আরএসএস-বিজেপির দেখানো পথেই মমতার রথযাত্রা

আরএসএস-বিজেপির

 দেখানো পথেই 

মমতার রথযাত্রা



অধ্যাপক শ্রুতিনাথ প্রহরাজ

 

'রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম'--সেই কোন ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি এই কবিতা। তারপর বঙ্কিমের হাত ধরে মাহেশের রথে রাধারাণীর হারিয়ে যাওয়া...রথ কে ঘিরে কত আবেগ কত স্মৃতি মানুষের! হঠাৎ সেই রথযাত্রাকে ঘিরে কে বেশি হিন্দু তার প্রমাণ দিতে, এরাজ্যে  দুই যুযুধান রাজনৈতিক দলের দড়ি টানাটানি শুরু হয়েছে। অথচ কালিগঞ্জ বিধানসভার বড় চাঁদঘর এলাকার মোলান্দী গ্রামের বেলেপাড়ায় তামান্না খাতুনের রক্তের দাগ এখনো স্পষ্ট লেগে আছে তাদের বাড়ির উঠোনে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ের জান্তব উল্লাসের বলি হল ন'বছরের ফুটফুটে মেয়েটা। পুলিশ প্রশাসনের সৌজন্যে এখনো প্রধান অভিযুক্তদের অনেকেই অধরা। একমাত্র সন্তানকে হারানো মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে। তিনি সবকাজ ছেড়ে সপার্ষদ পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাদের নিয়ে দীঘায় ঘাঁটি গেড়েছেন নতুন এক রথযাত্রার প্রস্তুতি তদারকি করবার জন্য। প্রায় একই সময়ে মেদিনীপুরের ঘাটাল ও হুগলীর খানাকুলে দুই লক্ষাধিক মানুষ বানভাসি হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন। ডেবরার ব্লক অফিসে ১০০ দিনের কাজ চাইতে গিয়ে পুলিশের মারে রক্তাক্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন গরিব কৃষক ও খেতমজুর। এই সব ঘটনা চাপা পড়েছে রথযাত্রার প্রস্তুতির আড়ম্বরে। যেভাবেই হোক জগন্নাথের রথ কে টেনে নিয়ে যেতেই হবে ছাব্বিশ-এর বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত। আদতে মাসির বাড়ি ওটাই।

লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কিছুদিন আগে ঠিক একই আড়ম্বর দেখেছিলাম আমরা অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধন কে কেন্দ্র করে। রামভক্তির হিস্টিরিয়া তৈরি করতে দেশ জুড়ে বাড়ি বাড়ি ফুল বেল পাতাসহ প্রসাদ বিলি করা হয়েছে। গোটা অযোধ্যা জুড়ে মোদির বড় বড় কাট-আউট। উদ্বোধনের দিন সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত ও প্রধানমন্ত্রী মোদির ধ্যানমগ্ন ছবিসহ গদি মিডিয়ার ধারাবাহিক প্রচার--  সবটাই করা হয়েছে পরিকল্পনা মাফিক। লক্ষ্য ছিল কর্পোরেট স্পনসরশিপে রাম রথে চেপে হিন্দুত্বের জিগির তুলে লোকসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া। আওয়াজ উঠেছিল, 'অব কি বার চারশো পার'। সে যাত্রায় বিজেপির বাড়াভাতে ছাই ঢেলেছে দেশের মানুষ। খোদ অযধ্যাতেই বিজেপি হেরেছে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থীর কাছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে বিজেপিকে থামতে হয়েছে ২৪০এ। চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতিশ কুমারের দুই ক্রাচে ভর দিয়ে সরকার গড়লেও বিজেপি কিন্তু হিন্দুত্বের এজেন্ডা থেকে এখনো সরে আসেনি। একই সাথে চলছে সরকারি মদতে কর্পোরেটের আগ্রাসন।

https://bulletinsituatedelectronics.com/tvzg5b0q?key=6ea92804f168980a847dec7503ea5d65

https://bulletinsituatedelectronics.com/mdjitig3?key=8b517f38b443e7fd7259478518fd9e2a

রাম মন্দিরের পাল্টা দীঘায় জগন্নাথ মন্দির বানানোর নেশা চাপে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর। যে বিশাল পরিমাণ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে এই মন্দির নির্মাণে খরচ করা হল, তা ওই এলাকার সমুদ্রবাঁধ নির্মাণ ও স্থায়ী মেরামতির জন্য ব্যয় করা হলে ঐ অঞ্চলের কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী দরিদ্র জনবসতির অনেক বেশি উপকার হত। ওই টাকায় দিঘায় আরো একটি পূর্ণাঙ্গ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা যেত। দিঘায় প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক যান। সেই তুলনায় সেখানে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ কম। পূর্ব মেদিনীপুরে একটি উন্নত মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠুক এটা ওখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। নিদেন পক্ষে এই টাকা মেদিনীপুরেরই এই সময়ের সব চাইতে জরুরী প্রকল্প 'ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান' দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারতো। এসব ছেড়ে জগন্নাথের রথ নিয়ে মেতে ওঠা কেন-- প্রশ্ন এখানেই। নিছক নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মাচরণের জন্য এই কাজ হাতে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ভাবলে মহা ভুল হবে। প্রতিবছর রথের দিন ইসকনের রথের দড়িতে হাত লাগাতেন মুখ্যমন্ত্রী। হঠাৎ সেই ইসকনেরই সৌজন্যে দীঘায় বিকল্প জগন্নাথ ধাম তৈরির নেশা চাপলো কেন? অবশ্যই এর পেছনে আছে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। হয়তো তা অযোধ্যার মতো ছাব্বিশের নির্বাচনে মুখ থুবড়ে  পড়বে, তবু ঝুঁকি নিতে পিছপা হননি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। যতদূর জানা গেছে, সরকারের যুব কল্যাণ ও সংস্কৃতি দপ্তরের বাজেটের একটা বড় অংশ এই মন্দির নির্মাণে বরাদ্দ করা হয়েছে। আমার আপনার ট্যাক্সের টাকায় পুষ্ট সরকারি কোষাগার থেকে এভাবে মন্দির বা মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থ ব্যয় করা যায় কিনা সেই প্রশ্ন সঙ্গত কারণে উঠছে। জগন্নাথ- এর মূর্তি নির্মাণের কাঠ নিয়েও দুই রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে বিস্তর দড়ি টানাটানি হয়েছে।

রাম মন্দিরের কায়দায় এখানেও জগন্নাথের প্রসাদ সরকারি প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বাড়ি বাড়ি বিলি করার চেষ্টা হয়েছে। সরকারি রেশন দোকান কেও এই কাজে লাগানো হয়েছে।  গরিব মানুষ সময় মত চাল গম পাচ্ছেনা রেশন থেকে অথচ দীঘার জগন্নাথের প্রসাদ বিলি হচ্ছে। এর জন্যও বিস্তর অর্থ বরাদ্দ হয়েছে সরকারি কোষাগার থেকে। পুরীর কায়দায় নাম দেওয়া হয়েছে মহাপ্রসাদ! এর থেকে বড় পরিহাস আর কি হতে পারে! যেভাবেই হোক জগন্নাথের রথে চেপে হিন্দু ভোট পুনরুদ্ধারের নেশায় বিজেপির কায়দায় আরেক ধরনের হিন্দুত্বের হিস্টিরিয়া তৈরি করার মরিয়া চেষ্টা করছে তৃণমূল কংগ্রেস, সরকারি প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে।

এমনিতেই শুক্র-শনি-রবি টানা ছুটি থাকলে এই সময় অর্থাৎ ভরা বর্ষায় দীঘা-তাজপুর-মন্দারমনি তে পর্যটকদের বিস্তর ভিড় জমে। হোটেল গুলিতে জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এবারও রথের ছুটিতে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছে এর সবটাই নাকি মহাপ্রসাদের গুণ অর্থাৎ যারা এই সময় দীঘা গেছেন তারা নাকি জগন্নাথের রথ টানতেই পৌঁছেছেন! দীঘা বেড়াতে গেলে কেউ এই সুযোগে নতুন এই মন্দির দেখতে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। যেমন আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, দীঘায় লোকে বেড়াতে গেলে সমুদ্র সৈকত, ঝাউ বনের পাশাপাশি ওল্ড দীঘার রাজবাড়ী দেখতে যেতেন। এই রাজবাড়ী ছিল অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুরের নাড়াজোল এর শেষ রাজা অমরেন্দ্র লাল খানের প্রাসাদ। 'খান ম্যানশন' নামে পরিচিত ছিল এটি। যেকোনো পর্যটন কেন্দ্রের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য।

মূল প্রশ্ন হল সব ছেড়ে এই মন্দির তৈরি করাটোই কি এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের এই সময়ে একমাত্র কাজ হতে পারে? নাকি জীবন জীবিকার অন্য সব সমস্যা গুলো আড়াল করতে আরএসএস বিজেপির কায়দায় নেত্রীর এই রথযাত্রা? সারা রাজ্যজুড়ে প্রাচীন এবং নতুন রথযাত্রার তো অভাব নেই।  আবার  দীঘায় নতুন করে করতে হল কেন? মুখ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন শাস্ত্র নয় মানুষের জন্য তিনি এই মন্দির তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছেন। যদি তাই হয়, তাহলে কেন একবারের জন্যও এই সময়ে এই রাজ্যের মানুষের প্রধান চাহিদা কি কি, তা জানার চেষ্টা করা হল না। 

রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।  রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গ্রামের গরিব কৃষক মরছে মাইক্রোফিনান্সের ফাঁদে পড়ে। গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ। গ্রামের গরিব মানুষ চরম সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বামপন্থী কৃষক ক্ষেতমজুর সংগঠন গুলির দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে সম্প্রতি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে আগামী পয়লা আগস্ট থেকে ১০০ দিনের কাজ চালু করতে হবে। আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার দুর্নীতির তদন্ত করবে কিন্তু কোন অজুহাতেই এই প্রকল্পের টাকা আটকে রাখা যাবে না। প্রয়োজনে জব কার্ড যাদের আছে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠাতে হবে। একইভাবে কেন্দ্রীয় আবাসন প্রকল্পের টাকা নয়ছয় হওয়ার অজুহাতে কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দেওয়া বন্ধ করেছে। রাজ্য সরকার সেই জায়গায় টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেখা গেল সেখানেও পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। শাসকদলের নেতাকর্মী যাদের দোতলা- তিনতলা পাকা বাড়ি, তারা পেয়েছে আবাসনের টাকা। আর যাদের মাথার উপর এক চিলতে ছাদ নেই তাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। গরিব কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না। এবারেও আলু চাষিরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পাননি। এক অবস্থা সবজি চাষীদেরও। এতসব সমস্যা ছেড়ে মানুষের জন্য মন্দির তৈরি করার কথা মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় আসে কি করে!

রাজ্যজুড়ে বেকারি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্রামে কাজের হাহাকার। গতরখাটা কম বয়সী যুবকেরা এখন দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। যথাযথ গ্রামীন পরিকাঠামো তৈরি না হওয়ায় সেখানে কৃষি ক্ষেত্র ছাড়া কাজের সুযোগ খুবই কম। যেটুকু আছে সেখানে মজুরি বাজারদরের তুলনায় অনেকটাই কম। তাই দলে দলে মানুষ ঘর ছেড়ে রাজ্য ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছে ভিন রাজ্যে সংসার চালানোর তাগিদে বাড়তি উপার্জনের জন্য। বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকরা শুধুমাত্র ধর্মের কারণে অন্য রাজ্যে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। এরাজ্যে এখন কাজ নেই, তাই ফিরে আসার কোন বিকল্প বন্ধবস্ত নেই। রাজ্যের থোক বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যাকে জিএসডিপি বলা হয় তার প্রকৃত চেহারা কি? এটা দেখা দরকার কারণ যে কোন রাজ্যের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের পরিমাপক যার থেকে বোঝা যায় কেমন চলছে রাজ্য। রাজ্যজুড়ে ব্যাপক হারে বেড়ে চলা দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজ অকৃষি খাতে যুক্ত মানুষদের পুরোদস্তুর আতঙ্কিত করে রেখেছে। এর ফলে এই খাতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের জিএসডিপির প্রায় ৮০ শতাংশই অকৃষি খাত থেকে আসে, তাই এই নেতিবাচক প্রভাবকে এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বস্তুত তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটাই কম। বড় রাজ্যগুলির বেশিরভাগই আমাদের থেকে এগিয়ে। বাম জমানার তুলনায় শিল্প এবং পরিষেবা খাতে রাজ্যের গড় বৃদ্ধির হার তৃণমূল জমানায় গত চৌদ্দ বছরে অনেকটাই কমেছে। চালু শিল্প কারখানাগুলি একের পর এক বন্ধ হচ্ছে। নতুন শিল্প প্রায় নেই বললেই চলে। ছোট ও মাঝারি শিল্প যেটুকু তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, সেখানেও তোলাবাজদের দৌরাত্মে নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়। এই তোলাবাজরাই এখন গ্রাম-গঞ্জ মফস্বল এলাকায় অর্থ এবং পেশি শক্তির দাপটে তৃণমূলের প্রধান এজেন্ট। এরাই তৃণমূলের ভোট ম্যানেজার। পঞ্চায়েত পৌরসভা নির্বাচনে দেদার ভোট লুট, বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে হিংসা হানাহানি থেকে শুরু করে ভোটারদের ভয় দেখানো পর্যন্ত সবটাই এরা করে নিখুঁত কায়দায়। এদের কেউ চটায় না, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ও নয়। ধরা পড়লে বা সংবাদ মাধ্যমে খবর ছড়ালে লোক দেখানো দল থেকে সাসপেনশনের সিদ্ধান্ত হয়। কদিন বাদেই স্বমহিমায় ফিরে আসে এরা। তাই,  শিল্প মালিকের বিনিয়োগ থেকে শুরু করে শ্মশানপথ যাত্রির জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রকল্পের টাকা-- সর্বত্র এদের বখরা দিতে হয়। এটাই তৃণমূল জমানার দস্তুর।

অথচ ঘটা করে প্রতিবছর শিল্প সম্মেলন (বি জি বি এস) করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি মত গত ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই সম্মেলন গুলি থেকে মোট ১৯.৫৪ লক্ষ্য কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে॥ ২০২৪-এ এই সম্মেলন হয়নি। ২০২৫ এর সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি মত বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে ৪৪০৫৯৫ কোটি টাকা। সবটা শুনলে আনন্দে শিউরে ওঠার কথা! কি বিশাল বিনিয়োগ, কি ব্যাপক কর্মদ্যোগের সুযোগ-- তাই না? আদতে কি আদৌ কিছু দেখতে পাচ্ছি আমরা? বস্তুত মমতা ব্যানার্জি সহ শুভেন্দু-শিশির অধিকারীদের নেতৃত্বে রাজ্য থেকে পরিকল্পনামাফিক টাটা দের অটোমোবাইল শিল্প উৎখাত করা ও নন্দীগ্রাম, জঙ্গলমহল সহ সারা রাজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির পর নতুন করে গত দেড় দশকে এ রাজ্যে একটাও বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি। কদিন আগে ঘটা করে জিন্দালদের ইস্পাত কারখানার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হল। প্রায় ১৫ বছর আগে এই কারখানা গড়ে ওঠার কথা ছিল যা পুরোদস্তুর নাশকতা সৃষ্টি করে ভেস্তে দেওয়া হয়। আবার সেই কারখানার ভিত পুজো হলো। কবে কারখানা গড়ে উঠবে আর কবেই বা উৎপাদন শুরু হবে-- কেউ জানে না।

আর জি করের অভয়া খুনের এক বছর পার হতে চললো। এর পেছনেও আছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এখনো প্রধান অপরাধীরা অধরা থেকে গেছে। অভয়ার সেই রক্ত মাখানো চোখ দুটো আমরা যেন ভুলে না যাই। আবারও অভয়ার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবিতে প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন গ্রামগঞ্জ শহরের পথে সোচ্চার হোক। এর মধ্যে আবার দক্ষিণ কলকাতা আইন কলেজের ভেতরে শাসকদলের দুর্বৃত্তদের হাতে আক্রান্ত হল ঐ কলেজেরই এক ছাত্রী। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির ছেলে মেয়েদের নিরাপদ ও মর্যাদার জীবন সুনিশ্চিত করতে এটাই এই মুহূর্তে জরুরী কাজ। আইন কলেজের অভ্যন্তরে ঐ ছাত্রীর চরম নিগ্রহের ঘটনা সামনে আসার পর একটা জিনিস পরিষ্কার হয়েছে তা হল, এ রাজ্যে এখন স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল রাস্তাঘাট-- কোথাও আমাদের ছেলেমেয়েরা নিরাপদ নয়। তাই, একেই ভবিতব্য না ভেবে সাহস করে পথে নামা জরুরী।

এ রাজ্যের রাজনৈতিক- সামাজিক সংস্কৃতি গত দেড় দশকে অধঃপতনের চরম সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে।  বামেদের বিরোধিতা করা এবং দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে বিজেপিকে হাত ধরে এই রাজ্যে জায়গা করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই সুযোগে আরএসএস রাজ্যজুড়ে তাদের সংগঠনের অনেকটাই বিস্তার ঘটিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন রাজনৈতিক চর্চায়। বিধানসভায় এখন মমতা না শুভেন্দু-- কে বড় হিন্দু ধর্মের ভক্ত তা নিয়ে প্রায়শঃই তর্ক হয়। মাথায় বড় বড় সিঁদুরের তিলক কেটে গেরুয়া পাগড়ি পরে বিধায়কদের এক অংশ মাঝে মাঝেই বিধানসভায় হিন্দুত্বের বড়াই করে চলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় অতীতে কখনো এ জিনিস কেউ লক্ষ্য করেনি।  স্বভাবতই বিতর্কের সময় বাদ পড়ে শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবন জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। বামপন্থীরা বিধানসভায় না থাকায় এই বিষয়গুলি তোলার তাগিদ আর কেউ উপলব্ধি করেনা। এটাই এই সময়ে এরাজ্যের সবচাইতে বড় বিপদ।

তৃণমূলের আঁতুড়ে জন্ম নিয়ে বড়  হওয়া অধুনা বিজেপির জঙ্গি বিরোধী দলনেতা প্রায়শঃই হিন্দু ভোটের গর্জন করেন। হুমকি দেন ক্ষমতায় এলে মুসলমানদের কিভাবে পেটাবেন, রাজ্য ছাড়া করবেন। এমনকি জনপ্রতিনিধিদেরও এই হুমকির শিকার হতে হচ্ছে। কালীগঞ্জের উপনির্বাচনের ফল বেরোনোর পর শুভেন্দু দাবি করলেন, হিন্দু ভোটের প্রাধান্য নাকি বিজেপির দিকেই বেশি, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, মন গড়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে। বুধ ভিত্তিক নির্বাচনী ফলাফল আদৌ তা বলে না। এ রাজ্যে আগে কখনো এভাবে জাত পাত বা ধর্মভিত্তিক ভোটের বিশ্লেষণ হত না। এগুলি ছিল বিহার উত্তরপ্রদেশের একচেটিয়া বিষয়। এখন এটাই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিডিয়ার দৌলতে তৃণমূল বিজেপির বাইনারি টিকিয়ে রেখে হিন্দুত্বের হুংকার চলছে। আর এতেই খানিক ভয় পেয়েছেন মমতা। রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতিতে দিশেহারা তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া। ওরা জানে সংখ্যালঘু ভোট আর যাই হোক বিজেপি পাবে না। এই ভোট ভাগ হবে বাম কংগ্রেস তৃণমূলের মধ্যে। তাই, শুভেন্দুর দাবি অনুযায়ী বিজেপির ভোট বাক্স থাকা হিন্দু ভোট পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তৃণমূল নেত্রীর এই রথযাত্রা। তাও আরএসএস বিজেপির দেখানো পথেই। মানুষ মরছে নিজের যন্ত্রণায়, তৃণমূল- বিজেপি ব্যস্ত ভোট ভাগাভাগির অংক কষায়। বিজেপি এ রাজ্যে ক্ষমতা দখলের নেশায় মরিয়া আর তৃণমূল ক্ষমতা ধরে রাখার নেশায় মরিয়া কারণ এর পেছনেই আছে তাদের যাবতীয় উপার্জন ও টিকে থাকার রসদ। এর থেকেই রাজ্যজুড়ে হিংসা হানাহানি বাড়ছে। রাজনৈতিক হিংসার শিকার করছেন সাধারণ মানুষ। আগামী দিনে আমাদের সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরী।

রাজ্যের সার্বিক পরিবেশ ভয় পাওয়ার মতই। স্কুল সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক নিয়োগ মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ঘটেছে। যে কারণে এক ধাক্কায় ২৫৭৫২ জন শিক্ষক ও শিক্ষা-কর্মীর চাকরি চলে গেছে। এর মধ্যে মেধার ভিত্তিতে পাওয়া শিক্ষকরা ও যেমন আছেন দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়া শিক্ষক শিক্ষা-কর্মীও আছেন। রাজ্যের শাসক দল নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে সবটা তালগোল পাকিয়ে রেখেছে, যাতে কেউ ধরতে না পারে কে কাকে কত টাকা দিয়েছে এবং সেই টাকার ভাগ শেষমেষ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এখনো প্রাথমিকের ৩২ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল মামলা আদালতে ঝুলে আছে।  সেই নিয়োগেও যে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি হয়েছে তা আজ জলের মতো পরিষ্কার। তাই আদালতের রায় কি হতে পারে তা ভেবে প্রাথমিকের শিক্ষক শিক্ষিকারা আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকার তথা শাসকদলের সদিচ্ছা না থাকায় নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একের পর এক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় সংকট বাড়ছে সন্দেহ নেই।

সমস্যা হচ্ছে এ রাজ্যে দুর্নীতি সন্ত্রাস সৃষ্টির দায়ে অভিযুক্ত আসামীরাই এখন বিশিষ্ট সমাজসেবীর তকমা পায়। একের পর এক অপরাধ করে ওরাই সংবাদ মাধ্যমে বলবার সাহস পায় , 'আইন আইনের পথে চলবে'। এর পেছনে আছে পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদত। এদের সাহায্য নিয়েই রাজ্যে এক ব্যক্তির একদলীয় শাসন এখন কার্যত বাহুবলী সমাজের শাসনের  চেহারা নিয়েছে। সন্দেশখালির শাজাহান, শিবু হাজরা, উত্তম ঘোষ থেকে শুরু করে কালীগঞ্জের আনোয়ার শেখ, গাওয়াল শেখরা এটা বুঝে গেছে অপরাধ করেও

 এরাজ্যে পুলিশের খাতির পাওয়া যায়। জেল থেকে বেরিয়ে অনুব্রত মণ্ডল তাই পুলিশ ও তার পরিবারকে নির্দ্বিধায় গালাগালি দিতে পারে। এরা সবাই জানে ওদের টিকিও কেউ ধরবার সাহস করবে না কারণ ওরা তৃণমূলের ভোট ম্যানেজার। ওদের কৃত কৌশলেই তৃণমূল বছরের পর বছর ভোটে জিতে ক্ষমতা দখলের সুযোগ পায়। তাই বীরভূমের বেশকিছু রাস্তায় গেলেই আপনাকে টোল দিতে হবে। এই টোল সরকারের ঘরে যাচ্ছে নাকি মন্ডল খাচ্ছে সে প্রশ্ন তুললেই কপালে দুর্ভোগ আছে। আপনি আক্রান্ত হয়ে জেলে ঢুকবেন আর অপরাধী গ্রামীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি হয়ে ফিতে কাটবে। 

কেন্দ্রীয় এজেন্সি আর আদালতের যাঁতাকলে পড়ে তৃণমূল কংগ্রেস খানিকটা পর্যুদস্ত বলা যেতে পারে। তবে দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে খুব যে দুশ্চিন্তায় আছে এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই।  ২০১৬-র নির্বাচনের আগে সারদার কেলেঙ্কারি জনসমক্ষে আসে। এই চিটফান্ডের কবলে পড়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তারপর আসে নারদার ঘুষ কেলেঙ্কারি। টিভির পর্দায় রাজ্য সহ সারা দেশের মানুষ দেখল কিভাবে সৌগত রায়, ববি হাকিম, শুভেন্দু অধিকারীরা ঘুষের টাকা নিলেন। এক সময় মমতা প্রকাশ্য সভায় বলতে বাধ্য হলেন,  আগে জানলে এদের প্রার্থী করতাম না। তবু তারাই প্রার্থী হলো আবার কেউ  লোকসভায় কেউ বিধানসভায়। জিতেও গেলেন। এরপর ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে কয়লা কেলেঙ্কারি, বালি চুরির কেলেঙ্কারি, রেশন দুর্নীতি ও সর্বোপরি পাহাড় প্রমাণ নিয়োগ দুর্নীতি-- এসব জনসমক্ষে এলো একের পর এক। তৃণমূল নেতা-মন্ত্রী- বিধায়করা জেলেও ঢুকলেন। তবু জিতল তৃণমূল। তাই ছাব্বিশের নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল ধরেই নিয়েছে, দুর্নীতি ওদের হারাতে পারবে না। দরকার হিন্দু ভোট তাই সব কাজ ছেড়ে দিঘায় গিয়ে জগন্নাথের কাঁধে ভর করে রথে চাপা জরুরী। এটাই এরাজ্যের রাজনৈতিক-সামাজিক সংস্কৃতির অধঃপতনের সর্বশেষ নমুনা। এরা ভুলে যাচ্ছেন, বামপন্থীদের ঠেকাতে সঙ্ঘ পরিবার ও কর্পোরেট যতই তৃণমূল নেত্রী কে 'কালচার' করুক, শেষ কথা বলবেন রাজ্যের জনগণ । তাই, রাজ্যকে বাঁচাতে সেই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এদের ক্ষমতা থেকে সরাতেই হবে। একই সাথে হঠাতে হবে বিজেপিকে রাজ্য থেকে বরাবরের মতো। বুক বেঁধে বলতে হবে, এরাজ্যে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতার ঠাঁই নেই। আমরা রামমোহন- বিদ্যাসাগর- রবীন্দ্রনাথ- নজরুলের উত্তরসূরী।

রাজ্যের সাম্প্রদায়িক বিভাজন হিংসা হানাহানি এখন উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে এসব ছিল না এরাজ্যে। কিছুদিন আগে মুর্শিদাবাদে আমরা লক্ষ্য করেছি কিভাবে ধর্মীয় জিগির তুলে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় খুন করা হয়েছে বামপন্থী পরিবারের বাবা ছেলে দুজনকেই। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পুলিশের ক্যাম্প থাকলেও কেউ বাঁচাতে আসেনি। গ্রামের পর গ্রাম বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে। রামনবমী- ঈদ-মহরম এখন যত না উৎসবের- আনন্দের, তার চাইতে বেশি আতঙ্কের। এই বুঝি কোথাও কিছু অঘটন ঘটলো। আবারও কোনও নিরপরাধ মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে বলি হলেন ধর্মোন্মাদদের হাতে। যেমনটা চলছে সারা দেশে এখন।  গুজরাটে, রাজস্থানে, উত্তরপ্রদেশে, মধ্যপ্রদেশে এ জিনিস হতে দেখেছি আমরা। ইদানিং উড়িষ্যাতেও শুরু হয়েছে। গোমাংস রাখার মিথ্যা অপরাধে বা গরু পাচারের মনগড়া অভিযোগে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে বা হচ্ছে অসহায় সংখ্যালঘু মানুষদের। এখন আমাদের রাজ্যেও এই ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। সম্প্রতি মাটিগড়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে।  এই বিপদজনক সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করা জরুরী। সমস্যা হল তৃণমূল বিজেপি উভয়েই কোন না কোন ভাবে এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আশ্রয় দিচ্ছে, মদত জোগাচ্ছে। তাই রাজ্যকে বাঁচাতে আমাদের লড়াই তৃণমূল-বিজেপি --এই উভয় শক্তির বিরুদ্ধে।

https://bulletinsituatedelectronics.com/kdkucushk?key=809494c14ce58865099940d497ceb56b

p style="text-align: justify;">
bannerbanner

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জালিয়াতি করে চলছে রেস্টুরেন্ট দোকানের মালিকের অভিযোগে বাতিল জাল ট্রেড লাইসেন্স

চন্দননগর ইস্পাত সংঘে চলছে টি সি এস এ চাকরির ট্রেনিং

বৈদ্যবাটী সীতারাম বাগানে দম্পতির রক্তাক্ত দে উদ্ধার