামের পতন কেবল একটি দলের পতন নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির মৃত্যু।

কিন্তু এই শূন্যতাকে পূরণ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আজ বাংলার একমাত্র সাবঅল্টার্ন প্রতিনিধি। তাঁর প্রতীকী দারিদ্র্য, তাঁর কল্যাণমূলক প্রকল্প, তাঁর মাটির গন্ধ—এসবের ভেতর দিয়ে তিনি গরিব মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সাবঅল্টার্ন প্রতিনিধিত্ব কি স্থায়ী, নাকি নিছক রাজনৈতিক অভিনয়?

ইতিহাস সাক্ষী, যে শক্তি একদিন সাবঅল্টার্নদের ভরসা হারায়, সে শক্তি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রান্তিক নোটে পরিণত হয়।

এই মুহূর্তে বাংলার রাজনীতি তাই এক গভীর বিদ্রূপের প্রতীকএকটি শূন্য সিংহাসন, যেখানে বসে আছেন একা এক রানি। চারদিকে নিস্তব্ধতা, অথচ তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ইতিহাসের হারানো সাবঅল্টার্নদের আওয়াজ।

আর ঠিক সেখানেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যের নাম প্রতিধ্বনিত হয়—

“অস্ত্রের গৌরবহীন একা।”

মমতার এই একক আধিপত্য তাই যতটা জয়ের গল্প, ততটাই নিঃসঙ্গতার ট্র্যাজেডি।

     




এই রকম বিজ্ঞাপন দিতে

 যোগাযোগ করতে পারেন 

১ মাসের বিজ্ঞাপন খরচ

 মাত্র ৩০০ টাকা 






style="text-align: justify;">


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার