চুঁচুড়া ও বঙ্কিম
চুঁচুড়া ও বঙ্কিম
https://bulletinsituatedelectronics.com/mjitig3?key=8b517f38b443e7fd7259478518fd9e2a
https://bulletinsituatedelectronics.com/mdjitig3?key=8b517f38b443e7fd7259478518fd9e2a
আইনজীবী সুমিত ব্যানার্জী
আমাদের পুরোনো বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডান দিকে ঘুরলেই যে বাড়িটা প্রথম চোখে পড়বে সেটা ' বন্দে মাতরম ভবন'।
২০ মার্চ, ১৮৭৬, হুগলীর ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট - কাম - ডেপুটি কালেক্টর হয়ে এলেন বাবু বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
কিছুদিন আগেই, ২৬ শে জুন ওনার জন্মদিন ছিল ক'জন তার খবর রেখেছি ? আসলে আমরা এখন ফেসবুকে হ্যাপী বার্থডে ইন্টিমেশন না এলে জানতেও পারিনা কার কবে জন্মদিন।
কাঁঠালপাড়ার পাঠ গুটিয়ে সপরিবারে এসে উঠলেন চুঁচুড়ার জোড়াঘাটের এই বাড়িতে, যা আজকের "বন্দেমাতরম ভবন ।"
পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নায় গঙ্গার উপর প্রসারিত চাতালে পায়চারী করেন বঙ্কিমচন্দ্র। আদিগন্ত গঙ্গার বুকে রুপোলি আলোর ঝিলিমিলি, গঙ্গার জলে পরিপ্লাবিত সবুজ শস্যক্ষেত্র..বঙ্কিম চন্দ্র রচনা করলেন যুগান্তকারী স্বদেশ-বন্দনা বন্দেমাতরম্:
সুজলাং সুফলাং...পরে আনন্দমঠে যা সংযোজিত হয়। সুর দিলেন আর এক ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
নৈহাটি-কাঁঠালপাড়ার বাসিন্দা হলেও বঙ্কিমের সাহিত্য, স্বদেশ-ভাবনা, সঙ্গীত সৃজন ঘটেছিল চুঁচুড়ার জোড়াঘাটের এই বাড়িতেই। সৃষ্টি হল কালজয়ী সব উপন্যাস। বঙ্কিম আকর্ষণে সাক্ষাৎকার নিতে কলকাতা থেকে এলেন শ্রীশচন্দ্র মজুমদার। বঙ্কিম বলেন: "এখন আর ইংরেজি চিঠিপত্র আদৌ লিখি না, ইংরেজি ভাষাটা ভারী insincere বলিয়া আমার মনে হয় ।" অথচ বঙ্কিম বাবুকে ইংরাজি সাহিত্যের সুপণ্ডিত বলে গণ্য করা হয়। শ্রীশচন্দ্র প্রশ্ন করেন: 'শুনেছি বিষবৃক্ষে আপনার জীবনের একটা ছবি আছে, ইহা কি সত্য ?' বঙ্কিমচন্দ্র জানান: কতক সত্য বৈকি (শোনা যায় বিষবৃক্ষের নায়িকা কুন্দননন্দিনীর চরিত্রটা বঙ্কিমচন্দ্রের ছোটমেয়ের ছায়া অবলম্বনে লেখা), তবে আসলের উপর কিছু রং ফলাতে হয়েছে। পারিবারিক জীবনে আমি ছিলাম অসুখী মানুষ, চাকরি আমার অভিশাপ আর আমার ব্যক্তিগত সুখ, সমৃদ্ধি, জীবনের উত্থান সকলই আমার এই স্ত্রী (রাজলক্ষীদেবী)'র জন্য---ইনিই আমার জীবনের আসল সাথী, আমার কাছে কল্যাণ স্বরূপা-দেবী। আমি এনারই অপেক্ষায় ছিলাম। সন্ধ্যাকালে শ্রীশ চন্দ্রের সাথে কথা বলার সময় টেবিলের উপর জ্বলন্ত মোমবাতিটি ফুহ্ দিয়ে নিভিয়ে পাশের মোমবাতিটি জ্বালিয়ে দিলেন। খানিক অন্ধকার কাটিয়ে ধীরে ধীরে ওই মোমবাতির আলো ছড়িয়ে পড়লে বঙ্কিমবাবু বলেন, ' দুঃখিত, ওইটি আসলে সরকারি বাতি তো, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাই ওটি নির্বাপিত করলাম।'
নানান তথ্য-ছবি সমৃদ্ধ এইবাড়ী এখন-বঙ্কিম গ্যালারি, "বন্দেমাতরম ভবন"। বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতি বিজরিত চুঁচুড়া নিয়ে আছে বহু গল্প।
এই বাড়িতে লিখলেন আরও বেশ কিছু বই। এই ভবনের উল্টোদিকে আছে আর এক দিকপাল সাহিত্যিকের বাড়ি ' মরুতীর্থ হিংলাজের স্রষ্টা অবধুতের বাড়ি। আর ভবনের গায়ে লাগানো বিশাল বাড়িটি স্বাধীনতা সংগ্রামের পৃষ্ঠপোষক তৎকালীন নামী ব্যবসায়ী জগন্নাথ আড্ডির। এখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। জগন্নাথ আড্ডিবাবুর এই বাড়িতেই বর্তমানে বসবাস করেন তাঁর এক পুত্র চুঁচুড়া শহরের বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং হুগলি চুঁচুড়া ইতিহাসের রচনাকার বিশিষ্ট সাহিত্যিক ডাঃ অক্ষয় কুমার আড্ডি। আর এই ডাঃ অক্ষয় কুমার আড্ডির অনুপ্রেরণায় আমি লিখে ফেলেছি আমার বই "ওলন্দাজের নৌকা"।
আধুনিক ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের কাছে এইসব মহামানবদের কথা আমাদেরই দ্বায়িত্ব নিয়ে স্মরণ করতে হবে নচেৎ পরবর্তীতে পাগড়ি বাঁধা এই মানুষটার ছবি দেখে হয়তো ওরা বলে উঠবে, Who is this man ? লজ্জায় পড়বেন না তো ?




মন্তব্যসমূহ