কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ ( কাকাবাবু)র সংগ্রাম ও শিক্ষা ভাস্করানন্দ রায়

 কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে

 তোলার ক্ষেত্রে 

কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ 

( কাকাবাবু)র 

সংগ্রাম ও শিক্ষা 



ভাস্করানন্দ রায়

 (মতামত লেখকের নিজস্ব এর জন্য পত্রিকা বা সম্পাদক দায়ী নন)


মুজফফর আহমেদ

জন্ম -- ৫ ই আগস্ট ১৮৮৯

মৃত্যু-- ১৪ ই ডিসেম্বর ১৯৭৩

তখনকার দিনে বিভিন্ন আঁক ও বাঁকের মধ্য দিয়ে এক প্রতিকূল অবস্থায়, কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়ে তোলার কাজে কাকাবাবু যে ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, তার থেকে শিক্ষা নিয়েই,বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে আমাদের পার্টি গড়ে তোলার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। 

অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে মার্কসবাদ লেলিনবাদের চর্চা, আদর্শগত সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে কাকাবাবুর জন্মদিনটি পালন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৬৩ সালে ।১৯৬৩ সালের ৫ ই আগস্ট ,কলকাতার রামমোহন হলে প্রথম জন্মদিন পালন করা হয়। ১৯৭০ সালে সিপিআই(এম ) পলিটব্যুরো আনুষ্ঠানিকভাবে কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের জন্মদিন পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।এটা কোন নিছক ব্যক্তির জন্মদিন পালন নয়,উদ্দেশ্য হলো আদর্শগত প্রচার, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রণকৌশল এবং আসু কর্মসূচি গ্রহণ ও রূপায়ন করার সংকল্প গ্রহণ।

কেন মুজফ্ফর আহম্মদের জন্মদিন পালন??অন্যজন নয় কেন?--এ সম্পর্কে কমরেড বাসবপুন্নিয়া একটি নোট লিখেছিলেন ঐ বৎসরেই। সেই নোটে তিনি লিখেছিলেন," এই দেশে যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেছিলেন, তাঁদের অনেকের সম্পর্কেই বিতর্কিত বহু প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। কেউ বিদেশের অনুচর হয়েছেন ,কেউ আদর্শচ্যুত হয়েছেন আবার কেউ কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে অন্য পার্টি গড়েছেন। ব্যতিক্রম কেবল কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ।তিনি বিতর্কের ঊর্ধে নন -- কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কাকাবাবু এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর সততা, নিষ্ঠা, মার্কসবাদ- লেনিনবাদের প্রতি বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কারো মনে কোন প্রশ্ন নেই।

আমাদের কাকাবাবু পার্টি গড়ার প্রশ্নে চারটি শর্তকে গুরুত্ব দিতেন:-- ১) পাটি স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের উপরে স্থান দিতে হবে। ২) সমগ্র পার্টির স্বার্থকে স্থানীয় পার্টি সংগঠনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। ৩) সমগ্রের স্বার্থকে একাংশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। ৪) দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সাময়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।

পার্টি গঠন, পার্টিকে গড়ে তোলা , পার্টিকে শক্তিশালী করার জন্য বিপ্লবী নৈতিকতার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন কাকাবাবু। তিনি এই নিয়ে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বিপ্লবী নৈতিকতার প্রধান প্রধান উপাদান কি :--এই প্রসঙ্গে কমরেড হোচিমিন বিপ্লবী নৈতিকতার উপর পাঁচ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। ১)মানবতা ২)বিশ্বস্ততা৩) ইচ্ছাশক্তি ৪) সাহস ও ৫)সততা ।মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি শিখিয়ে গেছেন মানুষের প্রতি আন্তরিক হন। দিলখোলা হয়ে মানুষের কাছে যান। পার্টির বৃত্তের বাইরেও অনেক মানুষ আছেন-- তাঁদের কাছেও আমাদের যেতে হবে। পার্টির কাছে লুকোবার কিছু নাই।এখন পার্টি," পার্টি বৃত্তের বাইরে বারে বারে যাবার জন্য নেতৃত্ব এবং কর্মীদেরকে বলছেন।" সেটা কি আমরা ঠিক ঠিক করতে পারছি?না পারলে করতে হবে।এখান থেকেই কাকাবাবুর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

১৯৬৭ সালের ৭ ই জুন "কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের লেখা ,"আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি"-র পান্ডুলিপি প্রথমে প্রেসে পাঠানো হয়। কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাকাবাবুর সংগ্রাম বলতে গেলে তাঁর লেখা এই বইটির কথা বলতেই হয় এবং শুধু বলা নয়, বারেবারে পড়তেও হয়। এই বইটির মধ্যেই আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর যে আপোষহীন সংগ্রাম, তার সাথে স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং কংগ্রেসের ভিতরে থেকে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ কিভাবে করতে হয়, তা বুঝতে যেমন সুবিধা হবে আবার অনেক কিছু শেখাও যাবে। পার্টির ভিতরে ও বাইরে তাঁকে নিরলস সংগ্রাম করতে হয়েছে।

*জন্ম ও বেড়ে ওঠা* 

*** এক প্রতিকূল ঝড়-ঝঞ্ঝার পরিবেশে মেঘনা নদীর মোহনায় সাগরে ভাসমান একটি ছোট্ট দ্বীপে (সন্দ্বীপ) খুব দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম ।সেখানে কোন স্কুল ছিল না। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশু শিক্ষার প্রথম ভাগ অতি কষ্টে কিনে এনে অ আ ক খ পড়েছিলেন। পরে সেখানে স্কুল হলেও বাড়ি থেকে দূরবর্তী হওয়ায় এবং দারিদ্র্যের জন্য পড়া ছেড়ে দিতে হয়। ১৬ বছর বয়সে ওই দ্বীপে ইংরাজি স্কুল হওয়ায় নীচের ক্লাসে ভর্তি হলেন। ১৯১০ সালে মুজফ্ফর আহম্মদ সন্দ্বীপ কারগিল হাইস্কুল থেকে পাশ করে নোয়াখালী জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৩ সালে ঐ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি ওখান থেকে এসে হুগলি মহসিন কলেজে ভর্তি হন ।১৯০৫ সালে কাকাবাবুর বাবা ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন। মহসিন কলেজে পড়াকালীন সেখানে অসুস্থ হলে কলকাতায় চলে আসেন।সুস্থ হয়ে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। তখন থেকেই কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা। পরিবারের মধ্যে বেঁধে রাখার জন্য ১৯০৭ সালে তাঁর বিবাহ দেওয়া হয়। কিন্তু বিবাহ বন্ধন তাঁকে বাড়ির মধ্যে বেঁধে রাখতে পারেনি। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছাত্রাবস্থাতেই যোগ দিয়েছিলেন।

*ভূমি সমস্যাই দেশের প্রধান সমস্যা*

----------------------------------------------

১৯২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ,"গণবাণী পত্রিকায়"-- "*ভবিষ্যৎ ভারত*" শিরোনামে কাকাবাবু একটি প্রবন্ধ লেখেন। দেশের প্রধান সমস্যা যে ভূমি, তিনি তা বহুবছর আগেই উল্লেখ করে গেছেন। যা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন ," মাটির বুকে যে ফসল উৎপন্ন হয় সে ফসল খেয়ে মানুষ বাঁচে, সকল প্রাণী বাঁচে। এ মাটি কিছুতেই কেবলমাত্র সমাজের কতিপয় লোকের সম্পত্তি হয়ে থাকতে পারে না। যে মাটির ফসল দেশের প্রত্যেক লোকের প্রয়োজন আছে, সে মাটি দেশের প্রত্যেক লোকেরই সম্পত্তি হবে। অর্থাৎ ভূমিকে দেশের জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করতে হবে। এখনকার মতন ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যে কৃষক ভূমি থেকে ফসল উৎপাদন করবে , একমাত্র তারই সাথে থাকবে ভূমির সাক্ষাৎ সম্বন্ধ।" এই কথা আজও প্রাসঙ্গিক।এটাই আমূল ভূমি সংস্কারের মূল কথা। বৃহৎ জমিদার ও বুর্জোয়া পরিচালিত একটি অঙ্গরাজ্যে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ভূমি সংস্কার করেই ব্যাপক অগ্রগতি ঘটিয়েছিল। কিন্তু আমূল ভূমি সংস্কার করেনি। সেটা করা সম্ভবও নয় এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে। এই প্রবন্ধেই কতগুলি দাবির কথা বলেছিলেন যা আজও প্রাসঙ্গিক তো বটেই এবং বর্তমানে ঐ দাবী নিয়ে লড়াই সংগ্রাম চলছে। কাকাবাবু যে দাবীগুলো ঐ প্রবন্ধে লিখেছিলন তা নিম্নরূপ:--

১) সর্বজনীন ভোটাধিকার 

২) জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ 

৩) শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ও কাজের সময় 

৪) সামাজিক কুপ্রথা দূরীকরণ

৫) বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা 

৬) প্রেস ও বক্তৃতার স্বাধীনতা 

৭) নারী পুরুষের সমানাধিকার 

৮) খনি, রেলওয়ে , ট্রামওয়ে, স্টিমার ও টেলিগ্রাফ প্রভৃতি জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা।

কেন্দ্রে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি সরকার এবং রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের দাবীগুলিকে কিভাবে উপেক্ষা করছে এবং কর্পোরেটদের হাতে কিভাবে দেশকে তুলে দেওয়া হচ্ছে তা আপনারা সবই দেখছেন। কাকাবাবু স্বাধীনতার ২১ বছর আগেই এই কথাগুলি বলে গিয়েছিলেন।

১৯১৬ সালের ২ অক্টোবর "বন্দী মুক্তির" দাবিতে সভা হয়েছিল মহাজাতি সদনের পার্শ্ববর্তী ময়দানে। চিত্তরঞ্জন দাশ ও বিপিনচন্দ্র পাল এই সভায় বক্তৃতা দেন। কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ এই প্রথম কোন সভায় উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম থেকেই মুজফ্ফর আহম্মদ পত্রপত্রিকার উপর জোর দিতেন।দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৯২০ সালের ১২ই জুলাই "নবযুগ" পত্রিকার সান্ধ্য দৈনিক প্রকাশ করেছিলেন নজরুল ইসলাম ও মুজফ্ফর আহম্মদ।১৯২০ সালের ১৭ ই অক্টোবর তাসখন্দ শহরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। সাত জনকে নিয়ে কমিটি হয়। সম্পাদক হয়েছিলেন মুহম্মদ সফিক ।১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাকাবাবু লেলিনের তিনটি বই বিদেশ থেকে আনিয়েছিলেন ।১)বলশেভিকরা কি ক্ষমতা দখলে রাখতে পারবেন? ২)লেলিনের বামপন্থী কমিউনিজম শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা ৩)পিপিলস মার্কস।

কাকাবাবুর কথায়,"১৯১৮ সালের শেষাশেষিতে আমার সব সময়ের কর্মীর জীবন যে আরম্ভ হয়েছিল, সেই জীবন আমার আজও অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে এই কলছত্র লেখার সময়েও চলেছে। 

আমার জীবনের পেশা কি হবে-- সাহিত্য না রাজনীতি? এই নিয়ে আমি পুরো ১৯১৯ সাল ভেবেছি। সত্য কথা বলতে আমার মনের ভিতরে সাহিত্য ও রাজনীতির দ্বন্দ্ব চলেছিল। কবি আমি ছিলেম না ।গল্প লেখক বা ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন আমি কোনদিন দেখিনি। সেই ভাষ্য কোনদিন আমার আয়ত্তে ছিল না ।আমার প্রবল বাসনা ছিল যে, আমি একজন প্রবন্ধকার হবো।আমার পরবর্তী জীবনেও অর্থাৎ রাজনৈতিক জীবনে তা হওয়ার পথে কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল বলে আমার মনে হয় না তবুও আমি প্রবন্ধকার হতে পারিনি। যদিও আমি খবরের কাগজ চালিয়েছি। 

আমার মনে যে সাহিত্য -- রাজনীতির দ্বন্দ্ব চলেছিল তাতে শেষ পর্যন্ত জয় হল রাজনীতির। একটা কিছুতে যে নিজেকে বিলিয়ে দেব, সে তো আগে স্থির করেছিলেম।সেই জন্যই তো আমি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সব সময়ের কর্মী হতে পেরেছিলেম। ১৯২০ সালের শুরুতে আমি স্থির করে ফেললাম যে, রাজনীতি হবে আমার জীবনের পেশা।আমি রাজনীতিক সভা সমিতি ও মিছিলে যোগ দেওয়া শুরু করেছিলেম তো ১৯১৬ সাল থেকে।

*ভারতে কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা*

----------------------------------------------

১৯২০ --২৯ সালের মধ্যে মীরাট, কানপুর, পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করে প্রথম সারির কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু হয়। তার মধ্যে,"মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার" ১ নং আসামী ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ। কাকাবাবু গ্রেপ্তার হলেন। মতবাদ প্রচারের জন্য কোর্টের কাঠগড়াকে ব্যবহার করলেন।নয় মাস বিবৃতি দিলেন ডঃ অধিকারী ও মুজফ্ফর আহম্মদ।১৯৩১ সালের ১৮ ই মার্চ বিবৃতি শুরু হয়েছিল। প্রথম বিবৃতি দিয়েছিলেন রাধারমন মিত্র। এক দৃঢ আত্মপ্রত্যয় ও অসীম সাহসিকতার পরিচয় বহন করেই মতবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে কোর্টের কাঠগড়াকে বেছে নেওয়া হয়েছিল ।কাকাবাবু এই কাজ করে আমাদের সাহস ও আত্মপ্রত্যয় বাড়িয়ে গেছেন।

*শিক্ষা*:--

শ্রদ্ধেয় কমরেড জ্যোতিবাবুর লেখা থেকে:--"সেই সময় তিনি চিন্তা করেছেন স্বাধীনতার চরিত্র কি হবে? স্বাধীনতার পরও সংগ্রাম করতে হবে , পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে। এই আদর্শের জন্য কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে তিনি লড়াই করে গেছেন। নিদারুণ কষ্টের মধ্যে তিনি দিন কাটিয়েছেন। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রামে এগিয়ে এলেন। সেই সময়েই তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়তে গিয়ে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে থাকবেন কোথায়, খাবেন কি, তারও ব্যবস্থা ছিল না। তা সত্ত্বেও এই কঠিন অবস্থার মধ্যে তিনি একদিনের জন্যও বিশ্রাম নেননি। যাঁরা নিজেদের দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করেছেন, তাদেরকেও সংশোধনবাদ ও সংকীর্ণতাবাদের পথে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।আমাদের দেশেও তাই হয়েছিল। আমরা কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে সঠিকভাবেই দাঁড়াতে পেরেছি। যখন দক্ষিণপন্থী কমিউনিস্টরা (সিপিআই )শাসক কংগ্রেসের লেজুড়ে পরিণত হয়েছে,তখনও কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের একদিনের জন্যেও দ্বিধা দেখিনি। ভগ্ন স্বাস্থ্য, জটিল অবস্থার মধ্যেও তিনি এগিয়ে গেছেন। তিনি সকলের সঙ্গে সমানভাবে মিশতে পারতেন। তাঁর স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ । কর্মীদের প্রতি ছিল অগাধ ভালবাসা। নতুন নতুন কর্মীদের শিক্ষিত করে কাজ দেওয়া ও দায়িত্ব দেবার প্রতি বরাবর তাঁর নজর ছিল।

*১৯২২ আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ*:--

ভারতের প্রথম চারটি জায়গায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। (কলকাতা, বোম্বাই ,মাদ্রাজ ,লাহোর ) কলকাতার দায়িত্বে ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ, বোম্বাই এর দায়িত্বে ডাঙ্গে, লাহোরে গুলাম হুসেইন ,মাদ্রাজে ছিলেন সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়া।

তখন কেন্দ্রীয় কমিটির অফিস ছিল কলকাতায়। কলকাতায় তখন ইএম এস নাম্বুদ্রিপাদ এর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি লিখছেন," কেন্দ্রীয় কমিটির অফিসে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদের অধিকাংশই কাকাবাবুকে অনেক কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং তাঁদের উপর পিতৃসুলভ স্নেহ ও সেবা অনুভব করেছিলেন। বয়ঃকনিষ্ঠ কমরেডদের প্রতি তাঁর স্নেহবর্ষণ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা আমারও বার কতক হয়েছিল। ভারতের সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের আব্দুল গফফর খান আমার সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে কাকাবাবু সম্পর্কে এই বর্ণনাই দিয়েছিলেন আমার এক সোস্যালিস্ট সহকর্মী। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, আমার ঐ কংগ্রেস সোস্যালিস্ট সহকর্মীটি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে ভারতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অসাধারণ নেতা বলে মনে করতেন। এই ভাবেই আমি প্রথম কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের কথা শুনি, যাঁকে পরবর্তীকালে অন্যান্য কমরেডদের মতো আমিও কাকাবাবু বলে ডাকতে শুরু করলুম ।"কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের কথায়," আমাদের কাজের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ প্রতিবন্ধক হইতেছে আমাদের অভিজাত মনোবৃত্তি। এই মনোবৃত্তি দূর করিতে না পারিলে আমরা কোন কাজই করিতে পারিব না । কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার পর্বে আমাদের একটা বিশিষ্ট শিক্ষা পাওয়ার প্রয়োজন আছে।"(মুজফ্ফর আহম্মদ --প্রবন্ধ পৃ-১১৭)

*১৯৬৪ --১৯৭৩ ঝড় ঝাপটার দিনগুলো*

এই দশ বছরে পার্টিকে নানান ঝড় ঝাপটা ও বাধার মধ্যে এগোতে হয়েছে। এই সময়ের একটা বড় অংশে অসুস্থ অবস্থায় কাকাবাবুকে কারাগারে বন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়। ১৯৬৫ সালে তখন কাকাবাবু দমদম জেলে বন্দী। বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের মুখপত্র "ছাত্র সংগ্রাম" প্রকাশের জন্য শুভেচ্ছা বাণী আনতে যান কমরেড অনিল বিশ্বাস। শুভেচ্ছা বাণী তে কাকাবাবু লিখেছিলেন "সংঘটিত" কিন্তু ছাপা হয়েছিল "সংগঠিত"। কাকাবাবু লিখেছিলেন," লেখা বড় কঠিন কাজ ,আরো বড় কঠিন নিখুঁতভাবে লেখা।আমার বিশ্বাস আছে, ছাত্র সংগ্রামের কমরেডরা নিখুঁতভাবে লিখতে পারে। ছাত্র সংগ্রাম পত্রিকাটি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে দমদম জেলে পাঠানো হয়েছিল। জেল থেকে বেরিয়ে এসে কাকাবাবু অনিল বিশ্বাসকে ডেকে পাঠান। উনি বলেন ,"আপনি জেলের অভ্যন্তরে আমার কাছে পোস্ট অফিস মারফৎ চিঠি পাঠিয়ে ঠিক করেননি।এতে আপনার ক্ষতি হয়েছে, পার্টিরও ক্ষতি হয়েছে। আপনার উচিত ছিল লোক মারফৎ চিঠি পাঠানো" ১৯৬৯ সালে যুক্তফ্রন্টের দ্বিতীয়বার বিজয় উপলক্ষে এক সমাবেশ হয়েছিল। তখন গণশক্তি সান্ধ্য দৈনিক ছিল। গণশক্তিতে সেই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। পরের দিনই তিনি ডেকে পাঠান অনিল বিশ্বাসকে। তিনি বলেন," আমি ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে যে বক্তৃতা দিয়েছি, তা আপনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন নি।না শুনেই আমি যা বলিনি তা ছেপেছেন। এটা ঠিক করেননি। "শ্রমিক শ্রেণি "এই শব্দটি আমি ব্যবহার করিনি।আমি বলেছিলাম, "মজুর শ্রেণি"। শ্রমিক শ্রেণী ও মজুর শ্রেণীর পার্থক্য কি- তা তাঁকে প্রায় এক ঘন্টা ধরে বুঝিয়েছিলেন। 

কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ অবিন্যস্ত লেখাপড়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন অবিন্যস্ত লেখাপড়া কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করার পরিবর্তে মনকে বেশি বেশি করে বিক্ষিপ্ত করে তোলে। কোন নির্দিষ্ট বিষয় উপলব্ধিতে আসে না। চিরায়ত পুস্তক পুস্তিকা পড়াশোনা করার পর নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আধুনিককালের পুস্তক পুস্তিকার তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। তিনি বলতেন," গভীরে প্রবেশ কর। উপরি জ্ঞান থেকে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না। সকলের সঙ্গে মিশতে হবে ,পার্টি কর্মী, সমর্থক ছাড়াও পার্টির বৃত্তের বাইরে তিনি মানুষের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতেন।"

পার্টির সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলতেন," *সর্বতো প্রয়াস চালানোর পর কঠোর মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। বলতেন, বন্ধুর চেয়ে পার্টি বড়*"

*মহান নেতার জীবনাবসান*

 কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদের জীবনাবসান হয় ১৯৭৩ সালের ১৪ ই ডিসেম্বর।২২ শে ডিসেম্বর শহীদ মিনার ময়দানে আয়োজিত স্মরণসভায় কমরেড জ্যোতি বসুর ভাষন:-- ---------------"কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ সর্বভারতীয় নেতা হলেও তিনি ছিলেন এই পশ্চিমবঙ্গে, যে পশ্চিমবঙ্গে চলছে আধা -ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাস। যেটুকু সংসদীয় গণতন্ত্র ছিল তাও আজ শেষ করে দিচ্ছে কংগ্রেস ও তার সরকার। এর বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতে হবে। কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ এর শবদেহ নিয়ে যখন আমরা শোক মিছিল করে গোবরা কবরস্থানে যাই তখন সেই শোক মিছিলের লোকেদের ওপর কংগ্রেসী গুন্ডারা ছোরা নিয়ে আক্রমণ করে।একজন গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। এই গুন্ডামি ওদের নেতাদেরই শিক্ষার ফল। আমরা যখন আমাদের প্রিয় নেতাকে গোরস্থানে নিয়ে যাই --- তখন সেই মিছিলের ওপর এরা ঝাঁপিয়ে পড়ে একথাই প্রমাণ করে -- এরা শ্রেণী শত্রু পক্ষেরই লোক। 

আজ আমাদের শপথ গ্রহণ করতে হবে, কমরেড মুজফফর আহম্মদকে আমরা হারিয়েছি কিন্তু তাঁর কর্মময় জীবন আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা থেকে মানুষকে বুঝতে হবে।ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, শ্রেণী শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তীব্র করতে হবে। আমরা যতদিন বাঁচবো -- শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম করে যাব-- আমরা যেন বলে যেতে পারি কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ,সময় আমরা নষ্ট করিনি, করব না। আদর্শ সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পথে মানবজাতির মুক্তির জন্য এগিয়ে যাবই। কমরেড মুজফ্ফর আহমেদ -- আমাদের প্রিয় নেতার মৃত্যু নেই-- কমরেড মুজফ্ফর আহম্মদ জিন্দাবাদ(জ্যোতি বসুর নির্বাচিত রচনাসংগ্রহ, দ্বিতীয় খণ্ড,২২৪ পাতায়)

৫ ই আগস্ট কাকাবাবুর জন্মদিনে আমরা যারা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী, আমরা শপথ গ্রহণ করি যে, আমাদের মতাদর্শের প্রতি অবিচল থেকে, কমিউনিস্ট পার্টির দৈনন্দিন কার্যকলাপে নিয়োজিত থেকে বি জে পি র হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী তোষনের বিরুদ্ধে সর্বোপরি নয়া ফ্যাসিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে এবং রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে- পার্টি গড়ে তোলার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাব।

[তথ্য সংগৃহীত]৪/৮/২৫

class="separator" style="clear: both; text-align: center;">style="text-align: justify;">
style="text-align: justify;">
 
bannerbanner




style="text-align: justify;">


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার